ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত ফাইনাল পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে আসছে। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে ঢাকা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অফিস সহকারী ও সাবেক শিক্ষার্থী ইলিয়াস হোসেনের নাম উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর এই সাত কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষ থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত ফাইনাল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পরীক্ষার তিন থেকে চার দিন পূর্বেই অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মাঝে সরবরাহ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রতি সেট প্রশ্নের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। কিছু শিক্ষার্থীর অভিযোগ, প্রশ্নপত্র পাওয়ার আগে তাদের কাছ থেকে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষার জন্য ধর্মীয় গ্রন্থসমূহের মাধ্যমে শপথ করানো হয়। যদিও প্রথমদিকে বিষয়টি গোপন রাখা হলেও, পরীক্ষার হলে প্রায় সকল শিক্ষার্থীর মুখেই একই প্রশ্নপত্র ‘কমন’ পড়ার কথা শোনা যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী জানান, পরীক্ষার তিন-চার দিন আগেই তারা সম্পূর্ণ প্রশ্নপত্র হাতে পেয়েছেন এবং পরীক্ষায় সেগুলো হুবহু কমন পড়েছে। এই চক্র প্রতি সেশনে একেকটি কলেজ থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে বলে জানা গেছে। প্রশ্নপত্রের দাম নিয়ে দরকষাকষির রেকর্ডও পাওয়া গেছে, যা এই অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।
এই প্রশ্ন ফাঁস চক্রের মূল হোতা হিসেবে ইলিয়াস হোসেনের নাম আসার পাশাপাশি ঢাকা কলেজের কিছু শিক্ষার্থীরও জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। অনার্স চতুর্থ ও দ্বিতীয় বর্ষের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ফাইনাল পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ মেলে যখন এক শিক্ষার্থী পরীক্ষার দিনই বলে ওঠে, “আজকের পরীক্ষায় যে প্রশ্ন এসেছে, সেটা আগেই জানতাম।” পরবর্তীতে তার মোবাইলে থাকা সরবরাহকৃত প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র মিলিয়ে দেখা হলে হুবহু মিল পাওয়া যায়। অনার্স প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায়ও একই ধরনের প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি পরীক্ষার জন্য ছয় থেকে সাতটি সম্ভাব্য প্রশ্ন ফাঁস করা হচ্ছে এবং সরবরাহকৃত প্রশ্নগুলো থেকেই পরীক্ষায় সব প্রশ্ন আসছে বলে জানা গেছে।
এক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, “দীর্ঘদিন ধরে ইলিয়াস ভাইয়ের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। আমরা কঠোর পরিশ্রম করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি, অথচ এই চক্রের কারণে সেই পরিশ্রমের মূল্য নষ্ট হয়ে যায়। প্রশ্ন ফাঁস হলে মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুরো পরীক্ষার ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইলিয়াস হোসেন বলেন, এটি একটি মিথ্যা অভিযোগ এবং টাকা নেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি আরও দাবি করেন যে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে একটানা ছিলেন না এবং গত ৫ আগস্টের পর থেকে পুনরায় বিভাগে আসা শুরু করেছেন। তার মতে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রায়শই পূর্ববর্তী বছরের প্রশ্নপত্র (যেমন ২২ সালের জন্য ২১ বা ২০ সালের প্রশ্ন) ঘুরে আসে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টারের প্রশ্ন থেকেও অনেক প্রশ্ন কমন থাকে।
ঢাকা কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মোঃ আবু সালেক খান জানিয়েছেন, তিনি এই বিষয়ে অবগত নন। যদি ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের কোনো বিষয় তার কানে আসেনি। তবে নির্ভরযোগ্য তথ্য পেলে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসক অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াসও এ বিষয়ে অবগত নন বলে জানিয়েছেন এবং প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিলেও, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের বিদ্যমান শিক্ষার্থীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 





















