বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি নাম নন, বরং তিনি ছিলেন এক দীর্ঘ সংঘাতময় ও উত্তাল সময়ের জীবন্ত দলিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক শাহাদাতের পর দেশ যখন চরম অনিশ্চয়তা আর ষড়যন্ত্রের জালে বন্দি, ঠিক তখনই রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথে পা রাখেন তিনি। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে একজন সাধারণ গৃহিণী থেকে দেশনেত্রীতে পরিণত হওয়ার এই যাত্রা সমকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত। তার বিদায়ের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটলো বাংলাদেশের রাজনীতির এক বর্ণাঢ্য ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের।
১৯৮১ সালের সেই চরম সংকটকালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) হাল ধরা ছিল খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সামরিক শাসন আর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দলকে সুসংগঠিত করা এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে রাজপথে সক্রিয় হওয়া—এই দুই ফ্রন্টেই তিনি সফলতার পরিচয় দেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার আপসহীন অবস্থান তাকে জনগণের কাছে ‘দেশনেত্রী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সেই লড়াইয়ের সফল পরিণতিতেই ১৯৯১ সালে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
তার রাজনৈতিক দর্শনের মূলে ছিল জাতীয়তাবাদ, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের সুসংহতকরণ। ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি শিক্ষা, নারী উন্নয়ন এবং অবকাঠামো খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনেন। বিশেষ করে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার আইনি স্বীকৃতি প্রদানে তার ভূমিকা রাজনৈতিক ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও জনসমর্থন থাকলে প্রতিকূল পরিবেশেও রাষ্ট্রকে সঠিক দিশা দেওয়া সম্ভব।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন কেবল প্রাপ্তি আর ক্ষমতার সমীকরণ ছিল না; এটি ছিল নিরন্তর সংগ্রামের এক আখ্যান। কারাবরণ, আইনি লড়াই এবং দীর্ঘ সময় গৃহবন্দি থাকার মতো কঠিন পরিস্থিতিও তার আদর্শিক দৃঢ়তাকে টলাতে পারেনি। সমর্থকদের চোখে তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অটল পাহাড়। এমনকি চরম রাজনৈতিক বৈরিতার মুখেও তিনি কখনো দেশত্যাগ বা আপসের পথে হাঁটেননি, যা তাকে এক অনন্য নৈতিক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
একজন নারী হিসেবে পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামোয় নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা খালেদা জিয়া অসংখ্য নারীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। তার নেতৃত্ব শুধু একটি রাজনৈতিক দলের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা জাতীয় আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ছিল আপসহীন। আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণে তার ভূমিকা জাতীয়তাবাদী চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
খালেদা জিয়ার প্রয়াণে আজ জাতি গভীরভাবে শোকাহত। তার অনুপস্থিতি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তবে তিনি যে সংসদীয় গণতন্ত্র, ভোটাধিকার রক্ষা এবং জাতীয়তাবাদের আদর্শ রেখে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। একটি গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন সারথি হিসেবে খালেদা জিয়ার নাম ইতিহাসের পাতায় চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। তার জীবন ও সংগ্রাম যুগে যুগে গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার এক অফুরন্ত উৎস হয়ে থাকবে।
রিপোর্টারের নাম 














