বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬-এর উত্তেজনা, রোমাঞ্চ ও নাটकीयতার সব পর্ব সফলভাবে পেরিয়ে এখন আর মাত্র একটি ঐতিহাসিক ম্যাচের অপেক্ষা বাকি রয়েছে। বিশ্ব ফুটবলের মেগা ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। কে উঁচিয়ে ধরবে ফুটবলের সেই কাঙ্ক্ষিত সোনালি ট্রফি—সেই কোটি টাকার প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর মিলবে রবিবার রাতে অনুষ্ঠিতব্য স্পেন বনাম আর্জেন্টিনার মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচে। তবে মাঠের মূল শিরোপার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন (ফিফা) টুর্নামেন্ট শেষে খেলোয়াড় ও দলগুলোর জন্য বেশ কয়েকটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত ও দলীয় পুরস্কারও আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেবে।
সাধারণত খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, স্মরণীয় পারফরম্যান্স, গোলপোস্টের নিচে গোলরক্ষকদের অসামান্য অবদান, তরুণ উদীয়মান ফুটবলারদের উত্থান এবং মাঠের ভেতরে দলের সামগ্রিক শৃঙ্খলার ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বকাপের বিভিন্ন ক্যাটাগরির পুরস্কারসমূহ নির্ধারিত হয়ে থাকে। এর মধ্যে কিছু বিশেষ পুরস্কারের চূড়ান্ত বিজয়ী ফাইনাল ম্যাচ শেষ হওয়ার পর নির্ধারিত হলেও, বেশ কয়েকটি পুরস্কারের সিদ্ধান্ত ফাইনাল ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই গ্রহণ করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই ফাইনালে ওঠা দুই পরাশক্তি দলের খেলোয়াড়রাই বেশির ভাগ পুরস্কারের প্রধান দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হন। তবে এবার অন্য দলগুলোর কয়েকজন ফুটবলারও নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছেন।
বিশ্বকাপ শেষে ফিফা মূলত যে সমস্ত প্রধান পুরস্কার দিয়ে থাকে, সেগুলো হলো:
- গোল্ডেন বুট: টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার।
- গোল্ডেন বল: টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার।
- গোল্ডেন গ্লাভস: টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার।
- সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় (ইয়াং প্লেয়ার): অনূর্ধ্ব-২১ বছর বয়সী সেরা তরুণ ফুটবলারের পুরস্কার।
- ফেয়ার প্লে পুরস্কার: টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও ভদ্র দলের পুরস্কার।
- টুর্নামেন্টের সেরা গোল: বিশ্বকাপের সবচেয়ে দর্শনীয় ও শৈল্পিক গোলের পুরস্কার।
গোল্ডেন বুট ও ২০২৬ বিশ্বকাপের জমজমাট লড়াই: বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী, গোল্ডেন বুট পুরস্কারটি দেওয়া হয় টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে। বিগত ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে একাই ৮টি গোল করে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারটি জিতেছিলেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। ফিফার নিয়ম অনুসারে, টুর্নামেন্ট শেষে যদি একাধিক খেলোয়াড়ের গোলসংখ্যা সমান হয়ে যায়, তবে যে খেলোয়াড়ের অ্যাসিস্ট (গোল করানো) বেশি থাকবে, তাঁকে বিজয়ী নির্ধারণ করা হবে। এরপরও যদি অ্যাসিস্টের সংখ্যা সমান থাকে, তবে কম সময় মাঠে খেলে গোল ও অ্যাসিস্ট করা খেলোয়াড়ই গোল্ডেন বুট পাবেন।
চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুটের এই লড়াইটি মূলত আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসি এবং ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের মধ্যে জমে উঠেছে। ফাইনাল ম্যাচের আগে দুজনেরই গোলসংখ্যা সমান ৮টি। তবে অ্যাসিস্টের দিক থেকে এমবাপ্পের চেয়ে এগিয়ে আছেন মেসি। মেসির নামের পাশে রয়েছে ৪টি অ্যাসিস্ট, আর এমবাপ্পের রয়েছে ৩টি অ্যাসিস্ট। ফলে টাইব্রেকারের এই সমীকরণে এই মুহূর্তে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে আছেন আর্জেন্টাইন খুদে জাদুকর।
গোল্ডেন বুট জয়ের দৌড়ে শীর্ষ তারকাদের অবস্থান:
- লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা): ৮ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট
- কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স): 8 গোল, ৩ অ্যাসিস্ট
- আর্লিং হলান্ড (নরওয়ে): ৭ গোল
- জুড বেলিংহাম (ইংল্যান্ড): ৬ গোল, ১ অ্যাসিস্ট
- হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড): ৬ গোল, ১ অ্যাসিস্ট
- উসমান দেম্বেলে (ফ্রান্স): ৫ গোল, ২ অ্যাসিস্ট
- মিকেল ওইয়ারসাবাল (স্পেন): ৫ গোল, ১ অ্যাসিস্ট
গোল্ডেন বল ও সেরা খেলোয়াড়ের লড়াই: বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়কে দেওয়া হয় ‘গোল্ডেন বল’। কাতার বিশ্বকাপের সর্বশেষ আসরে এই পুরস্কার জিতেছিলেন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপ চলাকালেই মূলত এই পুরস্কারের জন্য খেলোয়াড় বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ (টিএসজি) সম্ভাব্য দাবিদারদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে এবং পরবর্তীতে বিশ্বকাপ কাভার করতে আসা স্বীকৃত গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের ভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয়ী নির্ধারিত হয়। ভোটে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারী খেলোয়াড়রা পান যথাক্রমে সিলভার বল ও ব্রোঞ্জ বল।
১৯৭৮ সালে চালু হওয়া এই পুরস্কারটি অনেকবারই এমন খেলোয়াড়দের হাতে উঠেছে, যাঁদের দল শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ট্রফি জিততে পারেনি। এর উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—২০০২ সালে জার্মানির অলিভার কান, ২০০৬ সালে জিনেদিন জিদান, ২০১০ সালে দিয়েগো ফোরলান, ২০১৪ সালে লিওনেল মেসি এবং ২০১৮ সালে লুকা মদরিচ ফাইনালে হেরেও গোল্ডেন বল জয় করেছিলেন। এর মধ্যে অলিভার কানই এখন পর্যন্ত ইতিহাসের একমাত্র গোলরক্ষক যিনি গোল্ডেন বল জিতেছেন। এই পুরস্কারের কোনো কোনো বছরের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুটবল মহলে বিতর্কও হয়েছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে লিওনেল মেসিই একমাত্র ফুটবলার, যিনি দুইবার গোল্ডেন বল জেতার অনন্য কীর্তি গড়েছেন। এবারও সম্ভাব্য বিজয়ীদের তালিকার শীর্ষে আছেন ৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবল কিংবদন্তি। তাঁর পাশাপাশি এই দৌড়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন স্পেনের রদ্রি ও মিকেল ওইয়ারসাবাল, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ও তাঁর সতীর্থ মাইকেল ওলিসে। এ ছাড়া অন্য দলগুলোর দাবিদারদের মধ্যে আছেন ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহাম, নরওয়ের আর্লিং হলান্ড এবং কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া।
গোল্ডেন গ্লাভস ও সেরা গোলরক্ষকের লড়াই: বিশ্বকাপের সেরা গোলরক্ষককে দেওয়া হয় ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ পুরস্কার, যার সর্বশেষ বিজয়ী ছিলেন আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। গোলরক্ষকের ম্যাচে সামগ্রিক প্রভাব, গুরুত্বপূর্ণ সেভ এবং ক্লিন শিটের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এই পুরস্কারের বিজয়ী নির্ধারণ করা হয়। ১৯৯৪ সালে চালু হওয়া এই পুরস্কারটি ২০১০ সাল পর্যন্ত ‘লেভ ইয়াশিন’ পুরস্কার নামে পরিচিত ছিল। সর্বশেষ পাঁচ বিশ্বকাপের চারটিতেই এই পুরস্কারটি জিতেছে শিরোপাজয়ী দলের গোলরক্ষক।
এবারের বিশ্বকাপে গোলরক্ষকদের পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। একের পর এক দুর্দান্ত ও অবিশ্বাস্য সেভ করে তিনি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। এমনকি তাঁকে দলে নেওয়ার জন্য আমেরিকান মেজর লিগ সকারের (MLS) ক্লাব ইন্টার মায়ামিও আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে তাঁর দল শেষ ৩২ থেকে বিদায় নেওয়ায় পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি কিছুটা পিছিয়ে পড়তে পারেন। এই ক্যাটাগরিতে সবার ওপরে রয়েছেন স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন, যিনি এখন পর্যন্ত ৭ ম্যাচ খেলে মাত্র ১টি গোল হজম করেছেন। অন্যদের মধ্যে আছেন ইংল্যান্ডের জর্ডান পিকফোর্ড, প্যারাগুয়ের অরলান্ডো গিল, পর্তুগালের দিওগো কস্তা, সুইজারল্যান্ডের গ্রেগর কোবেল, মরক্কোর ইয়াসিন বুনু এবং মিসরের মোস্তফা শোবেইর।
সেরা উদীয়মান ও ইয়াং প্লেয়ার পুরস্কার: ২০০৬ সালে চালু হওয়া এই পুরস্কারটি দেওয়া হয় অনূর্ধ্ব-২১ বছর বয়সী সেরা তরুণ ফুটবলারকে। ২০২২ বিশ্বকাপে এই পুরস্কার জিতেছিলেন আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ। এবারের আসরে এই পুরস্কারের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন স্পেনের দুই তরুণ বিস্ময় বালক লামিনে ইয়ামাল ও পাউ কুবারসি, যাঁরা ইতিমধ্যেই স্পেনের হয়ে ফাইনালে উঠেছেন। এ ছাড়া ফ্রান্সের দেজিরে দুয়ে, ইংল্যান্ডের নিকো ও’রাইলি এবং মরক্কোর মিডফিল্ডার আইয়ুব বুয়াদ্দিও নজরকাড়া পারফরম্যান্সের কারণে এই দৌড়ে শামিল আছেন।
ফেয়ার প্লে ও টুর্নামেন্টসেরা গোলের লড়াই: বিশ্বকাপে সবচেয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও খেলোয়াড়সুলভ আচরণ করা দলকে দেওয়া হয় ‘ফেয়ার প্লে পুরস্কার’, যার সর্বশেষ বিজয়ী ছিল ইংল্যান্ড। এই পুরস্কারের জন্য কেবল গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে শেষ ৩২-এর নকআউটে ওঠা দলগুলোকেই বিবেচনা করা হয়। ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি চারবার এই পুরস্কার জিতেছে ব্রাজিল। এবারও এই পুরস্কারের সম্ভাব্য দাবিদারদের তালিকায় রয়েছে স্পেন, ফ্রান্স ও নরওয়ে।
অন্যদিকে, ‘টুর্নামেন্টসেরা গোল’ বা ‘গোল অব দ্য টুর্নামেন্ট’ পুরস্কারটি সম্পূর্ণ ফুটবলপ্রেমীদের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনাল থেকে বাছাই করা সেরা ৬টি গোলের মধ্য থেকে দর্শকদের ভোটে সেরা গোলটি নির্বাচিত হবে। ২০২২ বিশ্বকাপে সার্বিয়ার বিপক্ষে ব্রাজিলের রিচার্লিসনের বাইসাইকেল কিকের গোলটি সেরা নির্বাচিত হয়েছিল।
এবারের আসরে ইতিমধ্যেই গ্রুপ পর্বের সেরা গোল হিসেবে উজবেকিস্তানের এলদর শোমুরোদভ, শেষ ৩২-এর সেরা গোল হিসেবে কেপ ভার্দের সিডনি লোপেস কাবরাল এবং শেষ ষোলোর সেরা গোল হিসেবে নরওয়ের আর্লিং হলান্ডের গোলটি পুরস্কৃত হয়েছে। চূড়ান্ত লড়াইয়ে থাকা ৬টি গোল ও খেলোয়াড়রা হলেন:
১. কিলিয়ান এমবাপ্পে — মরক্কোর বিপক্ষে (কোয়ার্টার ফাইনাল)
২. আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ — ইংল্যান্ডের বিপক্ষে (কোয়ার্টার ফাইনাল)
৩. জুড বেলিংহাম — নরওয়ের বিপক্ষে (কোয়ার্টার ফাইনাল)
৪. হুলিয়ান আলভারেজ — সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে (কোয়ার্টার ফাইনাল)
৫. পেদ্রো পোরো — ফ্রান্সের বিপক্ষে (সেমিফাইনাল)
৬. এনজো ফার্নান্দেজ — ইংল্যান্ডের বিপক্ষে (সেমিফাইনাল)
এই বিশেষ পুরস্কারের ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া ফাইনাল ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই সম্পন্ন হয়ে যাবে এবং বিজয়ীর নামও ফাইনালের আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।
রিপোর্টারের নাম 























