আগামী জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা নবনির্বাচিত সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বাংলাদেশকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, যারা সরকার গঠনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির বিষয়ে জনগণের সামনে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।
নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং তার পরবর্তী ঘটনাবলী নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ রয়েছে। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলই বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হলেও, সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে তাদের সমর্থনের হার প্রায় সমানে সমানে দেখা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। যদি নির্বাচনে কারচুপির কোনো অভিযোগ ওঠে, তবে তা দ্রুতই দেশব্যাপী জোরালো আন্দোলনের জন্ম দিতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, নির্বাচনকে প্রভাবিত করার যেকোনো প্রচেষ্টা দেশে অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে, যেমনটি এক-এগারোর পটভূমিতে পরিলক্ষিত হয়েছিল।
দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। প্রধান দুটি দলের মধ্যে একটি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হলেও, অপরটির তৃণমূল পর্যায়ে জনসমর্থন বেশি। সম্প্রতি, একটি দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। যদি দলটি ক্ষমতায় আসে এবং তাদের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে ব্যাপক গণবিক্ষোভ দেখা দিতে পারে এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও বাড়তে পারে। অতীতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল, যা ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হয়েছিল। তাই, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করা হবে, তা বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কও আগামী সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হতে পারে। উন্নয়ন সহযোগী এবং পশ্চিমা দেশগুলো একটি দক্ষ, গতিশীল ও দুর্নীতিমুক্ত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। অতীতে দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছিল এবং সরকারের কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল, যার ফলে জাতীয় সমস্যাগুলো সমাধানে ব্যর্থতা দেখা দিয়েছিল। বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা এবং দেশব্যাপী বোমা হামলা ও বিদেশি কূটনীতিকদের ওপর হামলার মতো ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছিল। যদি কোনো দল ক্ষমতায় এসে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করে, তবে তা দেশের জন্য আরও বড় সংকট বয়ে আনতে পারে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোর বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর নিজস্ব কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে দলটির প্রতিনিধিদের ঘন ঘন বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নারী অধিকার ও সংখ্যালঘুদের অধিকারের মতো বিষয়গুলোতে তাদের অবস্থান পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। যদি তারা একটি দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত সরকার উপহার দিতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও সহযোগিতা পেতে পারে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও একটি সংবেদনশীল বিষয়। ২০১৪ সালের পর থেকে বিএনপি ভারতের বিষয়ে তার অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে এবং দলের মধ্যে এই ধারণা জন্মেছে যে, ভারতের সমর্থন ছাড়া ক্ষমতায় আসা কঠিন। ভারত সরকারও আওয়ামী লীগকে একটি বিকল্প হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে, অন্য দলটির বিষয়ে ভারতের প্রকাশ্য অবস্থান কিছুটা নেতিবাচক হলেও, তারা সব দলের সঙ্গেই কাজ করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। যদি এই দলটি ক্ষমতায় আসে, তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা মালদ্বীপের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। তবে, জামায়াতে ইসলামী সরকারের কূটনৈতিক দক্ষতার ওপর এই সম্পর্ক নির্ভর করবে।
সার্বিকভাবে, দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় দলগুলোর সামনেই বড় চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় দলগুলোর সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও কৌশল সম্পর্কে জনগণের সামনে স্বচ্ছ ধারণা থাকা আবশ্যক।
রিপোর্টারের নাম 














