বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে কওমি মাদরাসাভিত্তিক আলেম সমাজ এক বিশাল শক্তির আধার। দেশজুড়ে বিস্তৃত মাদরাসা নেটওয়ার্ক এবং লাখো শিক্ষার্থীর ওপর এই নেতৃত্বের গভীর প্রভাব থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে তারা বারবার হোঁচট খাচ্ছে। কওমি ঘরানার ভেতরে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত মতপার্থক্য, নেতৃত্বের লড়াই এবং কৌশলগত ভিন্নতা এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই বিভাজন আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ঐতিহাসিকভাবে দেওবন্দি ঘরানার এই শিক্ষাব্যবস্থা ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষায় আপসহীন হলেও গত কয়েক দশকে অভ্যন্তরীণ নানা সমীকরণে এর ঐক্য বিনষ্ট হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৭ সালে দাওরায়ে হাদিস সনদের সরকারি স্বীকৃতি, ২০২০ সালে শীর্ষ নেতৃত্বের প্রয়াণ এবং ২০২১ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা কওমি রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে। একসময়ের প্রভাবশালী কেন্দ্র হাটহাজারী মাদরাসাকে ঘিরে গড়ে ওঠা একক নেতৃত্ব এখন বহুধাবিভক্ত।
২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনার পর থেকেই কওমি ঐক্যে ফাটল ধরতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যু এবং জুনায়েদ বাবুনগরীর দায়িত্ব গ্রহণকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ বিরোধ চরমে পৌঁছায়। ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সরকারের কঠোর দমনে হেফাজতে ইসলাম কার্যত দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি পক্ষ সরকারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চায়, অন্য পক্ষটি রাজপথে সক্রিয় থাকার পক্ষে অবস্থান নেয়। এই কৌশলগত দ্বন্দ্ব কওমি অঙ্গনের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।
বর্তমানে কওমি ঘরানায় বেশ কয়েকটি দল সক্রিয় থাকলেও তাদের মধ্যে ন্যূনতম নির্বাচনি ঐক্য দেখা যায় না। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এককভাবে নির্বাচনি রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইলেও অন্যান্য কওমি দলগুলোর সঙ্গে তাদের দূরত্ব ঘোচেনি। অন্যদিকে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন এবং নেজাম-ই-ইসলাম পার্টির মতো দলগুলো বিভিন্ন সময়ে ভেঙে একাধিক উপদলে পরিণত হয়েছে। পারিবারিক প্রভাব, নেতৃত্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং আঞ্চলিক বলয় তৈরির প্রবণতা এই বিভাজনকে আরও উসকে দিয়েছে।
ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও বিশ্লেষকদের মতে, কওমি দলগুলোর ব্যর্থতার মূলে রয়েছে পেশাদার রাজনীতির অভাব এবং ইস্যুভিত্তিক আবেগপ্রবণতা। আদর্শগতভাবে সবাই এক থাকলেও বড় দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন বা এককভাবে চলার প্রশ্নে তারা কখনোই একমত হতে পারেনি। এমনকি শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং কারিকুলাম নিয়েও আলেমদের মধ্যে রয়েছে প্রবল বিরোধ। ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দেওয়া নিয়ে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, তা আজও কওমি সমাজে অস্বস্তির কারণ হয়ে আছে।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কওমি ঘরানার দলগুলো সম্মিলিত কোনো প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে। পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তাদের ভোট ব্যাংক যেমন ভাগ হয়েছে, তেমনি আসন প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে পড়েছে। নির্বাচনি তথ্য অনুযায়ী, প্রধান কওমি দলগুলো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেলেও আসন সংখ্যায় তার প্রতিফলন ঘটেনি। এই অনৈক্যের সুযোগে বড় রাজনৈতিক দলগুলো কওমি ভোটকে নিজেদের পক্ষে নেওয়ার কৌশল গ্রহণ করে, যা শেষ পর্যন্ত কওমি রাজনীতির স্বতন্ত্র সত্তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কওমি নেতৃত্বের মধ্যে যদি বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হয় এবং নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্ব নিরসন করা না যায়, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের প্রভাব আরও সংকুচিত হবে। কেবল সামাজিক শক্তির ওপর ভর করে নয়, বরং রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং সমন্বিত নেতৃত্বের মাধ্যমেই এই বিভাজন দূর করা সম্ভব বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
রিপোর্টারের নাম 

























