ঢাকা ০৯:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

৯৩ শতাংশ শিক্ষকই পাঠদানের বাইরে: প্রাথমিক শিক্ষায় গভীর সংকট, নেপ গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:৪২:৫৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) পরিচালিত এক চাঞ্চল্যকর গবেষণায় উঠে এসেছে যে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯৩ শতাংশ শিক্ষকই তাদের মূল দায়িত্বের বাইরে নানা ধরনের অপেশাদার কাজে জড়িত। এই অতিরিক্ত কাজের চাপ প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার মান, শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার্থীদের শিখনফলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার শিক্ষণ ও শিখনগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদনটি গত মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সভাকক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মাসুদ রানার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর শামসুজ্জামান এবং জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির মহাপরিচালক ফরিদ আহমদ।

অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, এই গবেষণার তথ্য হয়তো নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলবে। তবে এর মূল উদ্দেশ্য হলো বেসরকারি সংস্থা, শিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা, যাতে শিক্ষকদের শিক্ষাদান-বহির্ভূত কাজে ব্যবহার না করার জন্য সরকারের ওপর ইতিবাচক চাপ তৈরি হয়।

প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শিক্ষকদের এসব অপেশাদার কাজে প্রতি বছর সরকারের প্রায় ১ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। এর প্রভাবে প্রায় ৯৩ শতাংশ শিক্ষক ‘লেট-স্টেজ বার্নআউট’-এর ঝুঁকিতে রয়েছেন। গবেষণায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বারা সম্পন্ন হওয়া মোট ৩৭ প্রকারের অপেশাদার কাজ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের জরিপে শিক্ষকদের সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হয়, যেখানে বিদ্যালয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও হোম ভিজিটে সর্বনিম্ন সময় ব্যয় করতে দেখা যায়। গড়ে একজন শিক্ষককে মাসিক প্রায় ২৪ কর্মঘণ্টা এসব পেশাবহির্ভূত কাজে ব্যয় করতে হচ্ছে।

শিক্ষকদের নন-প্রফেশনাল কাজে অধিক সময় ব্যয় করার কারণে সামগ্রিকভাবে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার হ্রাস পায়। অতিরিক্ত দাপ্তরিক কাজ শেষে শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসার পর ৯০ শতাংশ শিক্ষক পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না, যার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর। ৮৭ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, এর ফলে শিক্ষার্থীরা মৌলিক বিষয়গুলো সঠিকভাবে বুঝতে পারে না এবং তাদের পরীক্ষার ফলাফলেও এর খারাপ প্রভাব প্রতিফলিত হয়। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পিছিয়ে পড়া বা সুবিধাবঞ্চিত। এসব শিক্ষার্থীর জন্য ‘রেমিডিয়াল’ বা বিশেষ ক্লাস অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও, ৮৫ শতাংশ শিক্ষক পেশাবহির্ভূত কাজের চাপের কারণে এসব বিশেষ ক্লাস নিতে পারছেন না।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রতিবেদনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ক্লাস চলাকালীন সময়ে শিক্ষকদের উপর কোনো ধরনের তথ্য সংগ্রহ বা প্রশাসনিক কাজের চাপ কমাতে প্রতিটি বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী বা ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ করা। সকল দাপ্তরিক কাজ সমন্বয়ের জন্য একটি একক ডিজিটাল পোর্টাল চালু করার উদ্যোগ নেওয়া। শিক্ষকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, যাতে শিক্ষার গুণগত মান ও ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যায়। সবশেষে, দীর্ঘমেয়াদে একটি ‘টিচিং আওয়ার প্রোটেকশন পলিসি’ প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে, যা শিক্ষকদের মূল পেশাগত দায়িত্ব পালনে সহায়ক হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পাক-আফগান উত্তেজনা: আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ইসহাক দারের ফোনালাপ

৯৩ শতাংশ শিক্ষকই পাঠদানের বাইরে: প্রাথমিক শিক্ষায় গভীর সংকট, নেপ গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য

আপডেট সময় : ০৫:৪২:৫৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) পরিচালিত এক চাঞ্চল্যকর গবেষণায় উঠে এসেছে যে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯৩ শতাংশ শিক্ষকই তাদের মূল দায়িত্বের বাইরে নানা ধরনের অপেশাদার কাজে জড়িত। এই অতিরিক্ত কাজের চাপ প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার মান, শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার্থীদের শিখনফলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার শিক্ষণ ও শিখনগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদনটি গত মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সভাকক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মাসুদ রানার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর শামসুজ্জামান এবং জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির মহাপরিচালক ফরিদ আহমদ।

অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, এই গবেষণার তথ্য হয়তো নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলবে। তবে এর মূল উদ্দেশ্য হলো বেসরকারি সংস্থা, শিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা, যাতে শিক্ষকদের শিক্ষাদান-বহির্ভূত কাজে ব্যবহার না করার জন্য সরকারের ওপর ইতিবাচক চাপ তৈরি হয়।

প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শিক্ষকদের এসব অপেশাদার কাজে প্রতি বছর সরকারের প্রায় ১ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। এর প্রভাবে প্রায় ৯৩ শতাংশ শিক্ষক ‘লেট-স্টেজ বার্নআউট’-এর ঝুঁকিতে রয়েছেন। গবেষণায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বারা সম্পন্ন হওয়া মোট ৩৭ প্রকারের অপেশাদার কাজ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের জরিপে শিক্ষকদের সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হয়, যেখানে বিদ্যালয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও হোম ভিজিটে সর্বনিম্ন সময় ব্যয় করতে দেখা যায়। গড়ে একজন শিক্ষককে মাসিক প্রায় ২৪ কর্মঘণ্টা এসব পেশাবহির্ভূত কাজে ব্যয় করতে হচ্ছে।

শিক্ষকদের নন-প্রফেশনাল কাজে অধিক সময় ব্যয় করার কারণে সামগ্রিকভাবে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার হ্রাস পায়। অতিরিক্ত দাপ্তরিক কাজ শেষে শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসার পর ৯০ শতাংশ শিক্ষক পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না, যার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর। ৮৭ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, এর ফলে শিক্ষার্থীরা মৌলিক বিষয়গুলো সঠিকভাবে বুঝতে পারে না এবং তাদের পরীক্ষার ফলাফলেও এর খারাপ প্রভাব প্রতিফলিত হয়। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পিছিয়ে পড়া বা সুবিধাবঞ্চিত। এসব শিক্ষার্থীর জন্য ‘রেমিডিয়াল’ বা বিশেষ ক্লাস অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও, ৮৫ শতাংশ শিক্ষক পেশাবহির্ভূত কাজের চাপের কারণে এসব বিশেষ ক্লাস নিতে পারছেন না।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রতিবেদনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ক্লাস চলাকালীন সময়ে শিক্ষকদের উপর কোনো ধরনের তথ্য সংগ্রহ বা প্রশাসনিক কাজের চাপ কমাতে প্রতিটি বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী বা ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ করা। সকল দাপ্তরিক কাজ সমন্বয়ের জন্য একটি একক ডিজিটাল পোর্টাল চালু করার উদ্যোগ নেওয়া। শিক্ষকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, যাতে শিক্ষার গুণগত মান ও ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যায়। সবশেষে, দীর্ঘমেয়াদে একটি ‘টিচিং আওয়ার প্রোটেকশন পলিসি’ প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে, যা শিক্ষকদের মূল পেশাগত দায়িত্ব পালনে সহায়ক হবে।