ঢাকা ০৩:৪০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

হাওরের কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে সরিষার বিপ্লব: বোরোর ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন দিগন্ত

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:১১:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলের কৃষকদের সারা বছরের জীবন-জীবিকা মূলত বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রতি বছর আগাম বন্যার ছোবলে যখন পাকা ধানের ক্ষেত তলিয়ে যায়, তখন কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে যায়, বাড়ে ঋণের বোঝা আর অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তাদের ভবিষ্যৎ। এই একমুখী নির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে এবং কৃষকদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করতে এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একটি যুগান্তকারী গবেষণা। এই গবেষণা হাওরের পতিত জমিতে স্বল্পমেয়াদী সরিষা চাষের মাধ্যমে লাভজনক শস্যক্রম তৈরির উজ্জ্বল সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে।

গবেষকরা বলছেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর এবং বোরো ধান রোপণের আগে যে বিশাল সময়টুকু অব্যবহৃত থাকে, সেই পতিত জমিতে সরিষা আবাদ করে কৃষকরা অন্তত একটি অতিরিক্ত ফসল ঘরে তুলতে পারবেন। এতে একদিকে যেমন জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কুড়ারকান্দি এলাকায় পরিচালিত এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. মমিনুল ইসলাম। তার সঙ্গে সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন অধ্যাপক ড. মো. পারভেজ আনোয়ার। ‘কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে বিদ্যমান পতিত-বোরো-পতিত ফসল ক্রমে সরিষা প্রবর্তন’ শীর্ষক এই প্রকল্পটি ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম (বাউরেস)-এর তত্ত্বাবধানে এবং সিটি ব্যাংক-এর অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে।

হাওরে বোরো ধান চাষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক সময়ে রোপণ। ডিসেম্বরের আগে রোপণ করলে ঠান্ডায় ধানের শীষে দানা বন্ধ্যা হওয়ার ঝুঁকি থাকে, আবার ডিসেম্বরের পরে রোপণ করলে আগাম বন্যার আঘাত হানার আগেই ধান পাকার সুযোগ পায় না। এই দ্বিমুখী সংকটের কারণে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থা অনিশ্চয়তায় দোলে। অথচ রবি মৌসুমে হাওরের মোট আবাদি জমির প্রায় ৪০ শতাংশই পতিত থাকে। এই বিশাল পতিত জমিকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করেছে সরিষা।

গবেষণার প্রথম বছর (২০২৩-২০২৪) ছয়টি স্বল্পমেয়াদী সরিষার জাত তিনটি ভিন্ন বপন সময়ে পরীক্ষা করা হয়। ২০ নভেম্বর বপন করা বিনা সরিষা-৯ সর্বোচ্চ ফলন দিতে সক্ষম হয়, যার কাছাকাছি ছিল বারি সরিষা-১৭। সরিষা কাটার পর একই জমিতে রোপণ করা ব্রি ধান১০০ হেক্টরপ্রতি গড়ে ৬.২ টন ফলন দেয়, যা পুরো শস্যক্রমকে অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক প্রমাণ করে। দ্বিতীয় বছরে (২০২৪-২০২৫) নির্বাচিত দুটি জাতকে ভিন্ন সার ও বীজ হার ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষা করে দেখা যায়, প্রস্তাবিত ৮ কেজি বীজ ও শতভাগ সার প্রয়োগে বিনা সরিষা-৯ সর্বোচ্চ ফলন দেয়। এই সরিষার পর হাইব্রিড বোরো ‘সবুজ সাথী’ হেক্টরপ্রতি গড়ে ৬.৪ টন ফলন দেয় এবং পুরো শস্যক্রমে ধানের সমতুল্য ফলন দাঁড়ায় ১০.১ টন, যা কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে এক বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বর্তমানে তৃতীয় বছরের গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

হাওর অঞ্চলের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী উপজেলা সম্পূর্ণ হাওরবেষ্টিত এবং আরও পাঁচটি উপজেলা আংশিকভাবে হাওরের অন্তর্ভুক্ত। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা প্রায় পুরোটাই কৃষিনির্ভর। ইতিহাস বলে, ১৯৭৪, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪, ২০১০ ও ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যা এই অঞ্চলের কৃষকদের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যার ধরন আরও অনিয়মিত ও তীব্র হওয়ায় জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। প্রতি বছর একই সময়ে বন্যার পানি নেমে না যাওয়ায় সরিষা বপনের সময় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া, সব জমি সরিষা চাষের জন্য উপযোগী নয়; বিশেষ করে উঁচু বা মাঝারি উঁচু কান্দা জমিগুলোই বেশি উপযুক্ত। অক্টোবরের শেষ বা নভেম্বরের শুরুতে অপ্রত্যাশিত বৃষ্টিপাতও বপন ও প্রাথমিক বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

মাঠপর্যায়ে এই গবেষণার ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। কুড়ারকান্দির কৃষক হাসন রাজা জানান, আগে উঁচু জমিতে ভুট্টা চাষ করে ক্ষতির মুখে পড়তেন। এখন সরিষা চাষ করে লাভের আশা করছেন এবং তার দেখাদেখি অন্য কৃষকরাও আগ্রহী হচ্ছেন। আরেক কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, তিনি গত তিন বছর ধরে সরিষা চাষ করছেন এবং নিজ হাতে সরিষা ভেঙে তেল ব্যবহার করতে পারছেন, যা তার কাছে এক বড় অর্জন।

বাউরেসের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাম্মাদুর রহমান বলেন, গত ১৫ বছরে হাওরের কৃষির ধরণ বদলেছে। আগে শুধু ধান ছিল, এখন ভুট্টা ও সরিষাও হচ্ছে। জমিকে যত বহুমুখীভাবে ব্যবহার করা যাবে, কৃষকের আয় তত বাড়বে। তিনি প্রত্যাশা করেন, এই গবেষণার মাধ্যমে হাওরে সরিষা চাষ আরও বিস্তার লাভ করবে এবং জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যেও কৃষকরা আয় ও খাদ্য নিরাপত্তায় নতুন স্থিতিশীলতা খুঁজে পাবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

হাওরের কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে সরিষার বিপ্লব: বোরোর ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন দিগন্ত

আপডেট সময় : ০৫:১১:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলের কৃষকদের সারা বছরের জীবন-জীবিকা মূলত বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রতি বছর আগাম বন্যার ছোবলে যখন পাকা ধানের ক্ষেত তলিয়ে যায়, তখন কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে যায়, বাড়ে ঋণের বোঝা আর অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তাদের ভবিষ্যৎ। এই একমুখী নির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে এবং কৃষকদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করতে এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একটি যুগান্তকারী গবেষণা। এই গবেষণা হাওরের পতিত জমিতে স্বল্পমেয়াদী সরিষা চাষের মাধ্যমে লাভজনক শস্যক্রম তৈরির উজ্জ্বল সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে।

গবেষকরা বলছেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর এবং বোরো ধান রোপণের আগে যে বিশাল সময়টুকু অব্যবহৃত থাকে, সেই পতিত জমিতে সরিষা আবাদ করে কৃষকরা অন্তত একটি অতিরিক্ত ফসল ঘরে তুলতে পারবেন। এতে একদিকে যেমন জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কুড়ারকান্দি এলাকায় পরিচালিত এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. মমিনুল ইসলাম। তার সঙ্গে সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন অধ্যাপক ড. মো. পারভেজ আনোয়ার। ‘কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে বিদ্যমান পতিত-বোরো-পতিত ফসল ক্রমে সরিষা প্রবর্তন’ শীর্ষক এই প্রকল্পটি ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম (বাউরেস)-এর তত্ত্বাবধানে এবং সিটি ব্যাংক-এর অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে।

হাওরে বোরো ধান চাষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক সময়ে রোপণ। ডিসেম্বরের আগে রোপণ করলে ঠান্ডায় ধানের শীষে দানা বন্ধ্যা হওয়ার ঝুঁকি থাকে, আবার ডিসেম্বরের পরে রোপণ করলে আগাম বন্যার আঘাত হানার আগেই ধান পাকার সুযোগ পায় না। এই দ্বিমুখী সংকটের কারণে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থা অনিশ্চয়তায় দোলে। অথচ রবি মৌসুমে হাওরের মোট আবাদি জমির প্রায় ৪০ শতাংশই পতিত থাকে। এই বিশাল পতিত জমিকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করেছে সরিষা।

গবেষণার প্রথম বছর (২০২৩-২০২৪) ছয়টি স্বল্পমেয়াদী সরিষার জাত তিনটি ভিন্ন বপন সময়ে পরীক্ষা করা হয়। ২০ নভেম্বর বপন করা বিনা সরিষা-৯ সর্বোচ্চ ফলন দিতে সক্ষম হয়, যার কাছাকাছি ছিল বারি সরিষা-১৭। সরিষা কাটার পর একই জমিতে রোপণ করা ব্রি ধান১০০ হেক্টরপ্রতি গড়ে ৬.২ টন ফলন দেয়, যা পুরো শস্যক্রমকে অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক প্রমাণ করে। দ্বিতীয় বছরে (২০২৪-২০২৫) নির্বাচিত দুটি জাতকে ভিন্ন সার ও বীজ হার ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষা করে দেখা যায়, প্রস্তাবিত ৮ কেজি বীজ ও শতভাগ সার প্রয়োগে বিনা সরিষা-৯ সর্বোচ্চ ফলন দেয়। এই সরিষার পর হাইব্রিড বোরো ‘সবুজ সাথী’ হেক্টরপ্রতি গড়ে ৬.৪ টন ফলন দেয় এবং পুরো শস্যক্রমে ধানের সমতুল্য ফলন দাঁড়ায় ১০.১ টন, যা কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে এক বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বর্তমানে তৃতীয় বছরের গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

হাওর অঞ্চলের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী উপজেলা সম্পূর্ণ হাওরবেষ্টিত এবং আরও পাঁচটি উপজেলা আংশিকভাবে হাওরের অন্তর্ভুক্ত। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা প্রায় পুরোটাই কৃষিনির্ভর। ইতিহাস বলে, ১৯৭৪, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪, ২০১০ ও ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যা এই অঞ্চলের কৃষকদের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যার ধরন আরও অনিয়মিত ও তীব্র হওয়ায় জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। প্রতি বছর একই সময়ে বন্যার পানি নেমে না যাওয়ায় সরিষা বপনের সময় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া, সব জমি সরিষা চাষের জন্য উপযোগী নয়; বিশেষ করে উঁচু বা মাঝারি উঁচু কান্দা জমিগুলোই বেশি উপযুক্ত। অক্টোবরের শেষ বা নভেম্বরের শুরুতে অপ্রত্যাশিত বৃষ্টিপাতও বপন ও প্রাথমিক বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

মাঠপর্যায়ে এই গবেষণার ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। কুড়ারকান্দির কৃষক হাসন রাজা জানান, আগে উঁচু জমিতে ভুট্টা চাষ করে ক্ষতির মুখে পড়তেন। এখন সরিষা চাষ করে লাভের আশা করছেন এবং তার দেখাদেখি অন্য কৃষকরাও আগ্রহী হচ্ছেন। আরেক কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, তিনি গত তিন বছর ধরে সরিষা চাষ করছেন এবং নিজ হাতে সরিষা ভেঙে তেল ব্যবহার করতে পারছেন, যা তার কাছে এক বড় অর্জন।

বাউরেসের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাম্মাদুর রহমান বলেন, গত ১৫ বছরে হাওরের কৃষির ধরণ বদলেছে। আগে শুধু ধান ছিল, এখন ভুট্টা ও সরিষাও হচ্ছে। জমিকে যত বহুমুখীভাবে ব্যবহার করা যাবে, কৃষকের আয় তত বাড়বে। তিনি প্রত্যাশা করেন, এই গবেষণার মাধ্যমে হাওরে সরিষা চাষ আরও বিস্তার লাভ করবে এবং জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যেও কৃষকরা আয় ও খাদ্য নিরাপত্তায় নতুন স্থিতিশীলতা খুঁজে পাবে।