সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস পবিত্র রমজানের প্রথম তারাবিতে আজ দেশের প্রতিটি মসজিদে ধ্বনিত হবে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের সুমধুর বাণী। আজকের খতম তারাবিতে পবিত্র কুরআনের প্রথম পারা সম্পূর্ণ এবং দ্বিতীয় পারার প্রথম অর্ধেক তেলাওয়াত করা হবে। যেখানে সূরা ফাতিহা এবং সূরা বাকারার প্রথম ২০৩টি আয়াতের মাধ্যমে মুমিনদের সামনে তুলে ধরা হবে সৃষ্টিতত্ত্ব, সঠিক পথের দিশা এবং জীবন পরিচালনার অমোঘ বিধান।
সূরা ফাতিহা: আল-কুরআনের সারনির্যাস
মক্কায় অবতীর্ণ সাত আয়াতের এই সূরাটি মূলত পুরো কুরআনের ভূমিকা। এর সংক্ষিপ্ত অবয়বে তাওহিদ (একত্ববাদ), রিসালাত ও আখেরাতের মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিহিত রয়েছে। সূরাটির শুরু হয়েছে বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার অশেষ প্রশংসা ও মহিমা কীর্তনের মাধ্যমে। এখানে মুমিন কেবল আল্লাহরই ইবাদত এবং তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনার অঙ্গীকার করে। এই সূরাটি মূলত একটি অনন্য দোয়া, যা মানুষকে সরল-সঠিক পথ বা ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’-এর সন্ধান দেয়। একইসঙ্গে জ্ঞানপাপী ও পথভ্রষ্টদের পথ পরিহার করে নবী-রাসূল ও নেককার বান্দাদের পথ অনুসরণের প্রেরণা জোগায়। মুফাসসিরদের মতে, সূরা ফাতিহা হলো এক আধ্যাত্মিক দর্পণ, যেখানে পুরো কুরআনের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে।
সূরা বাকারা: আদর্শ সমাজ ও ইতিহাসের শিক্ষা
মদিনায় অবতীর্ণ এই দীর্ঘ সূরার শুরুতেই ‘আলিফ-লাম-মিম’—এই রহস্যময় হরফগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর কিতাবের মাহাত্ম্য ঘোষণা করা হয়েছে। এরপরই মুমিন, কাফের ও মুনাফিকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেন বিশ্বাসীরা নিজেদের আমল ও ঈমানকে পরিশুদ্ধ করতে পারে। সূরার প্রথমাংশে মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি এবং পৃথিবীতে খলিফা হিসেবে তাঁর আগমনের রোমাঞ্চকর বিবরণ রয়েছে।
বনি ইসরাইলের উত্থান-পতন ও শিক্ষা
কুরআনের এই অংশে বনি ইসরাইল সম্প্রদায়ের অবাধ্যতা ও হঠকারিতার বিস্তারিত ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর অগণিত নেয়ামত লাভ করার পরও তারা কীভাবে অকৃতজ্ঞতা দেখিয়েছে, নবীদের হত্যা করেছে এবং বাছুর পূজার মতো জঘন্য পাপে লিপ্ত হয়েছে, তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। তাদের এই চারিত্রিক বিচ্যুতি থেকে শিক্ষা নিয়ে মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক করা হয়েছে।
ইব্রাহিম (আ.)-এর পরীক্ষা ও মিল্লাতে ইসলামি
হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর কঠিন সব পরীক্ষা এবং তাতে উত্তীর্ণ হয়ে ‘খলিলুল্লাহ’ উপাধি লাভের গৌরবোজ্জ্বল কাহিনী এই সূরার অন্যতম অনুষঙ্গ। তাঁর দোয়া ও ত্যাগের মাধ্যমেই যে ইসলামের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়েছে, তা এখানে সুস্পষ্ট। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ইসলামই হলো একমাত্র মনোনীত ধর্ম এবং ইব্রাহিম (আ.)-এর আদর্শই হলো সত্যের মাপকাঠি।
বিধান ও জীবনব্যবস্থা
আজকের তেলাওয়াতকৃত দ্বিতীয় পারার অংশে কেবলা পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আলোচিত হবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মুসলমানদের কেবলা হিসেবে কাবা শরিফ নির্ধারিত হওয়ার মাধ্যমে নবীজির হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়। পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের নানা বিধিবিধান এখানে স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—শহীদদের মর্যাদা, বিপদে ধৈর্য ধারণ, সাফা-মারওয়া পাহাড়ের তাৎপর্য, হালাল-হারামের বিধান এবং বিচার ব্যবস্থার কিসাস প্রসঙ্গ।
বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে রমজানের রোজা ও ইতিকাফের বিধান, যা তাকওয়া অর্জনের প্রধান হাতিয়ার। এছাড়া সম্পদ উপার্জনের বৈধ পন্থা, হজ্জ ও ওমরার নিয়মাবলি এবং সত্য-মিথ্যার লড়াইয়ে জিহাদের আবশ্যকতা বর্ণনার মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হবে আজকের তারাবির তেলাওয়াত। মূলত আজকের এই তিলাওয়াত মুমিনদের জন্য এক আধ্যাত্মিক পাথেয়, যা তাদের পুরো মাসজুড়ে সঠিক পথে চলার শক্তি জোগাবে।
রিপোর্টারের নাম 























