নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীজুড়ে মাদক ব্যবসার বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক মাদক স্পট নিয়ন্ত্রণ করছেন অন্তত ২৩১ জন চিহ্নিত মাদক গডফাদার। তাদের অধীনে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে সহস্রাধিক খুচরা মাদক বিক্রেতা।
পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আটটি ক্রাইম জোনজুড়ে বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিতভাবে মাদক কেনাবেচা চলছে। অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার এবং হাজারো কারবারি গ্রেপ্তার হলেও নেপথ্যের প্রভাবশালী গডফাদারদের অনেকেই এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকের বিস্তার
রাজধানীর পল্লবী এলাকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মাদক ব্যবসায়ীদের কারণে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ লেখাপড়া থেকে বিচ্যুত হয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের মাদক থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করায় স্থানীয় এক মাদক কারবারীর কাছ থেকে হুমকিরও শিকার হয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক এলাকায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে দারোয়ানসহ বিভিন্ন পেশার মানুষও জড়িয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষার্থী ও তরুণদের কাছে সহজেই মাদক পৌঁছে যাচ্ছে।
ডিএমপির উদ্বেগ
ডিএমপি সূত্র বলছে, মাদক নিয়ন্ত্রণে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য মিলছে না। বিশেষ করে থানা পর্যায়ের কার্যক্রম নিয়ে শীর্ষ পর্যায়ে অসন্তোষ রয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, রাজধানীতে মাদক নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মাদক গডফাদারদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং বেশিরভাগ অপরাধের সঙ্গে মাদকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক পাওয়া যায়।
চলমান অভিযানে বিপুল মাদক উদ্ধার
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ মে থেকে শুরু হওয়া বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত ৫২ লাখের বেশি ইয়াবা, প্রায় ৫ হাজার ৭০০ গ্রাম হেরোইন, ২ হাজারের বেশি বোতল ফেনসিডিল এবং ৭ হাজার ৭০০ কেজির বেশি গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, অভিযানের পরও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
জেনেভা ক্যাম্প এখনো বড় উদ্বেগ
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এখনো রাজধানীর অন্যতম আলোচিত মাদক স্পট হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, দফায় দফায় অভিযান পরিচালিত হলেও মাদক ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রকদের অনেকেই সক্রিয় রয়েছেন।
পুলিশের তালিকাভুক্ত একাধিক শীর্ষ মাদক কারবারীর বিরুদ্ধে বহু মামলা থাকলেও তারা এখনও প্রভাব বিস্তার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের অধীনে কয়েক ডজন সহযোগী ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় খুচরা পর্যায়ে মাদক বিক্রি করে।
মোহাম্মদপুর থানার ওসি মেসবাহ উদ্দিন জানান, জেনেভা ক্যাম্পে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং পলাতক মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
দেশব্যাপী বিস্তৃত নেটওয়ার্ক
শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকাতেও সক্রিয় রয়েছে মাদক সিন্ডিকেট। কক্সবাজার, টেকনাফ, কুমিল্লা ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে রয়েছে। এসব এলাকার অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও অন্যান্য মাদকের সরবরাহ চক্র নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
হালনাগাদ হচ্ছে জাতীয় তালিকা
পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে দেশব্যাপী মাদক কারবারিদের একটি সমন্বিত তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। পুলিশের তালিকায় বর্তমানে প্রায় ১৯ হাজার এবং বিজিবির তালিকায় প্রায় ৪ হাজার মাদক কারবারীর নাম রয়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে এই সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি হতে পারে।
সামাজিক আন্দোলনের আহ্বান
সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, মাদক নির্মূলে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক ও প্রমাণনির্ভর সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন। তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও সরকারের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জনের জন্য কেবল অভিযানের ওপর নির্ভর না করে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার এবং মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 























