ঢাকা ১০:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

গুমের নেপথ্যে নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে গুম একটি নিয়মিত রাষ্ট্রীয় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল নির্বাচন ও রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিরোধী মত দমন করা। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রতিটি বিতর্কিত নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের বেছে বেছে গুম এবং গণহারে আটক করা হতো। রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ, নিরাপত্তা সংকট এবং নির্বাচনের সঙ্গে গুমের এই যোগসূত্রটি ছিল পরিকল্পিত, যার মাধ্যমে দেশে এক ভয়াবহ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল।

গত ৪ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া এই প্রতিবেদনে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৫৬৪টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। কমিশনের তথ্যমতে, রাজনৈতিক পরিচয়ে গুমের শিকার হয়েছেন ৯৪৮ জন, যার মধ্যে জামায়াত ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংখ্যা সামগ্রিকভাবে বেশি। তবে গুম হওয়ার পর যারা আর কখনোই ফিরে আসেননি বা নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ৬৮ শতাংশই বিএনপি ও যুবদলের নেতা-কর্মী এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের সদস্য।

প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের বছর ২০০৯ সালে গুমের ঘটনা ছিল ১০টি, যা ২০১৩ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে ১২৮টিতে গিয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেও গুমের সংখ্যা ছিল আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি। ২০১৬ সালে দেশে সর্বোচ্চ ২১৫টি গুমের ঘটনা ঘটে এবং ২০১৭ ও ২০১৮ সালেও এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৯৪ ও ১৯২। কমিশন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, শুধু নির্বাচনই নয়, বড় কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ বা বিক্ষোভ কর্মসূচির আগেও বিরোধী দলের সক্রিয় নেতা-কর্মীদের তুলে নেওয়া হতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়েছিল, যার মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ গুমের সংজ্ঞা অনুযায়ী গৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনা ‘নিখোঁজ ও মৃত’ (Missing and Dead) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রমাণ করে যে, গুম কোনো সাধারণ আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা ছিল না, বরং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার একটি কৌশল হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতো। শেখ হাসিনার পতনের পর এই প্রতিবেদনের প্রকাশ দেশের মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকা বিমানবন্দরে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আটক: হত্যাসহ একাধিক মামলার আসামি

গুমের নেপথ্যে নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

আপডেট সময় : ০৪:২৭:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে গুম একটি নিয়মিত রাষ্ট্রীয় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল নির্বাচন ও রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিরোধী মত দমন করা। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রতিটি বিতর্কিত নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের বেছে বেছে গুম এবং গণহারে আটক করা হতো। রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ, নিরাপত্তা সংকট এবং নির্বাচনের সঙ্গে গুমের এই যোগসূত্রটি ছিল পরিকল্পিত, যার মাধ্যমে দেশে এক ভয়াবহ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল।

গত ৪ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া এই প্রতিবেদনে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৫৬৪টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। কমিশনের তথ্যমতে, রাজনৈতিক পরিচয়ে গুমের শিকার হয়েছেন ৯৪৮ জন, যার মধ্যে জামায়াত ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংখ্যা সামগ্রিকভাবে বেশি। তবে গুম হওয়ার পর যারা আর কখনোই ফিরে আসেননি বা নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ৬৮ শতাংশই বিএনপি ও যুবদলের নেতা-কর্মী এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের সদস্য।

প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের বছর ২০০৯ সালে গুমের ঘটনা ছিল ১০টি, যা ২০১৩ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে ১২৮টিতে গিয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেও গুমের সংখ্যা ছিল আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি। ২০১৬ সালে দেশে সর্বোচ্চ ২১৫টি গুমের ঘটনা ঘটে এবং ২০১৭ ও ২০১৮ সালেও এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৯৪ ও ১৯২। কমিশন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, শুধু নির্বাচনই নয়, বড় কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ বা বিক্ষোভ কর্মসূচির আগেও বিরোধী দলের সক্রিয় নেতা-কর্মীদের তুলে নেওয়া হতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়েছিল, যার মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ গুমের সংজ্ঞা অনুযায়ী গৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনা ‘নিখোঁজ ও মৃত’ (Missing and Dead) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রমাণ করে যে, গুম কোনো সাধারণ আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা ছিল না, বরং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার একটি কৌশল হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতো। শেখ হাসিনার পতনের পর এই প্রতিবেদনের প্রকাশ দেশের মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।