বিনোদন প্রতিবেদক
সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত একাধিক চলচ্চিত্রের নির্মাণকাজ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড়ে দীর্ঘ বিলম্বের কারণে। সংশ্লিষ্ট নির্মাতা ও প্রযোজকরা বলছেন, সময়মতো অর্থ না পাওয়ায় শুটিং, শিল্পীদের শিডিউল, লোকেশন বুকিং এবং মুক্তির পরিকল্পনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশ ও নতুন নির্মাতাদের উৎসাহ দিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১২টি পূর্ণদৈর্ঘ্য এবং ২০টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রসহ মোট ৩২টি প্রকল্পে সরকারি অনুদান দেওয়া হয়। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য ৭৫ লাখ টাকা এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।
সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রথম কিস্তির ২০ শতাংশ অর্থ পেয়েছিলেন অনুদানপ্রাপ্ত নির্মাতারা। তবে প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরও দ্বিতীয় কিস্তির ৫০ শতাংশ অর্থ এখনও পাননি তারা।
মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন
অনুদানের অর্থ ছাড়ে বিলম্বের বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন ‘জীবন অপেরা’র নির্মাতা আলভী আহমেদ, ‘পরোটার স্বাদ’-এর নির্মাতা সিংখানু মারমা, ‘জলযুদ্ধ’-এর নির্মাতা গোলাম সোহরাব দোদুল এবং ‘রবিনহুডের আশ্চর্য অভিযান’-এর প্রযোজক জগন্ময় পাল।
তাদের দাবি, অর্থ ছাড়ে বিলম্বের কারণে শিল্পীদের শিডিউল, মৌসুমভিত্তিক শুটিং এবং নির্ধারিত সময়ে চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শুটিং শুরু করতেও পারছেন না অনেকে
‘জলযুদ্ধ’ চলচ্চিত্রের নির্মাতা গোলাম সোহরাব দোদুল বলেন, তার ছবির মোট বাজেট অনুদানের টাকার চেয়ে অনেক বেশি। সরকারি অর্থের পাশাপাশি অন্য উৎস থেকেও বিনিয়োগ সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ না পাওয়ায় সেই প্রক্রিয়াও আটকে গেছে।
তিনি বলেন, “একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিল্পীদের সময়, লোকেশন, কারিগরি টিম—সবকিছু আগে থেকেই নির্ধারণ করতে হয়। অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হলে পুরো পরিকল্পনা ভেঙে যায়।”
শিল্পীদের শিডিউল হারানোর শঙ্কা
শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘রবিনহুডের আশ্চর্য অভিযান’-এর প্রযোজক জগন্ময় পাল জানান, প্রথম কিস্তির অর্থ পাওয়ার পর শিল্পীদের শিডিউল চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ না পাওয়ায় শুটিং শুরু করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, “যেসব শিল্পীর সময় নিয়েছিলাম, তাদের ছেড়ে দিতে হয়েছে। এখন নতুন করে সময় নিতে গেলে অনেকেই হয়তো আর সময় দিতে পারবেন না। এতে পুরো প্রযোজনা পরিকল্পনা পিছিয়ে যাবে।”
সময় হারাচ্ছে ‘পরোটার স্বাদ’
পাহাড়ি অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে নির্মিতব্য ‘পরোটার স্বাদ’ চলচ্চিত্রের নির্মাতা সিংখানু মারমা বলেন, ছবিটির অনেক দৃশ্য নির্দিষ্ট ঋতু ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল।
তার ভাষ্য, “অর্থ না পাওয়ায় আমরা গুরুত্বপূর্ণ সময় হারিয়ে ফেলছি। আমার ছবির অধিকাংশ শিল্পী শিশু। দীর্ঘদিন প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর এখন শুটিং বিলম্বিত হলে তারা চরিত্রের বয়সসীমার বাইরে চলে যেতে পারে।”
তিনি আরও জানান, ছবির একজন গুরুত্বপূর্ণ বয়স্ক অভিনেতা ইতোমধ্যে মারা গেছেন, যা নির্মাণ প্রক্রিয়ায় নতুন সংকট তৈরি করেছে।
ঋণ নিয়ে শুটিং শেষ করেছেন আলভী আহমেদ
‘জীবন অপেরা’ চলচ্চিত্রের নির্মাতা আলভী আহমেদ জানান, প্রধান অভিনয়শিল্পীর দীর্ঘমেয়াদি শিডিউল সংকটের কারণে তিনি অনুদানের দ্বিতীয় কিস্তির অপেক্ষা না করে ঋণ নিয়ে শুটিং শেষ করেছেন।
তিনি বলেন, “ভেবেছিলাম জানুয়ারির মধ্যেই দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ পেয়ে যাব। কিন্তু এখনও পাইনি। এখন ঋণের চাপ এবং পাওনাদারদের তাগাদা সামলাতে হচ্ছে।”
দ্রুত অর্থ ছাড়ের দাবি
চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলচ্চিত্র নির্মাণ একটি সময়নির্ভর প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট মৌসুম, শিল্পীদের শিডিউল, লোকেশন অনুমতি এবং মুক্তির পরিকল্পনা বিবেচনা করেই কাজ এগিয়ে নিতে হয়।
তাদের মতে, অনুদানের অর্থ ছাড়ে দীর্ঘসূত্রতা শুধু নির্মাণ ব্যয় বাড়াচ্ছে না, বরং অনেক প্রকল্পের সামগ্রিক পরিকল্পনাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
এ অবস্থায় অনুদানপ্রাপ্ত নির্মাতারা দ্রুত দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড়ের দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘ বিলম্ব হলে কয়েকটি চলচ্চিত্রের নির্মাণ প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সরকারি অনুদানের মূল উদ্দেশ্যও ব্যাহত হবে।
রিপোর্টারের নাম 
























