বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সবুজ প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির কার্যকর কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এখন অপরিহার্য। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার প্রায় ৯৫ শতাংশই উচ্চ কার্বন-নিঃসরণকারী জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। এই পদ্ধতিতে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ০.৭ কেজি কার্বন নিঃসরণ হয়, যা টেকসই উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা। এই বিদ্যমান জ্বালানি ব্যবস্থাপনা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত এবং এটি জনস্বাস্থ্য, প্রতিবেশগত ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল একটি বাড়তি সুবিধা নয়, বরং এটি খাদ্যসুরক্ষা, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, শিল্পোন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত একটি মৌলিক নাগরিক অধিকার। এটি জাতীয় অর্থনীতি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশের অবস্থানকে সরাসরি প্রভাবিত করে। এই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের মাটির নিচে প্রায় ৩ বিলিয়ন টন উচ্চমানের কয়লা মজুত রয়েছে, যার মোট তাপীয় শক্তি আনুমানিক ২০,৮২০ টেরাওয়াট-ঘন্টা। পাশাপাশি সৌর, বায়ু, ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ ও বায়োমাস মিলিয়ে প্রায় ৭৫ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত, দক্ষ সবুজ প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে এই সম্পদই হতে পারে দেশের জ্বালানি স্বনির্ভরতার মূল ভিত্তি।
প্রচলিত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। দেশের অধিকাংশ কয়লাক্ষেত্র ঘনবসতিপূর্ণ ও উর্বর কৃষিজমির নিচে অবস্থিত। খোলা খনন পদ্ধতিতে ব্যাপক ভূমি ক্ষয়, কৃষি উৎপাদন হ্রাস এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্থানান্তরের ঝুঁকি তৈরি হয়। তদুপরি, সরাসরি কয়লা দহন করলে প্রতি কিলোওয়াট-ঘন্টায় প্রায় ১.০ কেজি কার্বন নিঃসরণ ঘটে, যা জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘ইন-সিটু আন্ডারগ্রাউন্ড কয়লা গ্যাসিফিকেশন’ (UCG) একটি সম্ভাবনাময় সবুজ প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে ভূগর্ভস্থ কয়লাকে খনন না করেই নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় সিনগ্যাসে (Synthesis Gas) রূপান্তর করা হয়। ২০০ থেকে ৬০০ মিটার গভীরে উৎপাদিত এই গ্যাস বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। ইউসিজি প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ভূমি, কৃষিজমি ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা পায় এবং পরিবেশগত ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। এই প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কার্বন ক্যাপচার ও সিকুয়েস্ট্রেশন (Carbon Capture and Sequestration)। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড সংগ্রহ করে খনিজে রূপান্তরের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ শূন্যস্থানে সংরক্ষণ করা সম্ভব। এর ফলে একদিকে বায়ুমণ্ডলে কার্বনের পরিমাণ কমে, অন্যদিকে ভূমি ধসের ঝুঁকিও হ্রাস পায়।
অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সক্ষমতার দিক থেকেও ইউসিজি প্রযুক্তি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। উৎপাদিত সিনগ্যাস বিদ্যমান গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই ব্যবহার করা সম্ভব, যা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমাতে সহায়ক হবে। কম্বাইন্ড হিট অ্যান্ড পাওয়ার (CHP) প্রযুক্তির মাধ্যমে সিনগ্যাস ব্যবহার করলে তাপীয় দক্ষতা প্রায় ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত হয় এবং কার্বন নিঃসরণ প্রতি কিলোওয়াট-ঘন্টায় ০.১ কেজির নিচে নামানো সম্ভব, যা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় প্রায় দশ গুণ কম। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০ বছরের ক্যাশ-ফ্লো বিশ্লেষণে ১২ শতাংশ ডিসকাউন্ট রেট বিবেচনায়ও এই প্রকল্পের নিট বর্তমান মূল্য ইতিবাচক এবং অভ্যন্তরীণ আয়ের হার প্রায় ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ, পরিবেশ রক্ষা করেই এই প্রযুক্তি জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম। বর্তমানে উজবেকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া এবং চীনে বাণিজ্যিক পর্যায়ে ও পাইলট প্ল্যান্ট হিসেবে ইন-সিটু ইউসিজি প্রযুক্তি পরিচালিত হচ্ছে।
তবে ইউসিজি প্রযুক্তি বাস্তবায়নে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা সঠিক পরিকল্পনা ও গবেষণার মাধ্যমে অতিক্রম করা সম্ভব। প্রধান বাধা হলো ভূতাত্ত্বিক জটিলতা, যেমন পানিশূন্য স্তর ও ভূচ্যুতি, যা গ্যাসীকরণের সময় পানিদূষণ বা গ্যাস লিকেজের ঝুঁকি বাড়ায়। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, বিশেষত ইন-সিটু গ্যাসিফিকেশন প্রক্রিয়ায় দক্ষ জনবল ও উন্নত সরঞ্জামের অভাবও বড় অন্তরায়। দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে স্থিতিশীল জাতীয় কয়লা নীতি এবং কার্যকর জ্বালানি রূপান্তর কাঠামোর অভাব আরেকটি চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যার সমাধানে উন্নত ক্যাসিং প্রযুক্তি ও চাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োগ, সীমিত পরিসরে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়ন অপরিহার্য। সঠিক কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে এসব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশে প্রায় ৩.০ বিলিয়ন টন কয়লা মজুত রয়েছে, যার আনুমানিক তাপীয় শক্তি ২০,৮২০ টেরাওয়াট-ঘন্টা। বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী এই সম্পদ ৫০ থেকে ৬০ বছর জ্বালানি সরবরাহে সক্ষম। পরিবেশ ও অর্থনীতির দিক থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড কয়লা গ্যাসিফিকেশন অনখননযোগ্য কয়লা ব্যবহারের সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি হতে পারে। তবে এ প্রযুক্তি বাস্তবায়নের আগে ভূগর্ভস্থ পানিসম্পদ সুরক্ষা, পরিবেশগত সহনশীলতা এবং পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও ঝুঁকি যাচাই জরুরি। পাশাপাশি শক্তিশালী পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, স্বচ্ছ নজরদারি এবং সুস্পষ্ট ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ থাকা আবশ্যক।
একটি টেকসই ভবিষ্যতের লক্ষ্যে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নীতিকে অবশ্যই পরিবেশবান্ধব ও কম ঝুঁকিপূর্ণ নবায়নযোগ্য উৎসের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। এক্ষেত্রে সৌরশক্তি, বায়ুবিদ্যুৎ, কৃষি বর্জ্যনির্ভর বায়োমাস, পৌর এলাকার কঠিন জৈব বর্জ্য এবং ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সমন্বিত প্রয়োগই হতে পারে আমাদের জ্বালানি স্বনির্ভরতার মূল চাবিকাঠি। টেকসই জ্বালানি নীতি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার অপরিহার্য। বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, বরং পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য বজায় রেখে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। ইন-সিটু ইউসিজি প্রযুক্তি শুধু একটি বিকল্প নয়, এটি আধুনিক অর্থনৈতিক হাতিয়ার। যথাযথ বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং দেশীয় মেধার সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সবুজ শক্তির যুগে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে।
রিপোর্টারের নাম 














