ঢাকা ১১:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

শরিয়াহভিত্তিক ৫ ব্যাংকের শেয়ার ‘শূন্য’ ঘোষণা: আইনি জটিলতা ও বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে ধোঁয়াশা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪০:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৬ বার পড়া হয়েছে

দেশের শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠন এবং এসব ব্যাংকের শেয়ারের মূল্য ‘শূন্য’ ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নজিরবিহীন পদক্ষেপের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ (আরজেএসসি) এবং স্টক এক্সচেঞ্জসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আইনি ও পদ্ধতিগত প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শেয়ারের মূল্য শূন্য করার কোনো আইনি ভিত্তি আছে কি না, তা নিয়ে খোদ সরকারের ভেতরেও ভিন্নমত পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বিগত সরকারের আমলে অনিয়ম ও লুটপাটের শিকার হওয়া সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে সম্প্রতি ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়েছে। ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর আওতায় এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানান, ব্যাংকগুলোর সম্পদ ও দায়ের ব্যবধান ঋণাত্মক হয়ে যাওয়ায় শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানা শূন্য করে দেওয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তকে ‘অভূতপূর্ব’ ও ‘নজিরবিহীন’ বলে অভিহিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি স্পষ্ট জানিয়েছে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির শেয়ারের বাজারমূল্য শূন্য হওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই। সংস্থাটির মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) ঋণাত্মক হতে পারে, কিন্তু লেনদেনযোগ্য শেয়ারের মূল্য শূন্য হতে পারে না। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় শেয়ারের অভিহিত মূল্য (ফেস ভ্যালু) অথবা সর্বশেষ বাজারমূল্যের মধ্যে যেটি বেশি, সেই অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছে কমিশন।

এদিকে সরকারের উচ্চপর্যায়েও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এর আগে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, গভর্নরের বক্তব্যই চূড়ান্ত নয় এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি সরকার খতিয়ে দেখবে। তবে এ সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির প্রায় তিন মাস পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বা নীতিমালা জারি করা হয়নি। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।

অন্য দিকে, কোম্পানির নিবন্ধনকারী প্রতিষ্ঠান আরজেএসসি জানিয়েছে, শেয়ারের মালিকানা বা মূল্য শূন্য করার বিষয়ে তারা এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি পায়নি। সংস্থাটির মতে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বা সুনির্দিষ্ট সরকারি আদেশ ছাড়া কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে শেয়ার বাতিল বা শূন্য করার আইনি ভিত্তি দুর্বল। বিশেষ করে কোম্পানি আইন অনুযায়ী যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা, এখানে তা যথাযথভাবে পালিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করার ফলে আর্থিক খাতে নতুন করে সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। অনেক বিনিয়োগকারী এসব ব্যাংকের শেয়ার জামানত রেখে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছেন। এখন শেয়ারের মূল্য শূন্য হয়ে গেলে ওই ঋণের বিপরীতে থাকা জামানতও মূল্যহীন হয়ে পড়বে। এতে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি মার্জিন ঋণ গ্রহণকারী বিনিয়োগকারীরাও সর্বস্বান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকগুলোর এই পরিণতির পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ও নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর লুটপাট দায়ী থাকলেও অডিট প্রতিষ্ঠান এবং রেটিং এজেন্সিগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। আর্থিক অনিয়ম গোপন রেখে বছরের পর বছর ব্যাংকগুলোকে লাভজনক দেখানোর পেছনে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জোরালো হচ্ছে।

বর্তমানে নতুন গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মূলধন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের আমানতকে শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। তবে শেয়ারবাজার থেকে এসব ব্যাংকের তালিকাভুক্তি বাতিল (ডিলিস্টিং) এবং বিনিয়োগকারীদের পাওনা পরিশোধের বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই সংকট কাটবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জেই এই পাঁচ ব্যাংকের লেনদেন স্থগিত রয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লিজেন্ডারি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলেকে শেষ বিদায়

শরিয়াহভিত্তিক ৫ ব্যাংকের শেয়ার ‘শূন্য’ ঘোষণা: আইনি জটিলতা ও বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে ধোঁয়াশা

আপডেট সময় : ০৯:৪০:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দেশের শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠন এবং এসব ব্যাংকের শেয়ারের মূল্য ‘শূন্য’ ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নজিরবিহীন পদক্ষেপের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ (আরজেএসসি) এবং স্টক এক্সচেঞ্জসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আইনি ও পদ্ধতিগত প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শেয়ারের মূল্য শূন্য করার কোনো আইনি ভিত্তি আছে কি না, তা নিয়ে খোদ সরকারের ভেতরেও ভিন্নমত পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বিগত সরকারের আমলে অনিয়ম ও লুটপাটের শিকার হওয়া সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে সম্প্রতি ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়েছে। ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর আওতায় এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানান, ব্যাংকগুলোর সম্পদ ও দায়ের ব্যবধান ঋণাত্মক হয়ে যাওয়ায় শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানা শূন্য করে দেওয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তকে ‘অভূতপূর্ব’ ও ‘নজিরবিহীন’ বলে অভিহিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি স্পষ্ট জানিয়েছে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির শেয়ারের বাজারমূল্য শূন্য হওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই। সংস্থাটির মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) ঋণাত্মক হতে পারে, কিন্তু লেনদেনযোগ্য শেয়ারের মূল্য শূন্য হতে পারে না। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় শেয়ারের অভিহিত মূল্য (ফেস ভ্যালু) অথবা সর্বশেষ বাজারমূল্যের মধ্যে যেটি বেশি, সেই অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছে কমিশন।

এদিকে সরকারের উচ্চপর্যায়েও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এর আগে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, গভর্নরের বক্তব্যই চূড়ান্ত নয় এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি সরকার খতিয়ে দেখবে। তবে এ সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির প্রায় তিন মাস পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বা নীতিমালা জারি করা হয়নি। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।

অন্য দিকে, কোম্পানির নিবন্ধনকারী প্রতিষ্ঠান আরজেএসসি জানিয়েছে, শেয়ারের মালিকানা বা মূল্য শূন্য করার বিষয়ে তারা এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি পায়নি। সংস্থাটির মতে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বা সুনির্দিষ্ট সরকারি আদেশ ছাড়া কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে শেয়ার বাতিল বা শূন্য করার আইনি ভিত্তি দুর্বল। বিশেষ করে কোম্পানি আইন অনুযায়ী যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা, এখানে তা যথাযথভাবে পালিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করার ফলে আর্থিক খাতে নতুন করে সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। অনেক বিনিয়োগকারী এসব ব্যাংকের শেয়ার জামানত রেখে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছেন। এখন শেয়ারের মূল্য শূন্য হয়ে গেলে ওই ঋণের বিপরীতে থাকা জামানতও মূল্যহীন হয়ে পড়বে। এতে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি মার্জিন ঋণ গ্রহণকারী বিনিয়োগকারীরাও সর্বস্বান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকগুলোর এই পরিণতির পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ও নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর লুটপাট দায়ী থাকলেও অডিট প্রতিষ্ঠান এবং রেটিং এজেন্সিগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। আর্থিক অনিয়ম গোপন রেখে বছরের পর বছর ব্যাংকগুলোকে লাভজনক দেখানোর পেছনে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জোরালো হচ্ছে।

বর্তমানে নতুন গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মূলধন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের আমানতকে শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। তবে শেয়ারবাজার থেকে এসব ব্যাংকের তালিকাভুক্তি বাতিল (ডিলিস্টিং) এবং বিনিয়োগকারীদের পাওনা পরিশোধের বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই সংকট কাটবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জেই এই পাঁচ ব্যাংকের লেনদেন স্থগিত রয়েছে।