ঢাকা ০৭:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচ ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা: সেভাস্টোপল নজির কি বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:০১:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

বৈশ্বিক রাজনীতির জটিল সমীকরণে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা কেবল দৃশ্যমান সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমেই ক্ষুণ্ণ হয় না; বরং অনেক সময় উন্নয়নের আবরণে দীর্ঘমেয়াদি লিজ কিংবা পর্দার অন্তরালে হওয়া গোপন চুক্তির মাধ্যমেও সার্বভৌমত্ব ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন বিশ্বরাজনীতি টালমাটাল, তখন বাংলাদেশের কৌশলগত অবকাঠামো ও করিডোর ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। বিশেষ করে রাশিয়ার কাছে ইউক্রেনের সেভাস্টোপল নৌ-ঘাঁটি লিজ দেওয়ার ঐতিহাসিক নজির এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর ও ফেনী করিডোর নিয়ে সাম্প্রতিক তৎপরতা এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ক্রিমিয়ার পতন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এর বীজ বপন করা হয়েছিল ২০১০ সালের আলোচিত ‘খারকিভ প্যাক্ট’-এর মাধ্যমে, যেখানে সেভাস্টোপল নৌ-ঘাঁটিতে রাশিয়ার লিজের মেয়াদ ২৫ বছর বৃদ্ধি করা হয়। তৎকালীন সময়ে একে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ও সময়ের প্রয়োজন হিসেবে প্রচার করা হলেও বাস্তবে এটি ইউক্রেনের অভ্যন্তরে একটি ‘রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র’ তৈরির সুযোগ করে দিয়েছিল। কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর ওপর আইনি ও পরিচালনাগত নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে দেশটির আঞ্চলিক অখণ্ডতা শেষ পর্যন্ত কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল।

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য এক বড় শিক্ষা হতে পারে। মৈত্রী সেতুর মাধ্যমে ফেনী করিডোর চালু হওয়া এবং দেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশপথগুলোর ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ কি অজান্তেই কোনো ‘সেভাস্টোপল ট্র্যাপ’ বা ফাঁদের দিকে ধাবিত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে দেশের কৌশলগত সম্পদগুলোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সার্বভৌমত্ব রক্ষার এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ‘নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট’ বা গোপনীয়তার চুক্তি (এনডিএ)। এ ধরনের চুক্তির মাধ্যমে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারের শর্তাবলী জনগণের আড়ালে রাখা হয়। একে অনেক ক্ষেত্রে ‘ধীরে ধীরে গ্রাস করার’ আধুনিক করপোরেট কৌশল হিসেবেও অভিহিত করা হয়। গোপন চুক্তির আড়ালে যখন কোনো দেশের কৌশলগত স্থাপনা বিদেশের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষ প্রকৃত সত্য জানার সুযোগ পায় না।

চট্টগ্রাম বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিয়ে অতীতেও বিভিন্ন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। কোনো দেশের সামুদ্রিক প্রবেশপথ ও অভ্যন্তরীণ করিডোর যখন বিদেশি শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল কারিগরি বিষয়ে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেকোনো লিজ বা চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া সময়ের দাবি। অন্যথায়, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রুখতে ব্যর্থ হলে তার খেসারত দীর্ঘমেয়াদে পুরো জাতিকে দিতে হতে পারে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের কড়া বার্তা: আত্মরক্ষায় তেহরান প্রস্তুত, ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ না দেওয়ার হুঁশিয়ারি

ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচ ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা: সেভাস্টোপল নজির কি বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা?

আপডেট সময় : ১১:০১:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬

বৈশ্বিক রাজনীতির জটিল সমীকরণে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা কেবল দৃশ্যমান সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমেই ক্ষুণ্ণ হয় না; বরং অনেক সময় উন্নয়নের আবরণে দীর্ঘমেয়াদি লিজ কিংবা পর্দার অন্তরালে হওয়া গোপন চুক্তির মাধ্যমেও সার্বভৌমত্ব ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন বিশ্বরাজনীতি টালমাটাল, তখন বাংলাদেশের কৌশলগত অবকাঠামো ও করিডোর ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। বিশেষ করে রাশিয়ার কাছে ইউক্রেনের সেভাস্টোপল নৌ-ঘাঁটি লিজ দেওয়ার ঐতিহাসিক নজির এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর ও ফেনী করিডোর নিয়ে সাম্প্রতিক তৎপরতা এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ক্রিমিয়ার পতন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এর বীজ বপন করা হয়েছিল ২০১০ সালের আলোচিত ‘খারকিভ প্যাক্ট’-এর মাধ্যমে, যেখানে সেভাস্টোপল নৌ-ঘাঁটিতে রাশিয়ার লিজের মেয়াদ ২৫ বছর বৃদ্ধি করা হয়। তৎকালীন সময়ে একে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ও সময়ের প্রয়োজন হিসেবে প্রচার করা হলেও বাস্তবে এটি ইউক্রেনের অভ্যন্তরে একটি ‘রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র’ তৈরির সুযোগ করে দিয়েছিল। কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর ওপর আইনি ও পরিচালনাগত নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে দেশটির আঞ্চলিক অখণ্ডতা শেষ পর্যন্ত কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল।

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য এক বড় শিক্ষা হতে পারে। মৈত্রী সেতুর মাধ্যমে ফেনী করিডোর চালু হওয়া এবং দেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশপথগুলোর ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ কি অজান্তেই কোনো ‘সেভাস্টোপল ট্র্যাপ’ বা ফাঁদের দিকে ধাবিত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে দেশের কৌশলগত সম্পদগুলোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সার্বভৌমত্ব রক্ষার এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ‘নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট’ বা গোপনীয়তার চুক্তি (এনডিএ)। এ ধরনের চুক্তির মাধ্যমে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারের শর্তাবলী জনগণের আড়ালে রাখা হয়। একে অনেক ক্ষেত্রে ‘ধীরে ধীরে গ্রাস করার’ আধুনিক করপোরেট কৌশল হিসেবেও অভিহিত করা হয়। গোপন চুক্তির আড়ালে যখন কোনো দেশের কৌশলগত স্থাপনা বিদেশের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষ প্রকৃত সত্য জানার সুযোগ পায় না।

চট্টগ্রাম বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিয়ে অতীতেও বিভিন্ন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। কোনো দেশের সামুদ্রিক প্রবেশপথ ও অভ্যন্তরীণ করিডোর যখন বিদেশি শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল কারিগরি বিষয়ে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেকোনো লিজ বা চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া সময়ের দাবি। অন্যথায়, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রুখতে ব্যর্থ হলে তার খেসারত দীর্ঘমেয়াদে পুরো জাতিকে দিতে হতে পারে।