ঢাকা ০৯:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নারীর আত্মপরিচয় ও নিরাপদ খাবারের অঙ্গীকার: সেলিমার ‘সম্রাজ্ঞী’স কিচেন’

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৫৫:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

বর্তমান সময়ে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের নিশ্চয়তা এক বড় চ্যালেঞ্জ। বাজারের আকর্ষণীয় মোড়কের আড়ালে যখন লুকিয়ে থাকে অস্বাস্থ্যকর রাসায়নিক দ্রব্য আর কৃত্রিম রঙ, তখন অনেকেই আস্থা খুঁজছেন ঘরোয়া পরিবেশে তৈরি খাবারের দিকে। এই আস্থার জায়গা থেকেই আত্মনির্ভরতার এক স্বপ্ন বুনেছেন উদ্যোক্তা সেলিমা সুলতানা নীলু। ‘সম্রাজ্ঞী’স কিচেন’ নামের একটি উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি নিজের হাতে তৈরি সস, আচার, ফলের জুসসহ নানা ধরনের সুস্বাদু ও নিরাপদ ঘরোয়া খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন মানুষের কাছে। তার এই পথচলা কেবল একটি সফল ব্যবসা নয়, বরং ভেজালমুক্ত খাবারের প্রতি আস্থা আর একজন নারীর আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার এক দৃঢ় সংকল্পের গল্প।

আত্মপরিচয়ের প্রেরণা থেকে পেশা
প্রত্যেক সফল মানুষের পেছনে থাকে কোনো না কোনো প্রেরণা। সেলিমার ক্ষেত্রে সেই অনুপ্রেরণা তিনি নিজেই। পরিবার ও সংসার সামলানোর পাশাপাশি একসময় তার মনে হয়েছে, কেবল স্ত্রী বা মা পরিচয়েই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করা জরুরি। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার ফাঁকে রান্নার প্রতি তার ছিল গভীর টান। মায়ের অজান্তেই রান্না করে প্রতিবেশীদের খাওয়ানো কিংবা স্কুলের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে রান্না ধীরে ধীরে তার নেশায় পরিণত হয়। সেই নেশাই ২০২২ সালে তাকে পেশাদারি পথে নিয়ে আসে। ‘সম্রাজ্ঞী’স কিচেন’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন।

শত বাধা ডিঙিয়ে লক্ষ্যে অবিচল
উদ্যোক্তা হিসেবে সেলিমার যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। কারও সাহায্য তো দূরের কথা, পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে বরং তাকে নেতিবাচক মন্তব্যই বেশি শুনতে হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই তিনি শিখেছেন, সমালোচনা ও নেতিবাচক কথা তাকে থামাতে পারবে না। অনেকেই কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘রান্না করে মেট্রিক পাসটাও ঠিকমতো করতে পারবি না।’ কিন্তু সেলিমা দমে যাননি। সব সমালোচককে ভুল প্রমাণ করে তিনি এসএসসি, এইচএসসি ও এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ঘর-সংসার সামলানো, এমনকি একসময় চাকরি করার পাশাপাশি তিনি নিজের আত্মপরিচয় ও স্বপ্নকে বরাবরই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। রান্না তার কাছে কেবল একটি শখ নয়, এটি এখন তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিটি পদক্ষেপে রয়েছে তার কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য ও অদম্য মনোবল। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ফ্রোজেন ফুড, আচার, সসসহ স্বাস্থ্যসম্মত ঘরোয়া পণ্য নিয়ে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতিটি পণ্যই তিনি নিজ হাতে, অত্যন্ত যত্ন ও নিখুঁত নিয়মে তৈরি করেন, যাতে গ্রাহক একইসঙ্গে পান স্বাদ ও সুস্বাস্থ্য। শুধু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নয়, অফলাইনেও শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য টিফিন আইটেম সরবরাহ করে তার উদ্যোগকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিচিত করে তুলেছেন।

স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরন্তর প্রচেষ্টা
সেলিমা কেবল পরিকল্পনাতেই থেমে থাকেন না। যেকোনো উৎসব, মেলা বা আয়োজনে তিনি নিজের স্টল নিয়ে হাজির হন। মানুষের সরাসরি প্রতিক্রিয়া তাকে নতুন করে সাহস জোগায়। সেরা রাঁধুনি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ভিন্নধর্মী খাবার তৈরি করে তিনি বহুবার বিচারকদের মন জয় করেছেন। তার খাবারের স্বাদ যিনি একবার নিয়েছেন, বেশিরভাগই আবার ফিরে এসেছেন; কারণ তিনি স্বাদের সঙ্গে আপস করেন না, স্বাস্থ্যকর উপাদানেই ভরসা রাখেন। শুরুতে প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি জেলি ছিল তার বিশেষ পরিচিতি। পরবর্তীতে আচার ও নানা ধরনের ফ্রোজেন খাবার তার পণ্যের তালিকায় যুক্ত হয়।

সনাতনী স্বাদ ও আধুনিক স্বাস্থ্যসচেতনতা
খাবার তৈরিতে সেলিমা সনাতনী ও আধুনিক উভয় পদ্ধতি ব্যবহার করেন। তবে হোমমেড ফুড হওয়ায় তার কাছে সনাতনী পদ্ধতির গুরুত্ব বেশি; বিশেষ করে আচার তৈরির সময় তিনি সেগুলো ছাদে রোদে শুকিয়ে নেন। এ বিষয়ে সেলিমা জানান, ঢাকা শহরে রোদ পাওয়া কষ্টকর হলেও, আচার রোদে শুকালে একইসঙ্গে ‘ভিটামিন ডি’ পাওয়া যায়, যা খাবারকে আরও পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর করে তোলে। সেলিমার তৈরি বিশেষ পণ্য আচার, সস ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন, অফলাইনসহ স্থানীয় বাজারে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শ
নতুন নারী উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে সেলিমা বলেন, ‘আমি চাই না কোনো নারী বেকার থাকুক। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের দক্ষতা কাজে লাগাতে হবে। নিজের আগ্রহ ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। এতে কেবল নিজের পরিচয়ই তৈরি হয় না, স্বপ্নকেও বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়।’

আজ ‘সম্রাজ্ঞী’স কিচেন’ শুধু ঘরে তৈরি খাবারের একটি ব্যবসা নয়, এটি এক নারীর আত্মবিশ্বাস, নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও স্বপ্নের প্রতীক। ঘরে তৈরি খাবারের স্বাদকে তিনি গ্রাহকের আস্থা ও বাজারের একটি পরিচিত ব্র্যান্ডে রূপান্তরিত করেছেন। সেলিমার এই পথচলা দেখিয়েছে, যেকোনো স্বপ্ন কঠিন হলেও ধৈর্য, নিষ্ঠা আর অটুট মনোবল থাকলেই তা বাস্তবে রূপ নেয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

গোবিন্দগঞ্জে নিজ বাড়িতে স্কুলশিক্ষিকাকে হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধে হত্যা

নারীর আত্মপরিচয় ও নিরাপদ খাবারের অঙ্গীকার: সেলিমার ‘সম্রাজ্ঞী’স কিচেন’

আপডেট সময় : ০১:৫৫:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বর্তমান সময়ে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের নিশ্চয়তা এক বড় চ্যালেঞ্জ। বাজারের আকর্ষণীয় মোড়কের আড়ালে যখন লুকিয়ে থাকে অস্বাস্থ্যকর রাসায়নিক দ্রব্য আর কৃত্রিম রঙ, তখন অনেকেই আস্থা খুঁজছেন ঘরোয়া পরিবেশে তৈরি খাবারের দিকে। এই আস্থার জায়গা থেকেই আত্মনির্ভরতার এক স্বপ্ন বুনেছেন উদ্যোক্তা সেলিমা সুলতানা নীলু। ‘সম্রাজ্ঞী’স কিচেন’ নামের একটি উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি নিজের হাতে তৈরি সস, আচার, ফলের জুসসহ নানা ধরনের সুস্বাদু ও নিরাপদ ঘরোয়া খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন মানুষের কাছে। তার এই পথচলা কেবল একটি সফল ব্যবসা নয়, বরং ভেজালমুক্ত খাবারের প্রতি আস্থা আর একজন নারীর আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার এক দৃঢ় সংকল্পের গল্প।

আত্মপরিচয়ের প্রেরণা থেকে পেশা
প্রত্যেক সফল মানুষের পেছনে থাকে কোনো না কোনো প্রেরণা। সেলিমার ক্ষেত্রে সেই অনুপ্রেরণা তিনি নিজেই। পরিবার ও সংসার সামলানোর পাশাপাশি একসময় তার মনে হয়েছে, কেবল স্ত্রী বা মা পরিচয়েই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করা জরুরি। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার ফাঁকে রান্নার প্রতি তার ছিল গভীর টান। মায়ের অজান্তেই রান্না করে প্রতিবেশীদের খাওয়ানো কিংবা স্কুলের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে রান্না ধীরে ধীরে তার নেশায় পরিণত হয়। সেই নেশাই ২০২২ সালে তাকে পেশাদারি পথে নিয়ে আসে। ‘সম্রাজ্ঞী’স কিচেন’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন।

শত বাধা ডিঙিয়ে লক্ষ্যে অবিচল
উদ্যোক্তা হিসেবে সেলিমার যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। কারও সাহায্য তো দূরের কথা, পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে বরং তাকে নেতিবাচক মন্তব্যই বেশি শুনতে হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই তিনি শিখেছেন, সমালোচনা ও নেতিবাচক কথা তাকে থামাতে পারবে না। অনেকেই কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘রান্না করে মেট্রিক পাসটাও ঠিকমতো করতে পারবি না।’ কিন্তু সেলিমা দমে যাননি। সব সমালোচককে ভুল প্রমাণ করে তিনি এসএসসি, এইচএসসি ও এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ঘর-সংসার সামলানো, এমনকি একসময় চাকরি করার পাশাপাশি তিনি নিজের আত্মপরিচয় ও স্বপ্নকে বরাবরই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। রান্না তার কাছে কেবল একটি শখ নয়, এটি এখন তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিটি পদক্ষেপে রয়েছে তার কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য ও অদম্য মনোবল। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ফ্রোজেন ফুড, আচার, সসসহ স্বাস্থ্যসম্মত ঘরোয়া পণ্য নিয়ে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতিটি পণ্যই তিনি নিজ হাতে, অত্যন্ত যত্ন ও নিখুঁত নিয়মে তৈরি করেন, যাতে গ্রাহক একইসঙ্গে পান স্বাদ ও সুস্বাস্থ্য। শুধু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নয়, অফলাইনেও শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য টিফিন আইটেম সরবরাহ করে তার উদ্যোগকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিচিত করে তুলেছেন।

স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরন্তর প্রচেষ্টা
সেলিমা কেবল পরিকল্পনাতেই থেমে থাকেন না। যেকোনো উৎসব, মেলা বা আয়োজনে তিনি নিজের স্টল নিয়ে হাজির হন। মানুষের সরাসরি প্রতিক্রিয়া তাকে নতুন করে সাহস জোগায়। সেরা রাঁধুনি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ভিন্নধর্মী খাবার তৈরি করে তিনি বহুবার বিচারকদের মন জয় করেছেন। তার খাবারের স্বাদ যিনি একবার নিয়েছেন, বেশিরভাগই আবার ফিরে এসেছেন; কারণ তিনি স্বাদের সঙ্গে আপস করেন না, স্বাস্থ্যকর উপাদানেই ভরসা রাখেন। শুরুতে প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি জেলি ছিল তার বিশেষ পরিচিতি। পরবর্তীতে আচার ও নানা ধরনের ফ্রোজেন খাবার তার পণ্যের তালিকায় যুক্ত হয়।

সনাতনী স্বাদ ও আধুনিক স্বাস্থ্যসচেতনতা
খাবার তৈরিতে সেলিমা সনাতনী ও আধুনিক উভয় পদ্ধতি ব্যবহার করেন। তবে হোমমেড ফুড হওয়ায় তার কাছে সনাতনী পদ্ধতির গুরুত্ব বেশি; বিশেষ করে আচার তৈরির সময় তিনি সেগুলো ছাদে রোদে শুকিয়ে নেন। এ বিষয়ে সেলিমা জানান, ঢাকা শহরে রোদ পাওয়া কষ্টকর হলেও, আচার রোদে শুকালে একইসঙ্গে ‘ভিটামিন ডি’ পাওয়া যায়, যা খাবারকে আরও পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর করে তোলে। সেলিমার তৈরি বিশেষ পণ্য আচার, সস ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন, অফলাইনসহ স্থানীয় বাজারে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শ
নতুন নারী উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে সেলিমা বলেন, ‘আমি চাই না কোনো নারী বেকার থাকুক। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের দক্ষতা কাজে লাগাতে হবে। নিজের আগ্রহ ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। এতে কেবল নিজের পরিচয়ই তৈরি হয় না, স্বপ্নকেও বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়।’

আজ ‘সম্রাজ্ঞী’স কিচেন’ শুধু ঘরে তৈরি খাবারের একটি ব্যবসা নয়, এটি এক নারীর আত্মবিশ্বাস, নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও স্বপ্নের প্রতীক। ঘরে তৈরি খাবারের স্বাদকে তিনি গ্রাহকের আস্থা ও বাজারের একটি পরিচিত ব্র্যান্ডে রূপান্তরিত করেছেন। সেলিমার এই পথচলা দেখিয়েছে, যেকোনো স্বপ্ন কঠিন হলেও ধৈর্য, নিষ্ঠা আর অটুট মনোবল থাকলেই তা বাস্তবে রূপ নেয়।