ঢাকা ০৪:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

লালদিয়া টার্মিনাল চুক্তি: উন্নয়ন নাকি সার্বভৌমত্ব হারানো?

চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘এপিএম টার্মিনালস’-এর সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক চুক্তিটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই চুক্তির ফলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে—এমন গুঞ্জন ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হলেও গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি মূলত একটি কৌশলগত বিনিয়োগ ও আধুনিকায়নের পদক্ষেপ। জাতীয় প্রবৃদ্ধির প্রধান চাবিকাঠি বন্দর ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা কাটাতে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এই চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক হতে পারে।

গত ১৭ নভেম্বর স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আওতায় ড্যানিশ প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, বন্দরের মালিকানা হস্তান্তর করা হচ্ছে না; বরং নির্দিষ্ট মেয়াদের পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) শেষে অবকাঠামোসহ সবকিছুই রাষ্ট্রের মালিকানায় ফিরে আসবে।

চট্টগ্রাম বন্দর দীর্ঘদিন ধরে জাহাজ জট, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতির কারণে বৈশ্বিক সূচকে পিছিয়ে আছে। এর ফলে আমদানিকারকদের খরচ বাড়ছে এবং রপ্তানি বাণিজ্যে ধীরগতি দেখা দিচ্ছে। ভিয়েতনামের কাই মেপ বন্দরের মতো বৈশ্বিক অপারেটরদের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা চালু করে অনেক দেশ ইতিমধ্যে শীর্ষ স্থানে উঠে এসেছে। লালদিয়া টার্মিনাল প্রকল্পে এপিএম টার্মিনালসের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের বন্দরে সেই আধুনিক প্রযুক্তি ও পেশাদারিত্বের ছোঁয়া দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রকল্পে রাষ্ট্রের কোনো আর্থিক ঝুঁকি নেই, উল্টো ২৫০ কোটি টাকা ‘সাইনিং মানি’ এবং ভবিষ্যতে কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাড়লে আয়ের পরিমাণও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

ত্রিশ বছরের এই চুক্তির মেয়াদ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এটি খুবই স্বাভাবিক। ভারত বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে এ ধরনের অবকাঠামো প্রকল্পের মেয়াদ ৫০ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। চুক্তির গোপনীয়তা নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাণিজ্যিক সংবেদনশীলতার কারণে পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ না করা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত নিয়ম, তবে মালিকানা ও আয়ের কাঠামোর মতো মৌলিক বিষয়গুলো ইতিমধ্যেই জনসমক্ষে আনা হয়েছে। এই টার্মিনাল চালু হলে পণ্য পরিবহনের সময় ও লজিস্টিক ব্যয় কমবে, যা সরাসরি জিডিপিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অর্থনৈতিক সুফলের পাশাপাশি এই প্রকল্প হাজারো পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং দেশের তরুণ প্রকৌশলী ও ব্যবস্থাপকদের বিশ্বমানের প্রশিক্ষণের সুযোগ দেবে। ডিজিটাল টার্মিনাল অপারেশন ও রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে বন্দরের স্বচ্ছতা বাড়বে, যা দীর্ঘদিনের হয়রানি ও অনিয়ম কমাতে সহায়ক হবে। তবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। যদি অপারেটর পারফরম্যান্স সূচক বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে চুক্তিতে জরিমানা ও হস্তক্ষেপের কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে, তথ্যহীন আতঙ্ক ছড়িয়ে একটি সম্ভাবনাকে নস্যাৎ না করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে এই সুযোগ কাজে লাগানোই এখন সময়ের দাবি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানজুড়ে ব্যাপক হামলা: ২০ প্রদেশ লক্ষ্যবস্তু, রেড ক্রিসেন্টের সতর্কবার্তা

লালদিয়া টার্মিনাল চুক্তি: উন্নয়ন নাকি সার্বভৌমত্ব হারানো?

আপডেট সময় : ০১:৪৪:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘এপিএম টার্মিনালস’-এর সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক চুক্তিটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই চুক্তির ফলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে—এমন গুঞ্জন ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হলেও গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি মূলত একটি কৌশলগত বিনিয়োগ ও আধুনিকায়নের পদক্ষেপ। জাতীয় প্রবৃদ্ধির প্রধান চাবিকাঠি বন্দর ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা কাটাতে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এই চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক হতে পারে।

গত ১৭ নভেম্বর স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আওতায় ড্যানিশ প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, বন্দরের মালিকানা হস্তান্তর করা হচ্ছে না; বরং নির্দিষ্ট মেয়াদের পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) শেষে অবকাঠামোসহ সবকিছুই রাষ্ট্রের মালিকানায় ফিরে আসবে।

চট্টগ্রাম বন্দর দীর্ঘদিন ধরে জাহাজ জট, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতির কারণে বৈশ্বিক সূচকে পিছিয়ে আছে। এর ফলে আমদানিকারকদের খরচ বাড়ছে এবং রপ্তানি বাণিজ্যে ধীরগতি দেখা দিচ্ছে। ভিয়েতনামের কাই মেপ বন্দরের মতো বৈশ্বিক অপারেটরদের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা চালু করে অনেক দেশ ইতিমধ্যে শীর্ষ স্থানে উঠে এসেছে। লালদিয়া টার্মিনাল প্রকল্পে এপিএম টার্মিনালসের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের বন্দরে সেই আধুনিক প্রযুক্তি ও পেশাদারিত্বের ছোঁয়া দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রকল্পে রাষ্ট্রের কোনো আর্থিক ঝুঁকি নেই, উল্টো ২৫০ কোটি টাকা ‘সাইনিং মানি’ এবং ভবিষ্যতে কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাড়লে আয়ের পরিমাণও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

ত্রিশ বছরের এই চুক্তির মেয়াদ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এটি খুবই স্বাভাবিক। ভারত বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে এ ধরনের অবকাঠামো প্রকল্পের মেয়াদ ৫০ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। চুক্তির গোপনীয়তা নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাণিজ্যিক সংবেদনশীলতার কারণে পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ না করা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত নিয়ম, তবে মালিকানা ও আয়ের কাঠামোর মতো মৌলিক বিষয়গুলো ইতিমধ্যেই জনসমক্ষে আনা হয়েছে। এই টার্মিনাল চালু হলে পণ্য পরিবহনের সময় ও লজিস্টিক ব্যয় কমবে, যা সরাসরি জিডিপিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অর্থনৈতিক সুফলের পাশাপাশি এই প্রকল্প হাজারো পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং দেশের তরুণ প্রকৌশলী ও ব্যবস্থাপকদের বিশ্বমানের প্রশিক্ষণের সুযোগ দেবে। ডিজিটাল টার্মিনাল অপারেশন ও রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে বন্দরের স্বচ্ছতা বাড়বে, যা দীর্ঘদিনের হয়রানি ও অনিয়ম কমাতে সহায়ক হবে। তবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। যদি অপারেটর পারফরম্যান্স সূচক বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে চুক্তিতে জরিমানা ও হস্তক্ষেপের কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে, তথ্যহীন আতঙ্ক ছড়িয়ে একটি সম্ভাবনাকে নস্যাৎ না করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে এই সুযোগ কাজে লাগানোই এখন সময়ের দাবি।