বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে যার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর কোটি মানুষের প্রাণে স্বাধীনতার স্পৃহা জাগিয়েছিল, তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। কেবল ইতিহাসের পাঠক হিসেবে নয়, বরং ইতিহাসের মহানায়ক হিসেবে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন এই জনপদে। দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আর ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের মাটি ও মানুষের সঙ্গে তার নাড়ির টান তাকে পরিণত করেছিল এক ক্ষণজন্মা মহাপুরুষে। তার রাজনৈতিক দর্শন ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’—আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে ‘উই রিভোল্ট’ বলে যে বিদ্রোহের সূচনা তিনি করেছিলেন, তা ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রথম সোপান। ২৬শে মার্চ তার কণ্ঠেই প্রতিধ্বনিত হয়েছিল স্বাধীনতার ঘোষণা, যা দিকভ্রান্ত জাতিকে দিয়েছিল লড়াইয়ের প্রেরণা। বীরত্বের সেই ধারাবাহিকতায় আধুনিক ও উৎপাদনমুখী বাংলাদেশ বিনির্মাণে তার ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালীন জিয়ার সততা, দেশপ্রেম এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা তাকে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল। কিন্তু এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা সহ্য করতে পারেনি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী অপশক্তি। ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে এক মর্মান্তিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। মাত্র ৪৬ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি যে ছাপ রেখে গেছেন, তা আজও অমলিন।
১৯৩৬ সালের ১৯শে জানুয়ারি জন্ম নেওয়া এই মহান নেতা বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ দর্শনের প্রবর্তন এবং ১৯ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তৎকালীন ভঙ্গুর অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে তিনি দেশকে নিয়ে গিয়েছিলেন সমৃদ্ধির পথে। তার ‘খাল খনন কর্মসূচি’ ছিল কৃষি বিপ্লবের এক অনন্য উদাহরণ, যার মাধ্যমে দেশের ১৪ হাজার খাল খনন করে সেচ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
শিক্ষার প্রসারেও তার অবদান অপরিসীম। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড গঠন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং উৎপাদনমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনে তিনি ছিলেন অগ্রগামী। শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ শিশু একাডেমি’ এবং শুরু করেন জনপ্রিয় প্রতিভা অন্বেষণমূলক অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’। শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতায় তার আমলেই প্রবর্তিত হয় ‘একুশে পদক’ ও ‘স্বাধীনতা পদক’।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে তিনি বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল ও প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি) প্রতিষ্ঠা করেন। স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, ক্যানসার হাসপাতাল ও নিপসমের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তার হাত ধরেই গড়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনেন জিয়াউর রহমান। তার দূরদর্শী চিন্তার ফসল হিসেবে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’ (SAARC) আত্মপ্রকাশ করে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন এবং গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি সার্বভৌম মর্যাদার ভিত্তিতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেন।
শহীদ জিয়ার সেই আদর্শিক উত্তরাধিকার আজ বহন করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শন মূলত শহীদ জিয়ারই রাষ্ট্রচিন্তার আধুনিক প্রতিফলন। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জিয়ার আদর্শ আজও প্রাসঙ্গিক। দেশ ও মানুষের কল্যাণে তার আত্মত্যাগ এবং উন্নয়নমুখী রাজনীতির দর্শন আগামী প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। এক ক্ষণজন্মা নেতার হাত ধরে শুরু হওয়া সেই অগ্রযাত্রা আজও বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে।
রিপোর্টারের নাম 














