অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে যৌথ উন্নয়ন (জয়েন্ট ভেঞ্চার) প্রকল্পে জমির মালিকদের ভাগে পাওয়া ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব আবাসন খাতে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যমান সংকটের মধ্যে এই কর কার্যকর হলে ফ্ল্যাটের দাম আরও বাড়বে এবং আবাসন শিল্প গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
আবাসন খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) বলছে, বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নির্মাণসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণে খাতটি ইতোমধ্যেই কঠিন সময় পার করছে। এর মধ্যে নতুন কর আরোপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
রিহ্যাবের সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, নতুন কর এবং নিবন্ধন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে আবাসন নির্মাণ ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে। এর প্রভাবে ফ্ল্যাটের দাম ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
তিনি জানান, বর্তমানে ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে। অন্যদিকে রড, সিমেন্ট, কেবলসহ অধিকাংশ নির্মাণসামগ্রীর দাম ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছানোয় ডেভেলপার ও ক্রেতা উভয়ই চাপে রয়েছেন।
করের দায় কে বহন করবে?
রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক বলেন, প্রস্তাবিত কর বাস্তবায়নে বড় ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। কারণ জমির মালিক সাধারণত নগদ অর্থ পান না; তিনি ফ্ল্যাটের মাধ্যমে তার অংশ গ্রহণ করেন। ফলে ১৫ শতাংশ কর কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা স্পষ্ট নয়।
তিনি বলেন, করের ভিত্তি বাজারমূল্য নাকি চুক্তিমূল্য হবে, সেটিও পরিষ্কার নয়। মূল্য নির্ধারণ, আপত্তি নিষ্পত্তি এবং কর আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলে নতুন বিরোধ ও মামলা বাড়তে পারে।
বিনিয়োগ ও পুনঃউন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন কর আরোপের ফলে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন পুনর্নির্মাণে জমির মালিকদের আগ্রহ কমে যেতে পারে। এতে নগর পুনঃউন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রিয়েল এস্টেট খাতের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেবে। নতুন প্রকল্প গ্রহণ কমে যাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান, নির্মাণশিল্প এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ বলেন, আবাসন খাত দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনশীল খাত। এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৬৯টি শিল্প খাত জড়িত।
তার মতে, আবাসন খাতে মন্দা দীর্ঘস্থায়ী হলে জাতীয় অর্থনীতির গতি আরও মন্থর হতে পারে। তাই সংকট কাটাতে বিশেষ নীতি সহায়তা, কর রেয়াত এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রিহ্যাবের দাবি
রিহ্যাব চূড়ান্ত বাজেটে—
- জমির মালিকের ফ্ল্যাটের ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ কর প্রত্যাহার,
- ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা,
- নির্মাণসামগ্রীর ওপর অতিরিক্ত কর কমানো,
- এবং আবাসন খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
সংগঠনটির নেতারা মনে করেন, সরকার, এনবিআর, আবাসন উদ্যোক্তা, জমির মালিক এবং অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে আলোচনা করে বাস্তবসম্মত সমাধান বের করা জরুরি। অন্যথায় দেশের অন্যতম বড় কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগনির্ভর খাত আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে।
রিপোর্টারের নাম 























