ঢাকা ০৮:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গ্রন্থাগারে পাঠকশূন্যতা ও বইবিমুখতা: সংকটের মুখে আগামীর জ্ঞানভিত্তিক সমাজ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:৩৯:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

৫ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস। দেশের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত গ্রন্থাগারগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হলেও বাস্তবে বই পড়ার সংস্কৃতি নিয়ে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠছে। এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের একটি আসনের জন্য যেখানে শিক্ষার্থীদের ফজরের পর থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হতো, এখন সেখানে দিনের যেকোনো সময় গেলেই মিলছে ফাঁকা আসন। পাঠকশূন্য গ্রন্থাগারের এই দৃশ্য যেন দেশের সামগ্রিক পাঠাভ্যাসের অবনতির এক করুণ প্রতিচ্ছবি।

চাকরিমুখী পড়াশোনা, গতানুগতিক একাডেমিক সিলেবাসের চাপ, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তি এবং রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক যথাযথ উদ্যোগের অভাবে বাংলাদেশ থেকে বই পড়ার অভ্যাস ক্রমেই বিলীন হতে চলেছে। আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ‘সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন’-এর ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ১০২টি দেশের মধ্যে পাঠাভ্যাসের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। একজন বাংলাদেশি বছরে গড়ে মাত্র ৬২ ঘণ্টা বই পড়েন, যা সংখ্যার হিসেবে তিনটিরও কম। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে ভারত তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের অবস্থান তালিকার তলানিতে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস পর্যবেক্ষণ করলে এই সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলে শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অধিকাংশ শিক্ষার্থীর টেবিলে বিসিএস বা বিভিন্ন চাকরির প্রস্তুতির বই এবং একাডেমিক লেকচার শিট ছাড়া সাহিত্য, দর্শন কিংবা ইতিহাসের বইয়ের দেখা মেলা ভার। যাদের টেবিলে পাঠ্যবইয়ের বাইরে দুই-একটি বই পাওয়া গেছে, সেগুলোর সংখ্যাও অত্যন্ত নগণ্য। জ্ঞানতৃষ্ণা মেটানোর চেয়ে জীবন গড়ার তাগিদে কেবল চাকরির বইয়েই সীমাবদ্ধ থাকছে তরুণ প্রজন্ম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই শিক্ষার্থীদের ওপর ক্যারিয়ারের এক অদৃশ্য চাপ তৈরি হয়। ফলে একাডেমিক পড়াশোনা আর চাকরির প্রস্তুতির বাইরে অন্য কোনো বই পড়ার সুযোগ বা আগ্রহ কোনোটাই অবশিষ্ট থাকে না।

গ্রন্থাগারের পরিসংখ্যানও এই অনাগ্রহের সাক্ষ্য দিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে প্রায় ছয় থেকে নয় লাখ বই ও জার্নাল এবং প্রায় ৩০ হাজার বিরল পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত থাকলেও বই ইস্যু করার হার আশঙ্কাজনকভাবে কম। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মাসে গড়ে মাত্র ২০০ থেকে ৪০০টি বই ইস্যু করা হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী গ্রন্থাগারে এলেও তাদের বড় অংশই বই পড়ার চেয়ে স্মার্টফোন ব্যবহার বা অন্য কাজে সময় ব্যয় করছেন।

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতির জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদাসীনতাকে দায়ী করছেন। ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, পাঠাভ্যাস নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘকাল ধরে কোনো কার্যকর গবেষণা বা জরিপ না হওয়ায় সমস্যার মূলে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম মনে করেন, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি এবং গৎবাঁধা সিলেবাস শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও পাঠাভ্যাস নষ্ট করছে। তার মতে, একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে মানসম্মত শিক্ষা ও শক্তিশালী গ্রন্থাগার ব্যবস্থার বিকল্প নেই।

উল্লেখ্য, ১৯৫৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থাগারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের স্মৃতিকে অম্লান রাখতে এবং ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে বইয়ের প্রতি জনসচেতনতা বাড়াতে ২০১৮ সাল থেকে দিবসটি জাতীয়ভাবে পালিত হয়ে আসছে। তবে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসের এই ক্ষণে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন—বই কি কেবল গ্রন্থাগারের আলমারিতেই শোভা পাবে, নাকি তা আবার ফিরে আসবে মানুষের হাতে? পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্র ও সমাজকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যথায় আগামীর প্রজন্ম এক গভীর জ্ঞানশূন্যতার দিকে ধাবিত হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান-ইসরাইল উত্তেজনা: ইসরাইল উপকূলে বিশ্বের বৃহত্তম মার্কিন রণতরী, বাড়ছে যুদ্ধপ্রস্তুতি

গ্রন্থাগারে পাঠকশূন্যতা ও বইবিমুখতা: সংকটের মুখে আগামীর জ্ঞানভিত্তিক সমাজ

আপডেট সময় : ০৫:৩৯:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

৫ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস। দেশের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত গ্রন্থাগারগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হলেও বাস্তবে বই পড়ার সংস্কৃতি নিয়ে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠছে। এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের একটি আসনের জন্য যেখানে শিক্ষার্থীদের ফজরের পর থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হতো, এখন সেখানে দিনের যেকোনো সময় গেলেই মিলছে ফাঁকা আসন। পাঠকশূন্য গ্রন্থাগারের এই দৃশ্য যেন দেশের সামগ্রিক পাঠাভ্যাসের অবনতির এক করুণ প্রতিচ্ছবি।

চাকরিমুখী পড়াশোনা, গতানুগতিক একাডেমিক সিলেবাসের চাপ, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তি এবং রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক যথাযথ উদ্যোগের অভাবে বাংলাদেশ থেকে বই পড়ার অভ্যাস ক্রমেই বিলীন হতে চলেছে। আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ‘সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন’-এর ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ১০২টি দেশের মধ্যে পাঠাভ্যাসের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। একজন বাংলাদেশি বছরে গড়ে মাত্র ৬২ ঘণ্টা বই পড়েন, যা সংখ্যার হিসেবে তিনটিরও কম। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে ভারত তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের অবস্থান তালিকার তলানিতে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস পর্যবেক্ষণ করলে এই সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলে শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অধিকাংশ শিক্ষার্থীর টেবিলে বিসিএস বা বিভিন্ন চাকরির প্রস্তুতির বই এবং একাডেমিক লেকচার শিট ছাড়া সাহিত্য, দর্শন কিংবা ইতিহাসের বইয়ের দেখা মেলা ভার। যাদের টেবিলে পাঠ্যবইয়ের বাইরে দুই-একটি বই পাওয়া গেছে, সেগুলোর সংখ্যাও অত্যন্ত নগণ্য। জ্ঞানতৃষ্ণা মেটানোর চেয়ে জীবন গড়ার তাগিদে কেবল চাকরির বইয়েই সীমাবদ্ধ থাকছে তরুণ প্রজন্ম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই শিক্ষার্থীদের ওপর ক্যারিয়ারের এক অদৃশ্য চাপ তৈরি হয়। ফলে একাডেমিক পড়াশোনা আর চাকরির প্রস্তুতির বাইরে অন্য কোনো বই পড়ার সুযোগ বা আগ্রহ কোনোটাই অবশিষ্ট থাকে না।

গ্রন্থাগারের পরিসংখ্যানও এই অনাগ্রহের সাক্ষ্য দিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে প্রায় ছয় থেকে নয় লাখ বই ও জার্নাল এবং প্রায় ৩০ হাজার বিরল পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত থাকলেও বই ইস্যু করার হার আশঙ্কাজনকভাবে কম। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মাসে গড়ে মাত্র ২০০ থেকে ৪০০টি বই ইস্যু করা হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী গ্রন্থাগারে এলেও তাদের বড় অংশই বই পড়ার চেয়ে স্মার্টফোন ব্যবহার বা অন্য কাজে সময় ব্যয় করছেন।

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতির জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদাসীনতাকে দায়ী করছেন। ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, পাঠাভ্যাস নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘকাল ধরে কোনো কার্যকর গবেষণা বা জরিপ না হওয়ায় সমস্যার মূলে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম মনে করেন, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি এবং গৎবাঁধা সিলেবাস শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও পাঠাভ্যাস নষ্ট করছে। তার মতে, একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে মানসম্মত শিক্ষা ও শক্তিশালী গ্রন্থাগার ব্যবস্থার বিকল্প নেই।

উল্লেখ্য, ১৯৫৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থাগারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের স্মৃতিকে অম্লান রাখতে এবং ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে বইয়ের প্রতি জনসচেতনতা বাড়াতে ২০১৮ সাল থেকে দিবসটি জাতীয়ভাবে পালিত হয়ে আসছে। তবে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসের এই ক্ষণে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন—বই কি কেবল গ্রন্থাগারের আলমারিতেই শোভা পাবে, নাকি তা আবার ফিরে আসবে মানুষের হাতে? পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্র ও সমাজকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যথায় আগামীর প্রজন্ম এক গভীর জ্ঞানশূন্যতার দিকে ধাবিত হবে।