গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো মানুষের অবাধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে কেবল ভোটের মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্রের চেয়েও বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মবতন্ত্র’ বা গণউন্মাদনা। মবতন্ত্র কেবল রাজপথে ভাঙচুর নয়, বরং এটি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দলবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার এক ভয়াবহ প্রবণতা। যখন বিচারকের রায়ের আগেই রাজপথে বিচার কার্যকর করা হয় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করে আক্রমণ চালানো হয়, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো দুটিই গভীর সংকটের মুখে পড়ে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মবতন্ত্র হলো এমন এক পরিস্থিতি যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত যুক্তিবোধ লোপ পায় এবং উগ্র আবেগ প্রাধান্য লাভ করে। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী গুস্তাভ ল্য বঁ তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য ক্রাউড’ গ্রন্থে লিখেছিলেন যে, একটি ভিড় কখনো যুক্তিবাদী হয় না, বরং তা কেবল আবেগ দ্বারা চালিত হয়। বাংলাদেশে বিশেষ করে গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এই মবতন্ত্র উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গুজব, ভিডিও ক্লিপ কিংবা অসম্পূর্ণ খবরকে কেন্দ্র করে বাড়িঘর ভাঙচুর ও গণপিটুনির মতো ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে ‘জনতার ক্ষোভ’ বলে চালিয়ে দিয়ে এক ধরনের নীরব সামাজিক বৈধতা পাওয়ার চেষ্টা করে।
প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই মবতন্ত্রের আগুনে ঘি ঢালছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো মানুষের কণ্ঠস্বর হলেও এগুলোকে গুজব ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রবাসী কিছু ইউটিউবারের উসকানিতে গণমাধ্যমে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ। সমাজবিজ্ঞানী ম্যানুয়েল কাস্তেলসের ভাষায়, নেটওয়ার্ক সমাজে ক্ষমতা খুব দ্রুত ছড়ালেও দায়িত্ববোধ ততটা দ্রুত ছড়ায় না। এই দায়িত্বহীনতার কারণেই ডিজিটাল জগতের উত্তেজনা মুহূর্তের মধ্যে রাজপথে সহিংস রূপ নিচ্ছে, যার দায়ভার কেউ গ্রহণ করছে না।
রাজনীতিতে মবতন্ত্রকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা এক বিপজ্জনক সংস্কৃতি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল বা প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য জনতার ক্ষোভকে ব্যবহার করার ফলে রাজনীতির সুস্থ পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। আইনের শাসন দুর্বল হলে সহিংসতা নিজেকে ‘ন্যায়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা দার্শনিক হান্না আরেন্টের দর্শনেও উঠে এসেছে। যখন বৈধ শক্তি প্রয়োগের অধিকার রাষ্ট্রের হাত থেকে জনতা বা ভিড়ের হাতে চলে যায়, তখন ম্যাক্স ওয়েবারের সংজ্ঞায় রাষ্ট্র নিজেই দুর্বল হয়ে পড়ে। সুতরাং মবতন্ত্র কেবল আইনি সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর নৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটও বটে।
মবতন্ত্র রুখতে হলে রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে। দল, ধর্ম বা পরিচয় নির্বিশেষে মবতন্ত্রে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, তবে তা যেন মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ না করে। শিক্ষাব্যবস্থায় নাগরিক ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে মানুষকে বোঝাতে হবে যে, মব বা ভিড়ের শাসন কোনো সমাধান নয় বরং এটি একটি ঘৃণ্য অপরাধ। আমরা যদি এখনই বিবেক ও আইনের পথে না হাঁটি, তবে আবেগ আর উগ্র জনতার হাতে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে।
রিপোর্টারের নাম 














