ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংগঠন ‘শিবির’-এর নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে থাকার বিষয়টি সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাদের এই কৌশলকে অনেকেই ‘ট্রোজান হর্স’ পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করছেন, যেখানে দৃশ্যত দুর্বল বা অনুপস্থিত মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে একটি সংগঠিত শক্তি নেপথ্যে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। এই ঘটনা শুধু একটি সংগঠনের টিকে থাকার কৌশল হিসেবেই নয়, বরং বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে গোপনীয়তা, কৌশল এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সংঘাত নিয়ে নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাচ্ছে।
প্রাচীন ট্রোজান যুদ্ধের উপাখ্যানে গ্রিকরা যেমন দীর্ঘ অবরোধের পর একটি বিশাল কাঠের ঘোড়ার আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে ট্রয়নগর জয় করেছিল, তেমনি ছাত্রশিবিরের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, প্রকাশ্যে নেতৃত্ব না থাকলেও তাদের সাংগঠনিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ ছিল এবং প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব হয়েছিল। এই কৌশল একদিকে যেমন সংগঠনকে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে, অন্যদিকে এর ফলে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের সুযোগ এবং জবাবদিহিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই ধরনের কৌশলগত গোপনীয়তা শেষ পর্যন্ত ছাত্ররাজনীতির জন্য কতটা ইতিবাচক হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে বিভিন্ন দার্শনিক ও সাংগঠনিক তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করছেন। ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থে বর্ণিত কৌশলগত রাজনীতির ধারণা এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ম্যাকিয়াভেলি ক্ষমতার লড়াইয়ে সরাসরি প্রকাশের চেয়ে কৌশল, প্রতারণা এবং সময়োপযোগী ছদ্মবেশের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। ছাত্রশিবিরের অদৃশ্য নেতৃত্ব বছরের পর বছর ধরে যেভাবে কার্যক্রম চালিয়েছে, তা ম্যাকিয়াভেলির বাস্তববাদী রাজনীতিরই একটি প্রতিফলন। তবে এর সমালোচনার জায়গা হলো, এমন কৌশল জনআস্থার সংকট তৈরি করতে পারে, কারণ দীর্ঘ গোপনীয়তা রাজনৈতিক জবাবদিহিতার ঘাটতি তৈরি করে।
মিশেল ফুকোর ‘ক্ষমতা/জ্ঞান’ ধারণাটিও এখানে প্রযোজ্য। ফুকো দেখিয়েছেন, ক্ষমতা শুধু দমনমূলক নয়, বরং জ্ঞানের উৎপাদনের ভেতর দিয়েই তা ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রশিবিরের গোপন রাজনীতিকে জ্ঞানের ওপর নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে নেতাদের পরিচয় গোপন রেখে তারা প্রতিপক্ষ থেকে তথ্য-ক্ষমতা আড়াল করেছে। একই সঙ্গে কর্মীদের নীরবতা ছিল এক ধরনের জ্ঞানের আত্মসংযম, যা ক্ষমতার সম্পর্ককে দীর্ঘায়িত করেছে। তবে ফুকোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ‘গোপন জ্ঞান’ সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে কতটা গণতান্ত্রিক বা অন্তর্ভুক্তিমূলক, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
আন্তোনিও গ্রামশির ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ (Cultural Hegemony) তত্ত্বের মাধ্যমেও এই পরিস্থিতিকে বোঝা যায়। গ্রামশি বলেছিলেন, যে দল সাংস্কৃতিকভাবে একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেই দল টিকে থাকে। ছাত্রশিবির কর্মীদের নীরব সম্মতি ও নেতৃত্ব আড়াল করার কৌশল আসলে এক ধরনের সাংস্কৃতিক আধিপত্য তৈরি করেছে, যেখানে নেতৃত্ব প্রকাশ না পেলেও কর্মীরা অভ্যন্তরীণ আনুগত্যে অটল থেকেছে। তবে গ্রামশি ‘প্রতি-আধিপত্যের’ (counter-hegemony) কথাও বলেছিলেন, যা এই নীরব সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করছে কিনা, সেই প্রশ্ন তোলে। অন্যদিকে, দার্শনিক হান্না আরেন্টের মতে, রাজনীতির প্রাণ হলো ‘প্রকাশ্য ক্ষেত্র’, যেখানে পরিচয় ও বক্তব্য দৃশ্যমান হয়। এই অর্থে ছাত্রশিবিরের গোপন নেতৃত্ব ‘অ-রাজনৈতিক’ বলে বিবেচিত হতে পারে, কারণ তারা প্রকাশ্যে না এসে আড়ালে থেকেছে, যা প্রকাশ্য জবাবদিহিতাকে খর্ব করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৌশলগত গোপনীয়তা বা গোপন সংগঠনের মাধ্যমে সফলতার দৃষ্টান্ত রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে ফ্রান্সের প্রতিরোধ আন্দোলন, ১৯৮০-এর দশকে পোল্যান্ডের কমিউনিস্ট শাসনের পতনে লেজ ভেলেসার নেতৃত্বে সলিডারিটি আন্দোলন, ২০১৪ সালে বুরকিনা ফাসোর ছাত্র আন্দোলন এবং ১৯৫৯ সালে ফিদেল ক্যাস্ত্রোর কিউবান বিপ্লব—এ সবই গোপন সংগঠন ও কৌশলের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্যের উদাহরণ। এমনকি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় সুভাষচন্দ্র বসু বা অরবিন্দ ঘোষের নেতৃত্বে পরিচালিত কিছু বিপ্লবী গোষ্ঠীর কার্যক্রমও ছিল গোপনে। এসব ক্ষেত্রে কঠোর গোপনীয়তা ও সঠিক কৌশল অবলম্বন করে সংগঠনগুলো তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল।
তবে ছাত্ররাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই গোপনীয়তা একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরে। একদিকে এটি অনন্য সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, কর্মী-নিবেদন এবং দীর্ঘস্থায়ী পারস্পরিক আস্থায় গড়া এক শক্তির ইঙ্গিত দেয়, যা কম সময়ে সুসংগঠিত হয়ে ছাত্রমাঠে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। অন্যদিকে, এই আড়ালভিত্তিক, একগুঁয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাইনারি চিন্তাভাবনা কেবল ক্যাম্পাসকেই নয়, পুরো রাজনৈতিক পরিবেশকেও বিষাক্ত করে তুলতে পারে। সমস্যা শুরু হয় যখন গোপনীয়তা এবং কঠোর শৃঙ্খলা গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে প্রতিস্থাপন করে। নেতৃত্বের পরিচয় যখন ‘গোপনীয় বিজয়’-এর মাধ্যম হয়, তখন ছাত্ররাজনীতির মূল উদ্দেশ্য—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক দাবি, বৈচিত্র্যের সংলাপ ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গোপন-রাজনীতি বজায় রাখার কৌশল অনেক সময় রাষ্ট্রীয় দমনকে আমন্ত্রণ জানায়, সাধারণ শিক্ষার্থীকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয় এবং বিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষকে স্বাভাবিক করে তোলে। তাছাড়া, রাজনৈতিক-আদর্শিক একীকরণ যদি ছাত্রদের সামাজিক প্রশ্ন (বেতন, শিক্ষা সুবিধা ও ছাত্রসেবা) থেকে বিচ্যুত করে শুধু সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় বা দলীয় এজেন্ডায় আবদ্ধ রাখে, তা তরুণদের সমসাময়িক উদ্বেগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং দীর্ঘ মেয়াদে তাদের সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা হ্রাস পায়। একটি ছাত্র সংগঠন হিসেবে প্রত্যেক সদস্যের নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা ও শিক্ষাগত স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব থাকে। কিন্তু গোপনীয় অপকর্ম বা সহিংসতা ঘটলে সংগঠনকে দায় স্বীকার করে নজির স্থাপন করতে হবে, লুকোচুরি নয়। কৌশলগতভাবে, প্রকাশ্যভাবে নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া খুলে দিয়ে শিবির দীর্ঘ মেয়াদে আরও গ্রহণযোগ্য হতে পারে, কারণ স্বচ্ছতা গণতান্ত্রিক বৈধতা আনে।
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির প্রেক্ষাপটে ছাত্রশিবিরের এই ঘটনা একটি ধ্রুব সত্যকে তুলে ধরে। যেখানে ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল প্রায়শই ক্ষমতার ছত্রছায়ায় ভোগবাদী, সুবিধাবাদী এবং অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে, সেখানে ছাত্রশিবিরের কর্মীরা আদর্শ, নিয়মশৃঙ্খলা ও কঠোর সাংগঠনিক কাঠামোকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে। এর ফলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ও প্রতিপক্ষবিরোধী ক্যাম্পাসেও তারা দীর্ঘদিন নেতৃত্ব আড়াল করে রাখতে পেরেছে। এটি বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে তাদের সাংগঠনিক শক্তি ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতির এক ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা প্রমাণ করে যে আদর্শিক শৃঙ্খলা ও কর্মীদের আত্মনিবেদন থাকলে যেকোনো প্রতিকূল অবস্থায়ও সংগঠন টিকে থাকতে পারে। বিএনপি, ছাত্রদল বা এমনকি বামপন্থি সংগঠনগুলোও যদি ছাত্রশিবিরের মতো শৃঙ্খলা, কৌশলগত ধৈর্য এবং কর্মী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারত, তবে বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির মান অনেক উচ্চপর্যায়ে পৌঁছাতে পারত।
অবশেষে বলা যায়, ছাত্রশিবিরের এই গোপন রাজনীতি একদিকে কৌশলগত সফলতা—কারণ প্রতিপক্ষ তাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে; অন্যদিকে এটি গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক—কারণ নেতৃত্বের পরিচয় গোপন রাখার মানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থেকে সরে যাওয়া। এখানে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়—কৌশল বনাম নৈতিকতা, অস্তিত্ব রক্ষা বনাম গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা। ছাত্ররাজনীতির জন্য সত্যিকারের ইতিবাচক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে, কাঠামোগত শক্তির সঙ্গে স্বচ্ছতা, আইনি সচেতনতা ও নিরপেক্ষ শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি যুক্ত করা অপরিহার্য। তখনই তারা কেবল একটি সংগঠন নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক, দায়িত্বশীল ও সমাজ সংহত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
রিপোর্টারের নাম 

























