বছরের শুরুতেই নতুন বই আর খাতা-কলম নিয়ে শ্রেণিকক্ষে ফেরার যে আনন্দ শিক্ষার্থীদের মধ্যে থাকার কথা, তার ওপর কালো ছায়া ফেলেছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। চাল, ডাল, তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আগেই ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছিল; এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বই, খাতা, কলম, পেন্সিল ও স্কুল ব্যাগসহ প্রায় প্রতিটি শিক্ষাসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। বছরের ব্যবধানে এসব উপকরণের দাম বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকদের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রামের প্রধান শিক্ষাসামগ্রীর বাজার চকবাজারের শাহেনশাহ মার্কেট এবং আন্দরকিল্লা ঘুরে দেখা গেছে এক করুণ চিত্র। গত বছর যে মাঝারি মানের পেন্সিল এক ডজন ৮০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তার দাম ঠেকেছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়। সাধারণ মানের একটি স্কুল ব্যাগ কিনতে বর্তমানে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে, যা আগে ছিল মাত্র ৫০০ টাকা। অভিভাবক আহসান সুমন বা সোনিয়া ইসলামের মতো সাধারণ আয়ের মানুষের জন্য এই খরচ মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ১২ হাজার টাকা বেতনে দারোয়ানের চাকরি করা একজন বাবার পক্ষে দুই সন্তানের ৫-৬টি বইয়ের জন্য ২ হাজার টাকা ব্যয় করা মানেই সংসারের অন্য সব খরচ ছাঁটাই করা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) ২০২৫ সালের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক ভয়াবহ তথ্য। সেখানে বলা হয়েছে, শিক্ষা খাতের এই বাড়তি খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে এখন ঋণ নিতে হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার গুণগত মানে এবং শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার যেখানে ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ ছিল, তা ২০২৫ সালে এসে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে অনেক পরিবার সন্তানদের বই-খাতা দেওয়ার পরিবর্তে অল্প বয়সেই শ্রমবাজারে পাঠিয়ে দিচ্ছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ৫-৭ টাকার বলপয়েন্ট কলম এখন ১০-১২ টাকা। জ্যামিতি বক্সের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত। ১০-১৫ পৃষ্ঠার ছোটদের একটি বইয়ের দাম পড়ছে ১৮০ থেকে ২২০ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, খাতা তৈরির কাগজ, ব্যাগের চেইন ও কাপড় থেকে শুরু করে প্রতিটি উপকরণের দাম পাইকারি পর্যায়ে বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজার তদারকিতে প্রশাসনের কোনো তৎপরতা নেই।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এবং কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) নেতারা মনে করছেন, মানুষের আয় না বাড়লেও ব্যয়ের চাকা অস্বাভাবিক গতিতে ছুটছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগামীতে ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শিক্ষাসামগ্রীর ওপর শুল্ক কমানো এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর তদারকি এখন সময়ের দাবি।
রিপোর্টারের নাম 

























