ঢাকা ১২:৫৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

ঢাকার নদী-খালের প্রাণ ফেরাতে বিশ্বব্যাংকের ৩৭০ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:০৯:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার স্যানিটেশন ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবার মানোন্নয়নে ৩৭০ মিলিয়ন ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ৮৪ কোটি টাকা) অর্থায়ন অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। এই বিপুল অঙ্কের অর্থায়নের মাধ্যমে রাজধানী ও সংলগ্ন অঞ্চলের পানি দূষণ কমানো এবং বিলীনপ্রায় নদী ও খালগুলো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে নির্বাহী পরিচালক পর্ষদের সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়ন অনুমোদন দেওয়া হয়।

বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ‘দ্য মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক এই কর্মসূচির আওতায় বৃহত্তর ঢাকার স্থানীয় ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। দেশের মোট আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের প্রায় অর্ধেক এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) এক-তৃতীয়াংশ যেখানে উৎপাদিত হয়, সেই বৃহত্তর ঢাকার পানি দূষণ কমানোই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে ঢাকার বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার সক্ষমতা বাড়ানো এবং নদ-নদী ও খালের পানি দূষণ কমিয়ে সেগুলোর নাব্যতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এই কর্মসূচির ফলে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা এবং পাঁচ লাখ মানুষ উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবার আওতায় আসবে। বিশেষ করে দূষণ ও মৌলিক সেবা বঞ্চিত এলাকাগুলোকে এই প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ও ভুটানে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যঁ পেসমে বলেন, ঢাকার লাখ লাখ মানুষের জীবনরেখা এই জলাশয়গুলো। কিন্তু দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শিল্পায়নের লাগামহীন প্রসারের ফলে বর্জ্য ও দূষণ ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে, যা জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি আরও বলেন, এই কর্মসূচি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার নদী ও খালগুলোর দূষণ কমাতে এবং সেগুলোর স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরিতে সহায়তা করবে।

সংস্থাটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ঢাকা গুরুতর বর্জ্য ও দূষিত পানির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। ঢাকার মাত্র ২০ শতাংশ বাসিন্দা পাইপযুক্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আওতায় আছে। বাকি ৮০ শতাংশ মানুষের অপরিশোধিত দূষিত পানি ও পয়ঃবর্জ্য সরাসরি শহরের জলাশয় ও নদীতে গিয়ে পড়ছে। এছাড়া, ঢাকার অর্ধেকের বেশি খাল বর্তমানে বিলীন হয়ে গেছে অথবা বর্জ্যে ভরাট হয়ে আছে, যা দূষণকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়, প্রকল্পটি সরকারি ও বেসরকারি খাতের পাশাপাশি সিটি করপোরেশনগুলোকে সম্পৃক্ত করে একটি সামগ্রিক পদ্ধতি গ্রহণ করবে। এর মাধ্যমে উন্নত পরিষেবা সরবরাহ, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো, দূষণ হ্রাস ও প্রবাহ ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে ঢাকার চারপাশের নদী ও খালগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের মোট রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার ৮০ শতাংশই ঢাকা ও এর আশেপাশে অবস্থিত। এই প্রায় সাত হাজার কারখানা প্রতিদিন দুই হাজার ৪০০ মিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলছে, যা চর্মরোগ ও ডায়রিয়াসহ নানা স্নায়বিক রোগ বৃদ্ধি করছে। এই কর্মসূচিতে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে ঢাকা ও এর আশেপাশের শিল্প কারখানাগুলোকে শিল্পবর্জ্য পরিশোধন ও পানির পুনঃব্যবহার বৃদ্ধির জন্য তাদের দক্ষতা ও মূলধন কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর ফলে পানির সর্বোত্তম ব্যবহার ও দূষণ কমানো সম্ভব হবে।

বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন বিশেষজ্ঞ এবং প্রকল্পের টাস্ক টিম লিডার হর্ষ গোয়েল বলেন, এই কর্মসূচি বাংলাদেশের বৃহত্তর পানি নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকার জলাশয়ে দূষণ নিঃসরণ হ্রাস, একটি বিস্তৃত পানির মান সূচকসহ প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ডিজিটাল রিয়েল-টাইম দূষণ পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠা এবং ঢাকার চারটি প্রধান নদীর জন্য সমন্বিত পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে, প্রথম পর্যায়ে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের নির্বাচিত এলাকাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এটি প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহের আওতা উন্নত করতে সাহায্য করবে, প্রধান খাল ও নদীর কাছাকাছি সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়গুলিকে অগ্রাধিকার দেবে এবং পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা আরও উন্নত করবে। এছাড়া, কঠিন বর্জ্য ডাম্পিং, ড্রেনেজ নেটওয়ার্কে সরাসরি পয়ঃনিষ্কাশন এবং নদী ও খালে শিল্পবর্জ্য নিষ্কাশন বন্ধ করার জন্য ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান চালানো হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লিজেন্ডারি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলেকে শেষ বিদায়

ঢাকার নদী-খালের প্রাণ ফেরাতে বিশ্বব্যাংকের ৩৭০ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন

আপডেট সময় : ০৮:০৯:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার স্যানিটেশন ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবার মানোন্নয়নে ৩৭০ মিলিয়ন ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ৮৪ কোটি টাকা) অর্থায়ন অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। এই বিপুল অঙ্কের অর্থায়নের মাধ্যমে রাজধানী ও সংলগ্ন অঞ্চলের পানি দূষণ কমানো এবং বিলীনপ্রায় নদী ও খালগুলো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে নির্বাহী পরিচালক পর্ষদের সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়ন অনুমোদন দেওয়া হয়।

বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ‘দ্য মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক এই কর্মসূচির আওতায় বৃহত্তর ঢাকার স্থানীয় ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। দেশের মোট আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের প্রায় অর্ধেক এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) এক-তৃতীয়াংশ যেখানে উৎপাদিত হয়, সেই বৃহত্তর ঢাকার পানি দূষণ কমানোই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে ঢাকার বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার সক্ষমতা বাড়ানো এবং নদ-নদী ও খালের পানি দূষণ কমিয়ে সেগুলোর নাব্যতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এই কর্মসূচির ফলে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা এবং পাঁচ লাখ মানুষ উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবার আওতায় আসবে। বিশেষ করে দূষণ ও মৌলিক সেবা বঞ্চিত এলাকাগুলোকে এই প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ও ভুটানে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যঁ পেসমে বলেন, ঢাকার লাখ লাখ মানুষের জীবনরেখা এই জলাশয়গুলো। কিন্তু দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শিল্পায়নের লাগামহীন প্রসারের ফলে বর্জ্য ও দূষণ ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে, যা জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি আরও বলেন, এই কর্মসূচি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার নদী ও খালগুলোর দূষণ কমাতে এবং সেগুলোর স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরিতে সহায়তা করবে।

সংস্থাটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ঢাকা গুরুতর বর্জ্য ও দূষিত পানির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। ঢাকার মাত্র ২০ শতাংশ বাসিন্দা পাইপযুক্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আওতায় আছে। বাকি ৮০ শতাংশ মানুষের অপরিশোধিত দূষিত পানি ও পয়ঃবর্জ্য সরাসরি শহরের জলাশয় ও নদীতে গিয়ে পড়ছে। এছাড়া, ঢাকার অর্ধেকের বেশি খাল বর্তমানে বিলীন হয়ে গেছে অথবা বর্জ্যে ভরাট হয়ে আছে, যা দূষণকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়, প্রকল্পটি সরকারি ও বেসরকারি খাতের পাশাপাশি সিটি করপোরেশনগুলোকে সম্পৃক্ত করে একটি সামগ্রিক পদ্ধতি গ্রহণ করবে। এর মাধ্যমে উন্নত পরিষেবা সরবরাহ, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো, দূষণ হ্রাস ও প্রবাহ ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে ঢাকার চারপাশের নদী ও খালগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের মোট রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার ৮০ শতাংশই ঢাকা ও এর আশেপাশে অবস্থিত। এই প্রায় সাত হাজার কারখানা প্রতিদিন দুই হাজার ৪০০ মিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলছে, যা চর্মরোগ ও ডায়রিয়াসহ নানা স্নায়বিক রোগ বৃদ্ধি করছে। এই কর্মসূচিতে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে ঢাকা ও এর আশেপাশের শিল্প কারখানাগুলোকে শিল্পবর্জ্য পরিশোধন ও পানির পুনঃব্যবহার বৃদ্ধির জন্য তাদের দক্ষতা ও মূলধন কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর ফলে পানির সর্বোত্তম ব্যবহার ও দূষণ কমানো সম্ভব হবে।

বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন বিশেষজ্ঞ এবং প্রকল্পের টাস্ক টিম লিডার হর্ষ গোয়েল বলেন, এই কর্মসূচি বাংলাদেশের বৃহত্তর পানি নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকার জলাশয়ে দূষণ নিঃসরণ হ্রাস, একটি বিস্তৃত পানির মান সূচকসহ প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ডিজিটাল রিয়েল-টাইম দূষণ পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠা এবং ঢাকার চারটি প্রধান নদীর জন্য সমন্বিত পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে, প্রথম পর্যায়ে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের নির্বাচিত এলাকাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এটি প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহের আওতা উন্নত করতে সাহায্য করবে, প্রধান খাল ও নদীর কাছাকাছি সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়গুলিকে অগ্রাধিকার দেবে এবং পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা আরও উন্নত করবে। এছাড়া, কঠিন বর্জ্য ডাম্পিং, ড্রেনেজ নেটওয়ার্কে সরাসরি পয়ঃনিষ্কাশন এবং নদী ও খালে শিল্পবর্জ্য নিষ্কাশন বন্ধ করার জন্য ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান চালানো হবে।