ঢাকা ১২:৫৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

নতুন সরকারের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ: সম্ভাবনা ও উত্তরণের পথ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:০৮:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। এক সপ্তাহের মধ্যেই রাষ্ট্রের হাল ধরবে জনগণের রায়ে নির্বাচিত নতুন একটি সরকার। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন বিদায়ের অপেক্ষায়, তখন চারদিকে প্রশ্ন—আগামী সরকার কি পারবে খাদের কিনারায় থাকা অর্থনীতিকে টেনে তুলতে? বিগত দেড় দশকের দুর্নীতি ও ভুল নীতির বোঝা কাঁধে নিয়ে নতুন প্রশাসনকে শুরুতেই এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।

অর্থনীতির বর্তমান চিত্র: ক্ষত ও স্থবিরতা

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে ব্যাংক খাত থেকে অর্থ পাচার ও নামে-বেনামে ঋণ নেওয়ার ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছিল, তা এখনও কাটেনি। অন্তর্বর্তী সরকার কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও অধিকাংশ সূচকে সফলতার পাল্লা এখনও বেশ হালকা।

  • রিজার্ভ ও ডলার সংকট: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তবে ডলারের দর লাফিয়ে প্রায় ১২৫ টাকায় পৌঁছানোয় আমদানির ওপর বড় চাপ পড়েছে।
  • রপ্তানি ও রেমিট্যান্স: পণ্য ও সেবা রপ্তানি আয় টানা ছয় মাস ধরে নিম্নমুখী। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রপ্তানি আয় গত বছরের তুলনায় ১.৯৩ শতাংশ কমেছে। শুধুমাত্র রেমিট্যান্স প্রবাহই অর্থনীতিকে কিছুটা আশা দেখাচ্ছে।
  • মূল্যস্ফীতি: উচ্চ সুদহারের মুদ্রানীতি গ্রহণ করেও মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। ডিসেম্বর ২০২৫-এ মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
  • বিনিয়োগ ও উন্নয়ন: বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৬.১০ শতাংশে নেমেছে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হারও ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ: বিশেষজ্ঞ মতামত

অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন সরকারের প্রথম কাজ হবে জনগণের আস্থা অর্জন করা এবং অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক কে এ এস মুর্শিদ মনে করেন, “বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল” পদ্ধতিতে চললে বিপদ বাড়বে। তাঁর মতে, কৃষি ও শিল্প খাতের উৎপাদন বাড়িয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করাই হবে আসল সমাধান।

অন্যদিকে, পিআরআই-এর চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার কর কাঠামোতে আমূল পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে করের হার অনেক বেশি কিন্তু করদাতার সংখ্যা কম। এই ‘রুগ্ন’ রাজস্ব কাঠামো দিয়ে উন্নয়ন সচল রাখা সম্ভব নয়। তিনি ট্যারিফ যৌক্তিকীকরণ এবং বাণিজ্য নীতি উদারীকরণের পরামর্শ দিয়েছেন যাতে তৈরি পোশাকের বাইরেও রপ্তানি আয় বাড়ানো সম্ভব হয়।

নতুন সরকারের কাছে জনআকাঙ্ক্ষা

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন মনে করেন, নতুন সরকারকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি ‘শক্ত বার্তা’ দিতে হবে। দুর্নীতিবাজ বা ঋণখেলাপিদের পাশে রেখে জনগণের আস্থা অর্জন করা অসম্ভব। তাঁর মতে, শেয়ার বাজারের লুণ্ঠনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ফিরবে না।

এছাড়াও বৈশ্বিক রাজনীতির সমীকরণে আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক এবং চীনের প্রভাব—সব মিলিয়ে এক জটিল কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে নতুন প্রশাসনকে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লিজেন্ডারি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলেকে শেষ বিদায়

নতুন সরকারের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ: সম্ভাবনা ও উত্তরণের পথ

আপডেট সময় : ০১:০৮:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। এক সপ্তাহের মধ্যেই রাষ্ট্রের হাল ধরবে জনগণের রায়ে নির্বাচিত নতুন একটি সরকার। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন বিদায়ের অপেক্ষায়, তখন চারদিকে প্রশ্ন—আগামী সরকার কি পারবে খাদের কিনারায় থাকা অর্থনীতিকে টেনে তুলতে? বিগত দেড় দশকের দুর্নীতি ও ভুল নীতির বোঝা কাঁধে নিয়ে নতুন প্রশাসনকে শুরুতেই এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।

অর্থনীতির বর্তমান চিত্র: ক্ষত ও স্থবিরতা

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে ব্যাংক খাত থেকে অর্থ পাচার ও নামে-বেনামে ঋণ নেওয়ার ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছিল, তা এখনও কাটেনি। অন্তর্বর্তী সরকার কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও অধিকাংশ সূচকে সফলতার পাল্লা এখনও বেশ হালকা।

  • রিজার্ভ ও ডলার সংকট: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তবে ডলারের দর লাফিয়ে প্রায় ১২৫ টাকায় পৌঁছানোয় আমদানির ওপর বড় চাপ পড়েছে।
  • রপ্তানি ও রেমিট্যান্স: পণ্য ও সেবা রপ্তানি আয় টানা ছয় মাস ধরে নিম্নমুখী। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রপ্তানি আয় গত বছরের তুলনায় ১.৯৩ শতাংশ কমেছে। শুধুমাত্র রেমিট্যান্স প্রবাহই অর্থনীতিকে কিছুটা আশা দেখাচ্ছে।
  • মূল্যস্ফীতি: উচ্চ সুদহারের মুদ্রানীতি গ্রহণ করেও মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। ডিসেম্বর ২০২৫-এ মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
  • বিনিয়োগ ও উন্নয়ন: বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৬.১০ শতাংশে নেমেছে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হারও ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ: বিশেষজ্ঞ মতামত

অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন সরকারের প্রথম কাজ হবে জনগণের আস্থা অর্জন করা এবং অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক কে এ এস মুর্শিদ মনে করেন, “বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল” পদ্ধতিতে চললে বিপদ বাড়বে। তাঁর মতে, কৃষি ও শিল্প খাতের উৎপাদন বাড়িয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করাই হবে আসল সমাধান।

অন্যদিকে, পিআরআই-এর চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার কর কাঠামোতে আমূল পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে করের হার অনেক বেশি কিন্তু করদাতার সংখ্যা কম। এই ‘রুগ্ন’ রাজস্ব কাঠামো দিয়ে উন্নয়ন সচল রাখা সম্ভব নয়। তিনি ট্যারিফ যৌক্তিকীকরণ এবং বাণিজ্য নীতি উদারীকরণের পরামর্শ দিয়েছেন যাতে তৈরি পোশাকের বাইরেও রপ্তানি আয় বাড়ানো সম্ভব হয়।

নতুন সরকারের কাছে জনআকাঙ্ক্ষা

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন মনে করেন, নতুন সরকারকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি ‘শক্ত বার্তা’ দিতে হবে। দুর্নীতিবাজ বা ঋণখেলাপিদের পাশে রেখে জনগণের আস্থা অর্জন করা অসম্ভব। তাঁর মতে, শেয়ার বাজারের লুণ্ঠনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ফিরবে না।

এছাড়াও বৈশ্বিক রাজনীতির সমীকরণে আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক এবং চীনের প্রভাব—সব মিলিয়ে এক জটিল কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে নতুন প্রশাসনকে।