ঢাকা ০৭:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিতে ভারতের অবস্থান: উদ্বেগ ও বিতর্ক

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:৩৬:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নতুন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ভারত বর্তমানে সমালোচনার মুখে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির প্রেক্ষাপটে এই চুক্তিকে অনেকে ওয়াশিংটনের কাছে ভারতের ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে ভারতের কৃষক সংগঠনগুলো এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, কারণ তাদের আশঙ্কা, সস্তা মার্কিন পণ্য আমদানি হলে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। ভারতে প্রায় ৭০ কোটিরও বেশি মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।

যদিও চুক্তির বিস্তারিত তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে একটি যৌথ বিবৃতি এবং হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে কিছু তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষ নাগাদ একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা এই চুক্তির দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে কোনো কিছুই নিশ্চিত নয় এবং চুক্তি স্বাক্ষর হলেও তা টিকে থাকবে কিনা তা নির্ভর করবে মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

এই চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর মধ্যে একটি হলো, ভারত আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্য কেনার ‘ইচ্ছা’ প্রকাশ করেছে। উল্লেখ্য, গত অর্থবছরে ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে মোট আমদানি করেছিল মাত্র ৪৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ’-এর এক কর্মকর্তা এই লক্ষ্যকে ‘অবাস্তব’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, এই বিশাল অঙ্কের একটি বড় অংশ বিমান কেনার সঙ্গে যুক্ত। তবে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর অতিরিক্ত বোয়িং বিমান কেনার সিদ্ধান্তও এই মোট লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট নাও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পাঁচ বছরে ২০০টি বোয়িং বিমান কিনলেও (প্রতি বিমানের আনুমানিক মূল্য ৩০০ মিলিয়ন ডলার) মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে, কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, লক্ষ্যমাত্রাটিকে ‘অঙ্গীকার’ হিসেবে না দেখে ‘ইচ্ছা’ হিসেবে নির্ধারণ করায় ভারতের ঝুঁকি কিছুটা কমেছে। তারা মনে করেন, এই লক্ষ্যমাত্রা বাধ্যবাধকতা না হওয়ায় চুক্তি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা কম।

চুক্তির আরেকটি বিতর্কিত বিষয় হলো, রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধের ব্যাপারে ভারত সম্মত হয়েছে বলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এই দাবির পর যুক্তরাষ্ট্র ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তবে, প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে এমন কোনো নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতির উল্লেখ নেই এবং ভারত সরকারও এই বিষয়টি নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি।

ভারত সরকার বলছে, তাদের জ্বালানি নীতি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তারা বিভিন্ন উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে থাকে। যদিও ভারত সরকার রাশিয়া থেকে তেল আমদানির পরিমাণ কমাতে শুরু করেছে, যেমনটি স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তবে এটি পুরোপুরি বন্ধ হবে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত রিফাইনারিগুলো ভেনেজুয়েলার তেল কেনা শুরু করেছে। এছাড়া, কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাশিয়ার রোজনেফটের অংশীদারিত্ব রয়েছে এমন একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ব্যারেল তেল কেনা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বাণিজ্য চুক্তিটি এখনো ‘ভঙ্গুর’ এবং ‘রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত’। ফলে, এটি ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে তাৎক্ষণিক কোনো স্থিতিশীল পরিবর্তন আনতে পারবে কিনা, তা এখনই বলা কঠিন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকায় ২৩১ মাদক গডফাদারের নিয়ন্ত্রণে শতাধিক স্পট, উদ্বেগ বাড়ছে

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিতে ভারতের অবস্থান: উদ্বেগ ও বিতর্ক

আপডেট সময় : ০৬:৩৬:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নতুন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ভারত বর্তমানে সমালোচনার মুখে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির প্রেক্ষাপটে এই চুক্তিকে অনেকে ওয়াশিংটনের কাছে ভারতের ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে ভারতের কৃষক সংগঠনগুলো এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, কারণ তাদের আশঙ্কা, সস্তা মার্কিন পণ্য আমদানি হলে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। ভারতে প্রায় ৭০ কোটিরও বেশি মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।

যদিও চুক্তির বিস্তারিত তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে একটি যৌথ বিবৃতি এবং হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে কিছু তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষ নাগাদ একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা এই চুক্তির দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে কোনো কিছুই নিশ্চিত নয় এবং চুক্তি স্বাক্ষর হলেও তা টিকে থাকবে কিনা তা নির্ভর করবে মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

এই চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর মধ্যে একটি হলো, ভারত আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্য কেনার ‘ইচ্ছা’ প্রকাশ করেছে। উল্লেখ্য, গত অর্থবছরে ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে মোট আমদানি করেছিল মাত্র ৪৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ’-এর এক কর্মকর্তা এই লক্ষ্যকে ‘অবাস্তব’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, এই বিশাল অঙ্কের একটি বড় অংশ বিমান কেনার সঙ্গে যুক্ত। তবে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর অতিরিক্ত বোয়িং বিমান কেনার সিদ্ধান্তও এই মোট লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট নাও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পাঁচ বছরে ২০০টি বোয়িং বিমান কিনলেও (প্রতি বিমানের আনুমানিক মূল্য ৩০০ মিলিয়ন ডলার) মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে, কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, লক্ষ্যমাত্রাটিকে ‘অঙ্গীকার’ হিসেবে না দেখে ‘ইচ্ছা’ হিসেবে নির্ধারণ করায় ভারতের ঝুঁকি কিছুটা কমেছে। তারা মনে করেন, এই লক্ষ্যমাত্রা বাধ্যবাধকতা না হওয়ায় চুক্তি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা কম।

চুক্তির আরেকটি বিতর্কিত বিষয় হলো, রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধের ব্যাপারে ভারত সম্মত হয়েছে বলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এই দাবির পর যুক্তরাষ্ট্র ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তবে, প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে এমন কোনো নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতির উল্লেখ নেই এবং ভারত সরকারও এই বিষয়টি নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি।

ভারত সরকার বলছে, তাদের জ্বালানি নীতি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তারা বিভিন্ন উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে থাকে। যদিও ভারত সরকার রাশিয়া থেকে তেল আমদানির পরিমাণ কমাতে শুরু করেছে, যেমনটি স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তবে এটি পুরোপুরি বন্ধ হবে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত রিফাইনারিগুলো ভেনেজুয়েলার তেল কেনা শুরু করেছে। এছাড়া, কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাশিয়ার রোজনেফটের অংশীদারিত্ব রয়েছে এমন একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ব্যারেল তেল কেনা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বাণিজ্য চুক্তিটি এখনো ‘ভঙ্গুর’ এবং ‘রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত’। ফলে, এটি ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে তাৎক্ষণিক কোনো স্থিতিশীল পরিবর্তন আনতে পারবে কিনা, তা এখনই বলা কঠিন।