বেইজিং সময় রাত ৮টা। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শক যখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন, ঠিক তখনই শুরু হলো চীনের অন্যতম জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক আয়োজন—চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) আয়োজিত ২০২৬ সালের বসন্ত উৎসব গালা। ইংরেজি, স্প্যানিশ, ফরাসি, আরবি, রুশসহ ৮৫টি ভাষায় সম্প্রচারিত এই অনুষ্ঠানটি পৌঁছে গেছে বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের ৩,৩০০টির বেশি গণমাধ্যমের সহায়তায়, যা এই আয়োজনের বিশ্বব্যাপী প্রভাবের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
চীনা চান্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ী, এটি ‘অশ্ব বর্ষ’। চীনা সংস্কৃতিতে ঘোড়া আত্মউন্নয়ন, অধ্যবসায় এবং অগ্রগতির প্রতীক। এই দর্শনকে underpinning করে এবারের গালার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘সুদক্ষ ঘোড়া ছুটে আসছে, তার গতি অপ্রতিরোধ্য’। এই স্লোগান মানুষের স্বপ্ন পূরণের পথে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার এক শক্তিশালী বার্তা বহন করে। ১৯৮৩ সাল থেকে সম্প্রচারিত হয়ে আসা এই গালা আজ বিশ্বব্যাপী চীনা পরিবারগুলোর পুনর্মিলনী উৎসবের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২০টি দেশ ও অঞ্চলে বসন্ত উৎসব সরকারি ছুটি হিসেবে স্বীকৃত, যা এই উৎসবের বিশ্বব্যাপী বিস্তৃতি এবং প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বিশ্ব জনসংখ্যার অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দেয়।
প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যের অভূতপূর্ব মেলবন্ধন
এবারের গালার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর প্রযুক্তির ব্যবহার। হাজার হাজার ঘোড়ার সম্মিলিত দৌড়ের দৃশ্য ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে মঞ্চে জীবন্ত করে তোলা হয়েছে, যা দর্শকদের এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা দিয়েছে। একইভাবে, ‘রেশম পথ’-প্রেরণায় নির্মিত নৃত্য পরিবেশনায় প্রাচীন দেয়ালচিত্রের ঘোড়াকে যেন বাস্তব জগতে জীবন্ত করে আনা হয়েছে। দড়াবাজি বা অ্যাক্রোব্যাটিক পরিবেশনায়ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এমন অভিনব ব্যবহার দেখা গেছে যা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। ঐতিহ্যবাহী কসরতের সঙ্গে আধুনিক ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তির সংমিশ্রণ একদিকে যেমন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছে, তেমনই প্রযুক্তিগত সৌন্দর্যের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রায় তিন দশক ধরে গালার সমাপনী গান হিসেবে পরিবেশিত হয়ে আসা ‘অবিস্মরণীয় আজকের রাত’ গানটিও এ বছর আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা এর আবেদনকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
রোবটের যুগে সাংস্কৃতিক মঞ্চের নতুন দিগন্ত
২০২৬ সালের গালা কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না, বরং প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগের এক চমৎকার প্রদর্শনীও হয়ে উঠেছিল। সিএমজি’র স্টুডিওতে চার ধরনের হিউম্যানয়েড রোবট মঞ্চে পারফর্ম করেছে এবং নেপথ্যে বিভিন্ন সেবামূলক কাজ করেছে। গ্যালাক্সি জেনারেল, সংইয়ান ডাইনামিক্স, ইউশু টেকনোলজি এবং ম্যাজিক অ্যাটম—এই চারটি প্রতিষ্ঠানের রোবট একসঙ্গে মঞ্চে অংশগ্রহণ করে প্রযুক্তির অগ্রগতির এক স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। যদিও ২০২৫ সালের গালায় প্রথমবার রোবট পারফরম্যান্সের সূচনা হয়েছিল, তবে এবারের আয়োজন চীনের হিউম্যানয়েড রোবট প্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশের প্রমাণ বহন করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি কেবল প্রযুক্তি প্রদর্শনী নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ের হিউম্যানয়েড রোবট উন্নয়ন কৌশল বাস্তবায়নের এক বাস্তব উদাহরণ, যা শিল্পক্ষেত্রে রোবটের বিস্তৃত প্রয়োগের সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে।
বরফের শহর হারবিনে অনন্য শাখা ভেন্যু
চীনের উত্তরাঞ্চলের শহর হারবিন এবারের গালার শাখা ভেন্যুগুলোর মধ্যে অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ছিল। ‘বরফ শহর’ নামে পরিচিত এই শহরের মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে বরফ ও তুষার দিয়ে। হারবিন আইস ওয়ার্ল্ডে নির্মিত মঞ্চে বড় প্রযুক্তিগত পর্দা না থাকলেও, বরফের স্বচ্ছতা ও আলোছায়ার এক অনন্য সমন্বয় দর্শকদের এক ভিন্নধর্মী আবহ উপহার দিয়েছে। স্থানীয় শিল্পী, অভিনেতা ও গায়কদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানগুলো শহরের আন্তরিকতা ও উৎসবমুখর পরিবেশকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে।
দুবাইয়ের আকাশে চীনা উৎসবের আলো
চীনা বসন্ত উৎসবের বৈশ্বিক প্রভাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ দেখা গেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বুর্জ খলিফা ভবনে। বসন্ত উৎসবের প্রাক্কালে সেখানে সিএমজি’র বিশেষ আলোক প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়, যা টানা সপ্তম বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এই প্রদর্শনীতে গালার মাসকট, প্রাচীন চীনা অক্ষরে ‘ঘোড়া’, এবং দ্রুতগামী ঘোড়ার দৃশ্য ভবনের গায়ে ভেসে ওঠে। আয়োজকদের মতে, এটি নতুন যুগে চীনের সাহসিকতা, সংগ্রাম ও উন্নয়নের প্রতীক। ঘোড়া চীন ও আরব—উভয় সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতীক হওয়ায় এই আয়োজন দুই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক সংযোগকেও তুলে ধরেছে। অসংখ্য পর্যটক ও স্থানীয় মানুষ এই মনোমুগ্ধকর প্রদর্শনী উপভোগ করেছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুভেচ্ছা ও কূটনৈতিক বার্তা
চীনা নববর্ষ উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানরা চীনা জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়া-চীন কৌশলগত অংশীদারিত্বের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে দুই দেশের সহযোগিতা আরও গভীর হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চীনের আধুনিকায়ন ও বৈশ্বিক উদ্যোগের প্রশংসা করেন। এ ছাড়া নেপাল, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারাও চীনের উন্নয়ন ও জনগণের সুখ-সমৃদ্ধি কামনা করেছেন, যা এই উৎসবের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্বায়নের প্রতীক
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের চীনা বসন্ত উৎসব গালা কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না; এটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক বন্ধনের এক অনন্য সম্মিলন। বেইজিংয়ের মঞ্চ থেকে হারবিনের বরফ নগরী, আবার দুবাইয়ের আকাশচুম্বী ভবন পর্যন্ত—চীনা নববর্ষ এখন সত্যিই এক বিশ্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই আয়োজন প্রমাণ করেছে যে—ঐতিহ্য যখন প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয় এবং সংস্কৃতি যখন বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে যায়, তখন একটি উৎসব কেবল একটি দেশের নয়, বরং পুরো মানবসমাজের সম্পদে পরিণত হয়।
—
রিপোর্টারের নাম 






















