নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের মধ্যে জড়তা, সংশয় এবং কিছু ক্ষেত্রে অবজ্ঞার মনোভাব দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সংগঠনটির মতে, গণভোট ও গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে সরকারের বিভিন্ন অর্জনও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। রোববার (২২ জুন) জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত ‘বর্তমান সরকারের চার মাস: প্রত্যাশা, অর্জন ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক এবং বিভিন্ন পেশাজীবী অংশ নেন।
সরকারের অর্জন ও সীমাবদ্ধতা
সুজনের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বর্তমান সরকারের প্রথম চার মাসের উল্লেখযোগ্য সাফল্য হচ্ছে নির্বাচনী অঙ্গীকারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ও দার্শনিক ভিত্তিকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়াকে বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংগঠনটি।
বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় উদ্যোগ, কৃষক কার্ড কার্যক্রম এবং খাল পুনঃখনন কর্মসূচিকে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে সংবিধান সংস্কার, প্রশাসনে নিয়োগ, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বাস্তবায়নের আহ্বান
গোলটেবিল বৈঠকের সঞ্চালক ও সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে একটি দুঃসহ রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বলেছেন। জনগণ সেই পরিকল্পনার বাস্তব রূপ দেখতে চায়। অতীতের সংকট থেকে উত্তরণে কী ধরনের সংস্কার ও পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তার মতে, কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে হলে অর্থনীতি, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক কাঠামোয় প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
জুলাই সনদ নিয়ে প্রশ্ন
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বৈঠকে বলেন, জুলাই সনদ গ্রহণে সরকারের বিলম্ব ভবিষ্যতে সাংবিধানিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যে সংবিধানকে কেন্দ্র করে অতীতে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগ উঠেছে, সেটিকে কেন এখনো অক্ষুণ্ন রাখা হচ্ছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচির প্রথম দফাতেই সংবিধান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি দায়বদ্ধতার আহ্বান
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করীম বলেন, জুলাইয়ের ৩৬ দিনের আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তিনি বলেন, আন্দোলনে প্রাণ হারানো শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি দায়বদ্ধতা বজায় রাখা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ব্যাহত হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, নির্বাচিত সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই বেশি। তাই প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান দ্রুত কমিয়ে আনা জরুরি।
তরুণদের আস্থা ধরে রাখার তাগিদ
সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলেন, তরুণ সমাজের সমর্থন ও আস্থা ধরে রাখতে হলে সরকারকে গণ-অভ্যুত্থানের মূল দাবি ও মূল্যবোধের প্রতি আরও যত্নবান হতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সংস্কার প্রশ্নে অস্পষ্টতা, রাজনৈতিক প্রভাবিত নিয়োগ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে বাছাইকৃত ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক চর্চায় অনীহা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা ফাহিম মাশরুর এবং ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের সাবেক পরিচালক রফিকুল ইসলাম।
রিপোর্টারের নাম 




















