## মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক জোট: আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সদ্য আত্মপ্রকাশিত একটি নতুন সামরিক জোট মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ (SMDA) নামে পরিচিত এই চুক্তিটি ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর আদলে তৈরি, যেখানে যেকোনো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণকে জোটের সকল সদস্যের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই জোটের সম্প্রসারণ এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসের নেতাদের ওপর ইসরাইলের হামলা সৌদি আরবকে তাদের দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করায়। এই হামলার পর মাত্র আট দিনের মাথায়, ১৭ সেপ্টেম্বর, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ রিয়াদে এই প্রতিরক্ষা চুক্তির খসড়ায় স্বাক্ষর করেন। এই ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের প্রভাব বিস্তার এবং এই অঞ্চলে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ হারানোর ইঙ্গিত বহন করে। উপসাগরীয় দেশগুলো, যারা পূর্বে তাদের নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল ছিল, এখন তারা আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। সৌদি আরব, উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী দেশ হিসেবে, পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তা কৌশলকে বহুমুখী করার পদক্ষেপ নিয়েছে।
পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৬০-এর দশক থেকেই পাকিস্তান সৌদি সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে এবং বর্তমানেও সেখানে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন রয়েছে। পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, পারমাণবিক সক্ষমতা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি সৌদি আরবের জন্য একটি প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করতে সক্ষম। অন্যদিকে, সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতা, যা পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এই চুক্তির ফলে মুসলিম বিশ্বে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়বে এবং আঞ্চলিক কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধি পাবে।
এই জোটে তুরস্কের অংশগ্রহণের সম্ভাবনাও প্রবল। সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক ত্রিমুখী জোট গঠনের বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং আগামী বছর নাগগিরই এটি আনুষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে। যদি তুরস্ক এই জোটে যোগদান করে, তবে এটি আরও শক্তিশালী হবে। সৌদি আরবের বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেট, পাকিস্তানের পারমাণবিক ক্ষমতা এবং তুরস্কের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও ন্যাটোতে অর্জিত অভিজ্ঞতা এই জোটকে যেকোনো সামরিক হুমকির মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলবে।
ইরানও এই জোটকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে এবং এতে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তেহরান এই জোটকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য সহায়ক বলে মনে করছে। সম্প্রতি চীন-সৌদি মধ্যস্থতার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমে আসা এবং সৌদি আরবের বিমান হামলা থেকে ইরানকে সুরক্ষা দেওয়া—এই বিষয়গুলো ইঙ্গিত দেয় যে ইরান ও সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিক হচ্ছে। যদি ইরান এই জোটে যোগ দেয়, তবে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হবে। তবে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের অংশগ্রহণ না করলে, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় সৃষ্ট প্রক্সি হুমকি মোকাবেলায় এই জোটের কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে।
বাংলাদেশ, মিশর, কাতার এবং ইন্দোনেশিয়াও এই জোটে যোগদানের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের সামরিক মহলে এই জোট নিয়ে আলোচনা চলছে এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর এটি আনুষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে। ইন্দোনেশিয়াও এই প্রতিরক্ষা জোটে যোগদানের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। জর্ডান, মালয়েশিয়া এবং অন্যান্য ওআইসিভুক্ত দেশগুলো এখনো এই জোটের ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো আগ্রহ দেখায়নি।
যদি বাংলাদেশ এই জোটে যোগদান করে, তবে দেশটি ১৬০,০০০ সক্রিয় সেনা, বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত অবস্থান, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অভিজ্ঞতার মতো সম্পদ নিয়ে আসবে। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় জোটের প্রভাব বাড়াবে এবং সুন্নি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঐক্য জোরদার করবে। বাংলাদেশের জন্য এই জোটে যোগদানের সুবিধাগুলো বহুমুখী: পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরাপত্তা বৃদ্ধি, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে অর্থনৈতিক বিনিয়োগের সুযোগ, উন্নত সামরিক প্রযুক্তি প্রাপ্তি এবং ভারতের মতো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কৌশলগত অবস্থান জোরদার করা। তবে, এই জোটে যোগদানের পূর্বে বাংলাদেশকে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা করে তাদের আশ্বস্ত করতে হবে যে এই যোগদান শান্তির জন্য, যাতে কোনো নিষেধাজ্ঞা বা চাপের সম্মুখীন হতে না হয়। এরপর পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করা যেতে পারে।
আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভারত এই জোট নিয়ে উদ্বিগ্ন, কারণ এটি পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করতে পারে। ইরান, যারা প্রথমে এই জোটকে একটি সুন্নি জোট হিসেবে সন্দেহ করেছিল, এখন ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে। আমেরিকার প্রতিক্রিয়া এখনো স্পষ্ট নয়। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এটি আমেরিকার জন্য ভালো কারণ আঞ্চলিক নিরাপত্তার বোঝা কমবে। তবে, অন্যেরা এটিকে আমেরিকার প্রভাব কমার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন, কারণ সৌদি আরব পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক শক্তির সঙ্গে প্রতিরক্ষা জোরদার করছে।
এই জোটের কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা, শিয়া-সুন্নি বিভেদ, ভারত বা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা, এবং তুরস্কের ন্যাটো প্রতিশ্রুতি বা বাংলাদেশের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের মতো বিষয়গুলো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তবে, যেকোনো উদ্যোগের মতো এখানেও ঝুঁকি থাকবে এবং তা মোকাবিলায় জোটের সদস্য দেশগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই নতুন সামরিক জোটের সাফল্য এবং দীর্ঘস্থায়িত্ব মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করুক—এমনটাই প্রত্যাশা। বিশ্ব শান্তির জন্য এই জোট একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকারী ভূমিকা পালন করতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 














