বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য নাম জিয়াউর রহমান। একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করলেও, তিনি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও পরবর্তীকালে রাষ্ট্র পরিচালনায় রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাঁর জন্ম ও শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছর বিভিন্ন আলোচনা ও ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়, যা তাঁর জীবন ও কর্মের তাৎপর্য তুলে ধরে।
বিশ্ব ইতিহাসে এমন বহু সমরনায়কের উদাহরণ রয়েছে যারা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেও সফল হয়েছেন এবং স্থায়ী আসন লাভ করেছেন। ফ্রান্সের সম্রাট ও সেনানায়ক নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াশিংটন, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল, মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর, গ্রিক রাষ্ট্রনায়ক পেরিক্লিস ও সলোন—তাঁরা সকলেই সামরিক দক্ষতা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তাঁদের সামরিক পটভূমি তাঁদের রাজনৈতিক অবদানকে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত করেনি, বরং তা আরও সুসংহত করেছে।
জিয়াউর রহমানও ইতিহাসের এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। একীভূত পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিলেও, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে চট্টগ্রামে তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এটি ছিল কোনো বাঙালি সেনা অফিসারের নেতৃত্বে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ এবং বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম পদক্ষেপ। তাঁর এই সাহসী সিদ্ধান্ত শুধু তাঁর জীবনকেই বদলে দেয়নি, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথও পরিবর্তন করে দেয়। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার মাঝে বিজয়ের পতাকা উড়িয়ে দেন।
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল আরও বিস্তৃত। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে একটি পেশাদার বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কৃতিত্বও তাঁর। জাতি গঠন ও মুক্তির দুটি পর্বেই তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের ভাষায়, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে প্রশাসন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মানুষের মনে শান্তি ও নিরাপত্তাবোধের উন্নতি ঘটেছিল। তিনি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, যা স্বাধীনতা-উত্তরকালে অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তি সেভাবে করতে পারেনি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান জিয়াউর রহমানকে একজন অন্তর্জ্ঞানসম্পন্ন, স্বাপ্নিক ও উদ্যমী নেতা হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি সেনাবাহিনীর ওপর রাজনীতির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছিলেন এবং একটি সুস্থির বেসামরিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। তিনি বিভেদ ভুলে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেন। জিয়াউর রহমান শেখ মুজিব-প্রবর্তিত ভাষাভিত্তিক-রাষ্ট্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে ভাষাভিত্তিক-রাষ্ট্রিক-ইসলাম ধর্মসম্মত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করেন। তিনি বাস্তববাদী অর্থনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করে দেশের তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে একত্রিত করে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠন করেন, যা পরবর্তীতে বিএনপি নামে একটি রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হয়। তাঁর হাত ধরেই নির্বাচনি রাজনীতি পুনরুদ্ধার হয়।
জিয়াউর রহমানের অবদানকে অনেক সময় রাজনৈতিক দলাদলির কারণে পাশ কাটানো বা অস্বীকার করার চেষ্টা করা হলেও, ইতিহাসে তাঁর স্থান সুপ্রতিষ্ঠিত। তিনি একই সঙ্গে জাতির মুক্তি ও জাতি গঠনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং বাংলাদেশি জাতি গঠনে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
রিপোর্টারের নাম 














