ঢাকা ০৭:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

ঢাকামুখী শোকযাত্রা, জনশ্রদ্ধায় সিক্ত আপসহীনা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:৪১:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

বিজয়ের মাসের শেষলগ্নে ‘মা, মাটি ও মানুষের নেত্রী’ হিসেবে খ্যাত খালেদা জিয়ার মৃত্যুশোকে  আচ্ছন্ন সারা দেশ। শোকের বিবৃতি পাঠিয়েছে জাতিসংঘ। পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়কেরা জানাচ্ছেন সমবেদনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবরে কান্না চলছে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে। শোকের সঙ্গে চলছে তার রাজনৈতিক জীবনের অবিচলতা নিয়ে নানামুখী স্মরণ।

১৯৪৫ সালে ভারতবর্ষের নয়াবস্তিতে জন্ম নেওয়া শান্তি নামের মেয়েটিই হয়ে উঠেছিলেন কোটি বাংলাদেশির জনপ্রিয় নেত্রী। ৪৩ বছরের সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সময় গ্রেফতার, আটকের শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক কারণে অবিচল সিদ্ধান্তের কারণে সচেতন মহলে তিনি আপোসহীন খ্যাতি পেয়েছেন।

৭৯ বছরের এই দীর্ঘযাত্রা কখনোই সংগ্রামের বাইরে থাকেননি খালেদা জিয়া। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সময় সেনাহেফাজতে থাকার পর থেকে স্বৈরাচার এরশাদ গৃহবন্দি, গ্রেফতার করলেও অনমনীয় থাকেন তিনি। অংশ নেননি পাতানো নির্বাচনগুলোতেও। এরশাদের অধীনে ১৯৮৬, ৮৮ এবং শেখ হাসিনার অধীনে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি।

খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশে স্মরণ করা হয় নব্বই দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সারাদেশে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য। তিনি সেই আন্দোলনে টানা আট বছর নেতৃত্ব দেন, জোটগতভাবেও নেতৃত্ব রাখেন। ওই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন প্রবীণ রাজনীতিক সাইফুল হক।

বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে সাইফুল হকের ভাষ্য, ‘বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা সাধারণ গৃহবধূ থেকে একটি ক্রান্তিক্লালে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে এসেছেন। ১৯৮৪-৮৬ সালে তার নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট সক্রিয় ছিলো। তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা। কোনও অন্যায়ের কাছে আপস করেননি।’

‘এরশাদের অধীনে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিলো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দল ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৮ দলের। কিন্তু কয়েকটি দলকে নিয়ে শেখ হাসিনা ঠিকই নির্বাচনে চলে যান। পরবর্তীকালে ৮৮ সালের নির্বাচনেও যাননি খালেদা জিয়া। তখন এরশাদের অধীনে নির্বাচনে গিয়ে প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা হন আ. স. ম আব্দুর রব। মূলত আপসহীন ও দৃঢ মনোভাবের কারণেই ৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তার দল বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় লাভ করে।’

খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালের একটি স্মরণ করে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘১৯৯১ সালে তৎকালীন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননসহ আমরা তার দফতরে গিয়েছিলাম। তিনি আমাদের কুশল জিজ্ঞেস করেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় আমাদের পরামর্শ ও সহযোগিতা চেয়েছিলেন। তার মধ্যে তখন কোনও দাম্ভিকতা দেখিনি।’

সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর গ্রন্থ হার লাইফ হার স্টোরি বিএনপিনেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, ওই সময় রাষ্ট্রপতি এরশাদ চেয়েছিলেন খালেদা জিয়াকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করতে। ওই প্রস্তাব তিনি মওদুদ আহমদ ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। যদিও খালেদা জিয়া ওই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। তিনি মনে করতেন, এরশাদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করিয়েছেন।

খালেদা জিয়া, ছবি: খালেদ হোসেন পরাগখালেদা জিয়া, ছবি: খালেদ হোসেন পরাগ কেন অসম্ভব জনপ্রিয় খালেদা জিয়া

এরশাদের সামরিক শাসনের সময় খালেদা জিয়ার অভিষেক হয়েছিল। তখন একজন গৃহবধূ থেকে রাজনীতির উত্তপ্ত ময়দানে তার বিচরণ শুরু হয়।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার ভাষ্য, ‘যখন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অত্যাচারে বড় বড় রাজনীতিবিদরা খাবি খাচ্ছিলেন, সে পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া নতুন জাগরণ সৃষ্টি করেছেন। তিনি কোনও আপস করেননি। তাই সাধারণ মানুষের কাছে তার এক ধরনের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে।’

‘এর কারণে ৯১ সালের নির্বাচনে তার দল অসাধারণ ফলাফল অর্জন করে। যেখানে তখন বিশ্লেষকরা ধরেই নিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসছে। সেই থেকে তার প্রতি মানুষের গ্রহণযোগ্যতা অব্যাহত থাকে। বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দলকে প্রায় চার দশক ধরে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তিনি।’

মাহমুদুর রহমান মান্না উল্লেখ করেন, ‘আর ৯০-এ এরশাদের পতনের পর ৯১ সালে খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো সরকার প্রধান হিসেবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসেন। একটি দল ক্ষমতায় থাকলে নানা কারণে সরকার প্রধানকে নানা বিতর্কে পরতে হয়। সেই অর্থে খালেদা জিয়া ছিলেন স্বচ্ছ। ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি। তিনি কোনও দুর্নীতির সাথেও জড়িত ছিলেন না। তাই এখনও অসম্ভব জনপ্রিয়।’

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট সংক্রান্ত দুদকের একটি মামলায় সাজা হয় খালেদা জিয়ার। সেদিনই তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন বিশেষ আদালত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর রাষ্ট্রপতির আদেশে তিনি মুক্তি পান।

রাজনীতিক ও চিন্তক ফিরোজ আহমেদ লিখেছেন, ‘একানব্বই সালে তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হন, সকলেই বিস্মিত হয়েছিলেন। কিন্তু ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল দলটির উগ্র অহমিকা, খালেদা জিয়াকে জিতিয়ে দিয়েছিল তার একদিকে আপোষহীন, আরেকদিকে নম্র ভাবমূর্তি।’

‘নারীদের জন্য শিক্ষা বৃত্তি তার সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ।  আজও এর ফল ভোগ করছে গোটা সমাজ।

রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে বহু  নিপীড়নের শিকার তিনি হয়েছেন।’ বলেন ফিরোজ আহমেদ।

খালেদা জিয়া যখন মারা যান, তার প্রতিক্রিয়ায় তার আজন্ম-বিরোধী রাজনৈতিক নেতা শেখ হাসিনাও শোক প্রকাশ করেছেন। সমবেদনা জানিয়েছেন পুত্র তারেক রহমানের প্রতি।

বিএনপির পক্ষ থেকে বরাবরই শেখ হাসিনার সরকারকেই খালেদা জিয়ার অসুস্থতার জন্য দায়ী করা হচ্ছে। অন্তবর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এক ব্রিফিয়ে শেখ হাসিনাকেও দায়ী করেন।

মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোরে খালেদা জিয়ার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে রাজনৈতিক মহলসহ সর্বমহলে শোক উঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ভরে উঠে শোকের বার্তায়। দেশি, বিদেশি আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বরা দিয়েছেন শোক বিবৃতি। গণমাধ্যমে নেওয়া হয়েছে বিশেষ আয়োজন। দৈনিক পত্রিকাগুলো বিশেষ কভার করার খবরও মিলেছে এই প্রতিবেদন লেখার সময়।

মৃত্যুর খবরে সারা দেশ থেকে অনুসারীদের ঢাকামুখী হওয়ার বার্তাও পাওয়া গেছে। আগামীকাল বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) দুপুরে জানাজার পর তাকে চন্দ্রিমা উদ্যানে স্বামী জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে দাফন করা হতে পারে।

জনপ্রিয়তার বিচারে দেশের সংসদীয় নির্বাচন একটি উদাহরণ। ১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনটি সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রতিবারই পাঁচটি আসনে প্রার্থী হয়েছেন এবং সবগুলো আসনে তিনি জয়লাভ করেছেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি বিতর্কিত একতরফা নির্বাচনেও খালেদা জিয়া প্রার্থী ছিলেন। এরপর ২০০৮ সালে খালেদা জিয়া তিনটি আসনে প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করে তিনটিতে জয়ী হন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে খারাপ ফলাফল করেছিল বিএনপি। সে নির্বাচনে মাত্র ৩০টি আসন পেলেও খালেদা জিয়া নির্বাচনে জয়লাভ করতে কোন অসুবিধা হয়নি। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও খালেদা জিয়া তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। আদালতের নির্দেশে তার মনোনয়ন বাতিল হয়েছিলো। সর্বশেষ আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য তিনটি আসন থেকে স্থায়ী কমিটির মনোনয়ন পেয়েছিলেন খালেদা জিয়া।

খালেদা জিয়া,  ছবি: গ্যেটে ইমেজখালেদা জিয়া,  ছবি: গ্যেটে ইমেজ

রাজনীতির ৪৩ বছর

স্বামী জিয়াউর রহমানের বধূ হিসেবেই জীবনের অর্ধেক সময় কাটিয়েছেন খালেদা জিয়া। রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে ৩০ এপ্রিল চট্টগ্রামে সার্কিট হাউজে কিছু সেনা সদস্যের গুলিতে নিহত হওয়ার পর বিএনপিতে যোগ দেন খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালে ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন তিনি।

খালেদা জিয়ার একটি বর্ণাঢ্য জীবনী রচনা করেছেন প্রয়াত সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ। তিনি হার লাইফ হার স্টোরি শীর্ষক গ্রন্থে জানাচ্ছেন, খালেদা জিয়া দলে সক্রিয় হন জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরই। দলের নেতাদের সঙ্গে মিটিং, জরুরি আলাপ এসবে যুক্ত হতেন কিন্তু দৃশ্যমান হতেন না।

১৯৮১ সালের জুনে বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি সাক্ষাৎকারে আসেন খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি সাত্তার তাকে আমন্ত্রণ জানালে সেটিই হয় প্রথম বড়ভাবে জনপ্রকাশ্যে আসা। 

দলের ভাইস চেয়ারম্যান, ওই সময়ের ছাত্রনেতা  শামসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউন-কে বলেন, ১৯৮২ সালে বিএনপির সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেন এরশাদ। সেই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির হাল ধরেছিলেন বেগম খালেদা জিয়ার মতো উদীয়মান নেত্রী।

১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি প্রথম বক্তৃতা রাখেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন তিনি।

১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়াপারসন নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া। সেই থেকে মৃত্যু অবধি তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আশির দশকের শুরু থেকে তিনি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্ব দেন।

শামসুজ্জামান দুদু উল্লেখ করেন, ‘সেই থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রধান নিয়ামক শক্তি ছিলেন তিনি। কোনও বিষয়ে স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুকে ভয় করেননি। সেই থেকে দেশের মানুষের অন্তরে স্থান করে নেন। যার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে ১৯৯১ সালের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে।’

‘সে সময় আওয়ামী লীগের একটি অংশ ধরেই নিয়েছিলে, তারা সরকার গঠন করবে। এমনকি শেখ হাসিনাকে প্রধান করে তারা মন্ত্রিসভা গঠনেরও ছক কষেছিলেন। কিন্তু দেশের মানুষ তাদের সে পরিকল্পনা ভণ্ডল করে বেগম খালেদা জিয়াকেই নির্বাচিত করেছিলেন।’ বলেন দুদু।

তিন প্রশ্নে বিতর্কে খালেদা জিয়া

নিজের জন্মদিন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী জামায়াতে ইসলামীকে সরকারে নেওয়া এবং প্রতিবেশি ভারত প্রশ্নে রাজনৈতিক জীবনে বিতর্কে পড়েছেন খালেদা জিয়া।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, নব্বইয়ের শুরুতে কয়েকজন নেতার আগ্রহে ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালনের উৎসাহ শুরু হয়। স্বাধীনতার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপরিবার নিহতের দিনটিতে জন্মদিন পালন নিয়ে নানা বিতর্ক ছড়ায়। যদিও ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান খালেদা জিয়া। ওই আহ্বানের আগে থেকে ২০১৬ সালেই ১৫ আগস্টের প্রথম প্রহরে কেক কাটা থেকে বিরত থাকেন খালেদা জিয়া।

ওই সময় প্রয়াত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ বিশিষ্টজনদের একান্ত অনুরোধে সাড়া দেন খালেদা জিয়া। ওই বছরেই একটি সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সকল নেতাদের সম্মান করার আহ্বান জানান তিনি।

রাজনৈতিক মহলে ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ না করার ঘটনাটিকে পররাষ্ট্রনৈতিক জায়গা থেকে বেগম জিয়ার সমালোচনার সুযোগ রয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা এসেছে।

পরে ২০১৫ সালে ভারতের দ্য সানডে গার্ডিয়ান পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়া জানিয়েছিলেন, জীবনের প্রতি হুমকি থাকায় ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাননি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

রাজনৈতিক সমালোচনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলো, একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামের বিরোধী জামায়াতের সঙ্গে ১৯৯৯ সালে জোট ও ২০০১ সালে সরকার গঠন। স্বাধীনতা বিরোধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের প্রসঙ্গ এনে সমালোচনা হয়েছে বিএনপিপ্রধানের।

ওয়ান-ইলেভেনের মঈন উদ্দীন ও ফখরুদ্দীন সরকারের সময় দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালে নিম্ন আদালতে পাঁচ বছরের সাজা হলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। বিশেষ ব্যবস্থায় পুরোনো ঢাকার পরিত্যক্ত কারাগারে তাকে রাখা হয়। এরপর ওই বছরের ১ এপ্রিল তাকে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। পরবর্তী সময়ে নিম্ন আদালতের সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করেন হাইকোর্ট।

খালেদা জিয়া ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এরমধ্যে দ্বিতীয়দফার দায়িত্বকাল ছিল একমাস। বিএনপির চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে খালেদা জিয়া, তার দল বিএনপিও বিজয়ী হয়। ওই বছরই বেগম জিয়া পঞ্চম সংসদে প্রধানমন্ত্রী হন। তার নেতৃত্বেই সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারপদ্ধতি থেকে সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন হয়। এরপর ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর এক মাসের জন্য ষষ্ঠ সংসদের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রণয়নের পর ওই বছরে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেরে যায় খালেদা জিয়ার দল বিএনপি; তিনি হন বিরোধীদলীয় নেতা।

১৯৯৯ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত গোলাম আজমের নেতৃত্বাধীন জামায়াতে ইসলামী ও শায়খল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটের সমন্বয়ে গঠিত চারদলীয় ঐক্যজোটের ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ২০০১ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া। জোটে চারদল থাকলেও সরকারগঠনে বিএনপির সঙ্গে শুধু একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াতকে সঙ্গে নেন তিনি।

২০০৮ সালের নির্বাচনের পর ফের বিরোধীদলীয় নেতা হন খালেদা জিয়া। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেন তিনি। একইসঙ্গে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই সে বছর নির্বাচন থেকে বিরত থাকে। ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় খালেদা জিয়া যখন কারাগারে, তখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের মধ্যে সমন্বয় করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপি। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে থাকায় সেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি খালেদা জিয়া। এমনকি, এই নির্বাচনে জিয়া পরিবারের কোনও সদস্যই অংশগ্রহণ করেননি।

 খালেদা জিয়া, ছবি: সালমান তারেক শাকিল খালেদা জিয়া, ছবি: সালমান তারেক শাকিল ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকে অসুস্থতা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। বন্দি থাকা অবস্থায় তিনি দীর্ঘদিন তৎকালীণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষ মুক্তি পেয়ে বাসায় ফেরেন যান খালেদা জিয়া।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে একবার, ২০১৮ সাল একবারসহ এরপর থেকে প্রতিবছরই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে খালেদা জিয়াকে।

প্রায় দুই বছর কারাবন্দি থাকার পর ২০২০ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময় পারিবারিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ছয় মাসের জন্য শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি পান খালেদা জিয়া।

এর আগে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে ওই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর কারারুদ্ধ হন তিনি। পরে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান খালেদা জিয়া।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যাওয়ার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ১৪টি ঈদ কেটেছে একটি রুমের ভেতরে অবস্থান করেই। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৭ জুন ঈদুল আজহার দিনটিও ব্যতিক্রম ছিল না। গুলশান-২-এর বাসা ‘ফিরোজা’তেই নিজের কক্ষে কাটান ঈদের সময়।

প্রসঙ্গত, এক-এগারোর মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকারের সময় সংসদ ভবন এলাকায় সাবজেলে বন্দি থাকাকালে দুটি ঈদ কাটিয়েছেন খালেদা জিয়া।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে কারাগারে যাওয়ার আগে ৭ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া নিজে শেষ সংবাদ সম্মেলন করেন। মাসের শুরুতেই তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটি, বিলুপ্ত ২০ দলীয় জোটেরও সভাও করেন। ওই সময়েই তিনি তার স্বামী, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত করেন।

শায়রুল কবির খান উল্লেখ করেন, বেগম জিয়া সর্বশেষ সমাবেশ করেন ২০১৭ সালে। সর্বশেষ ইফতার ও ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন ২০১৬ সালে।

রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া ২০২৪ সালে এবং ও এ বছর স্বশস্ত্র বাহিনী দিবসে অংশগ্রহণ করেন। উভয় অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও আলোচনা করেন।

শায়রুল কবির খান জানান, ১৩ নভেম্বর ২০১০ বেগম জিয়া তার ২৮ বছরের আবাসস্থল ছেড়ে যান। তিনি অভিযোগ করেন তাকে বলপ্রয়োগে বাসা থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। তবে সরকারি পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তিনি স্বেচ্ছায় বাসা ত্যাগ করেছেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হিসেবে জিয়াউর রহমানের সাথে শহীদ মইনুল সড়কের ৬ নম্বর বাড়িতে ওঠেন খালেদা জিয়া। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়া চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যূত্থানে নিহত হলে ১২ জুন তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার সেনানিবাসের ওই বাড়িটি খালেদার নামে বরাদ্দ দেন।

শায়রুল কবির খান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় চির অম্লান আপোষহীন নেত্রী খালেদা জিয়া। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম ও একদলীয় শাসন বাকশাল থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুণঃপ্রবর্তনে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ এর ভিত্তিতে জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠিত করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার সহধর্মিণী খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনঃউদ্ধারে দীর্ঘ সংগ্রামে বিজয়গাঁথার প্রতিক একমাত্র আপোষহীন নেত্রী। তাদের দেখানো পথ ধরে রক্তের ও রাজনৈতিক দর্শনের উত্তরাধিকার বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান  ‘৩১ দফা’র ভিত্তিতে আগামীর কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তুলবেন বলে আশা করি।’

সংসারে, পরিবারে খালেদা জিয়া

বেগম খালেদা জিয়ার প্রকৃত নাম খালেদা খানম, ডাক নাম পুতুল। আগস্ট ১৫, ১৯৪৬ সালে জলপাইগুড়িতে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তিন বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ভাইয়েরা সবার ছোট। তাঁর পিতামহ হাজী সালামত আলী, মাতামহ জলপাইগুড়ির তোয়াবুর রহমান। বাবা জনাব ইস্কান্দর মজুমদার এবং মা বেগম তৈয়বা মজুমদার।

খালেদা জিয়ার স্বামী স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তি যুদ্ধে প্রথম ব্রিগেড জেড ফোর্স-এর কমান্ডার ও সেক্টর কমান্ডার হিসেবে রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান,সাবেক ভিশনারি রাষ্ট্র নায়ক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তম।

তার এক ভাই মেজর (অব.) সাইদ ইস্কান্দার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে ফেনী-১ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। তার দুই ছেলের মধ্যে বড় তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তার কনিষ্ঠ ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি মালায়া হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান।

দিনাজপুর শহরের মুদিপাড়া। আদি পিতৃ-ভিটা ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের মজুমদার বাড়ী তার নিবাস। বাবা জনাব ইস্কান্দর মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। ইস্কান্দর মজুমদার ১৯১৯ সালে ফেনী থেকে জলপাইগুড়ি যান। বোনের বাসায় থেকে মেট্রিক পাস করেন ও পরে চা ব্যবসায়ে জড়িত হন। ১৯৩৭ সালে জলপাইগুড়িতে বিয়ে করেন। জল্পাইগুড়ির নয়াবস্তি এলাকায় ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বসবাস করেন। ১৯৮৪ সালের ১৫ নভেম্বর ইন্তেকাল করেন। মা বেগম তৈয়বা মজুমদার ছিলেন একান্ত ভাবে একজন গৃহিনী।

বিএনপি জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার স্কুলজীবন শুরু হয় পাঁচ বছর বয়সে দিনাজপুরের মিশন স্কুলে। এরপর দিনাজপুর গার্লস স্কুলে ভর্তি হন। পরবর্তীতে পড়াশুনা করেন সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। ১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সাথে তার বিয়ে হয়। জিয়াউর রহমানের ডাক নাম কমল। জিয়া তখন ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। ডি এফ আই এর অফিসার হিসাবে তখন দিনাজপুরে কর্মরত ছিলেন।

১৯৬৫ সালে খালেদা জিয়া স্বামীর সাথে পশ্চিম পাকিস্তানে (বর্তমানে পাকিস্তান)যান। ১৯৬৯ সালের মার্চ পর্যন্ত করাচিতে স্বামীর সাথে ছিলেন। এরপর ঢাকায় চলে আসেন। কিছুদিন জয়দেবপুর থাকার পর চট্টগ্রামে স্বামীর পোস্টিং হলে তার সঙ্গে সেখানে এবং চট্টগ্রামের ষোলশহর একালায় বসবাস করেন।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে খালেদা জিয়া কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকার পর ১৬ মে নৌপথে ঢাকায় চলে আসেন। বড় বোন খুরশিদ জাহানের বাসায় ১৭ জুন পর্যন্ত থাকেন। ২ জুলাই সিদ্ধেশরীতে  এস আব্দুল্লাহর বাসা থেকে পাক সেনারা তাকে দুই ছেলে সহ বন্দী করে। ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি মুক্তি পান। রাজনীতিতে আসার আগ পর্যন্ত বেগম জিয়া একজন সাধারণ গৃহবধু ছিলেন।  জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীনও রাজনীতিতে বেগম জিয়ার উপস্থিতি ছিল না।

 

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কূটনীতির মাধ্যমে ইসরাইল যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য হয়েছে: ইরানের প্রেসিডেন্ট

ঢাকামুখী শোকযাত্রা, জনশ্রদ্ধায় সিক্ত আপসহীনা

আপডেট সময় : ০৪:৪১:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

বিজয়ের মাসের শেষলগ্নে ‘মা, মাটি ও মানুষের নেত্রী’ হিসেবে খ্যাত খালেদা জিয়ার মৃত্যুশোকে  আচ্ছন্ন সারা দেশ। শোকের বিবৃতি পাঠিয়েছে জাতিসংঘ। পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়কেরা জানাচ্ছেন সমবেদনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবরে কান্না চলছে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে। শোকের সঙ্গে চলছে তার রাজনৈতিক জীবনের অবিচলতা নিয়ে নানামুখী স্মরণ।

১৯৪৫ সালে ভারতবর্ষের নয়াবস্তিতে জন্ম নেওয়া শান্তি নামের মেয়েটিই হয়ে উঠেছিলেন কোটি বাংলাদেশির জনপ্রিয় নেত্রী। ৪৩ বছরের সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সময় গ্রেফতার, আটকের শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক কারণে অবিচল সিদ্ধান্তের কারণে সচেতন মহলে তিনি আপোসহীন খ্যাতি পেয়েছেন।

৭৯ বছরের এই দীর্ঘযাত্রা কখনোই সংগ্রামের বাইরে থাকেননি খালেদা জিয়া। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সময় সেনাহেফাজতে থাকার পর থেকে স্বৈরাচার এরশাদ গৃহবন্দি, গ্রেফতার করলেও অনমনীয় থাকেন তিনি। অংশ নেননি পাতানো নির্বাচনগুলোতেও। এরশাদের অধীনে ১৯৮৬, ৮৮ এবং শেখ হাসিনার অধীনে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি।

খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশে স্মরণ করা হয় নব্বই দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সারাদেশে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য। তিনি সেই আন্দোলনে টানা আট বছর নেতৃত্ব দেন, জোটগতভাবেও নেতৃত্ব রাখেন। ওই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন প্রবীণ রাজনীতিক সাইফুল হক।

বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে সাইফুল হকের ভাষ্য, ‘বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা সাধারণ গৃহবধূ থেকে একটি ক্রান্তিক্লালে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে এসেছেন। ১৯৮৪-৮৬ সালে তার নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট সক্রিয় ছিলো। তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা। কোনও অন্যায়ের কাছে আপস করেননি।’

‘এরশাদের অধীনে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিলো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দল ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৮ দলের। কিন্তু কয়েকটি দলকে নিয়ে শেখ হাসিনা ঠিকই নির্বাচনে চলে যান। পরবর্তীকালে ৮৮ সালের নির্বাচনেও যাননি খালেদা জিয়া। তখন এরশাদের অধীনে নির্বাচনে গিয়ে প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা হন আ. স. ম আব্দুর রব। মূলত আপসহীন ও দৃঢ মনোভাবের কারণেই ৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তার দল বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় লাভ করে।’

খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালের একটি স্মরণ করে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘১৯৯১ সালে তৎকালীন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননসহ আমরা তার দফতরে গিয়েছিলাম। তিনি আমাদের কুশল জিজ্ঞেস করেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় আমাদের পরামর্শ ও সহযোগিতা চেয়েছিলেন। তার মধ্যে তখন কোনও দাম্ভিকতা দেখিনি।’

সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর গ্রন্থ হার লাইফ হার স্টোরি বিএনপিনেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, ওই সময় রাষ্ট্রপতি এরশাদ চেয়েছিলেন খালেদা জিয়াকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করতে। ওই প্রস্তাব তিনি মওদুদ আহমদ ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। যদিও খালেদা জিয়া ওই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। তিনি মনে করতেন, এরশাদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করিয়েছেন।

খালেদা জিয়া, ছবি: খালেদ হোসেন পরাগখালেদা জিয়া, ছবি: খালেদ হোসেন পরাগ কেন অসম্ভব জনপ্রিয় খালেদা জিয়া

এরশাদের সামরিক শাসনের সময় খালেদা জিয়ার অভিষেক হয়েছিল। তখন একজন গৃহবধূ থেকে রাজনীতির উত্তপ্ত ময়দানে তার বিচরণ শুরু হয়।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার ভাষ্য, ‘যখন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অত্যাচারে বড় বড় রাজনীতিবিদরা খাবি খাচ্ছিলেন, সে পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া নতুন জাগরণ সৃষ্টি করেছেন। তিনি কোনও আপস করেননি। তাই সাধারণ মানুষের কাছে তার এক ধরনের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে।’

‘এর কারণে ৯১ সালের নির্বাচনে তার দল অসাধারণ ফলাফল অর্জন করে। যেখানে তখন বিশ্লেষকরা ধরেই নিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসছে। সেই থেকে তার প্রতি মানুষের গ্রহণযোগ্যতা অব্যাহত থাকে। বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দলকে প্রায় চার দশক ধরে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তিনি।’

মাহমুদুর রহমান মান্না উল্লেখ করেন, ‘আর ৯০-এ এরশাদের পতনের পর ৯১ সালে খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো সরকার প্রধান হিসেবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসেন। একটি দল ক্ষমতায় থাকলে নানা কারণে সরকার প্রধানকে নানা বিতর্কে পরতে হয়। সেই অর্থে খালেদা জিয়া ছিলেন স্বচ্ছ। ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি। তিনি কোনও দুর্নীতির সাথেও জড়িত ছিলেন না। তাই এখনও অসম্ভব জনপ্রিয়।’

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট সংক্রান্ত দুদকের একটি মামলায় সাজা হয় খালেদা জিয়ার। সেদিনই তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন বিশেষ আদালত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর রাষ্ট্রপতির আদেশে তিনি মুক্তি পান।

রাজনীতিক ও চিন্তক ফিরোজ আহমেদ লিখেছেন, ‘একানব্বই সালে তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হন, সকলেই বিস্মিত হয়েছিলেন। কিন্তু ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল দলটির উগ্র অহমিকা, খালেদা জিয়াকে জিতিয়ে দিয়েছিল তার একদিকে আপোষহীন, আরেকদিকে নম্র ভাবমূর্তি।’

‘নারীদের জন্য শিক্ষা বৃত্তি তার সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ।  আজও এর ফল ভোগ করছে গোটা সমাজ।

রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে বহু  নিপীড়নের শিকার তিনি হয়েছেন।’ বলেন ফিরোজ আহমেদ।

খালেদা জিয়া যখন মারা যান, তার প্রতিক্রিয়ায় তার আজন্ম-বিরোধী রাজনৈতিক নেতা শেখ হাসিনাও শোক প্রকাশ করেছেন। সমবেদনা জানিয়েছেন পুত্র তারেক রহমানের প্রতি।

বিএনপির পক্ষ থেকে বরাবরই শেখ হাসিনার সরকারকেই খালেদা জিয়ার অসুস্থতার জন্য দায়ী করা হচ্ছে। অন্তবর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এক ব্রিফিয়ে শেখ হাসিনাকেও দায়ী করেন।

মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোরে খালেদা জিয়ার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে রাজনৈতিক মহলসহ সর্বমহলে শোক উঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ভরে উঠে শোকের বার্তায়। দেশি, বিদেশি আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বরা দিয়েছেন শোক বিবৃতি। গণমাধ্যমে নেওয়া হয়েছে বিশেষ আয়োজন। দৈনিক পত্রিকাগুলো বিশেষ কভার করার খবরও মিলেছে এই প্রতিবেদন লেখার সময়।

মৃত্যুর খবরে সারা দেশ থেকে অনুসারীদের ঢাকামুখী হওয়ার বার্তাও পাওয়া গেছে। আগামীকাল বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) দুপুরে জানাজার পর তাকে চন্দ্রিমা উদ্যানে স্বামী জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে দাফন করা হতে পারে।

জনপ্রিয়তার বিচারে দেশের সংসদীয় নির্বাচন একটি উদাহরণ। ১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনটি সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রতিবারই পাঁচটি আসনে প্রার্থী হয়েছেন এবং সবগুলো আসনে তিনি জয়লাভ করেছেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি বিতর্কিত একতরফা নির্বাচনেও খালেদা জিয়া প্রার্থী ছিলেন। এরপর ২০০৮ সালে খালেদা জিয়া তিনটি আসনে প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করে তিনটিতে জয়ী হন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে খারাপ ফলাফল করেছিল বিএনপি। সে নির্বাচনে মাত্র ৩০টি আসন পেলেও খালেদা জিয়া নির্বাচনে জয়লাভ করতে কোন অসুবিধা হয়নি। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও খালেদা জিয়া তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। আদালতের নির্দেশে তার মনোনয়ন বাতিল হয়েছিলো। সর্বশেষ আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য তিনটি আসন থেকে স্থায়ী কমিটির মনোনয়ন পেয়েছিলেন খালেদা জিয়া।

খালেদা জিয়া,  ছবি: গ্যেটে ইমেজখালেদা জিয়া,  ছবি: গ্যেটে ইমেজ

রাজনীতির ৪৩ বছর

স্বামী জিয়াউর রহমানের বধূ হিসেবেই জীবনের অর্ধেক সময় কাটিয়েছেন খালেদা জিয়া। রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে ৩০ এপ্রিল চট্টগ্রামে সার্কিট হাউজে কিছু সেনা সদস্যের গুলিতে নিহত হওয়ার পর বিএনপিতে যোগ দেন খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালে ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন তিনি।

খালেদা জিয়ার একটি বর্ণাঢ্য জীবনী রচনা করেছেন প্রয়াত সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ। তিনি হার লাইফ হার স্টোরি শীর্ষক গ্রন্থে জানাচ্ছেন, খালেদা জিয়া দলে সক্রিয় হন জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরই। দলের নেতাদের সঙ্গে মিটিং, জরুরি আলাপ এসবে যুক্ত হতেন কিন্তু দৃশ্যমান হতেন না।

১৯৮১ সালের জুনে বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি সাক্ষাৎকারে আসেন খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি সাত্তার তাকে আমন্ত্রণ জানালে সেটিই হয় প্রথম বড়ভাবে জনপ্রকাশ্যে আসা। 

দলের ভাইস চেয়ারম্যান, ওই সময়ের ছাত্রনেতা  শামসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউন-কে বলেন, ১৯৮২ সালে বিএনপির সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেন এরশাদ। সেই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির হাল ধরেছিলেন বেগম খালেদা জিয়ার মতো উদীয়মান নেত্রী।

১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি প্রথম বক্তৃতা রাখেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন তিনি।

১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়াপারসন নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া। সেই থেকে মৃত্যু অবধি তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আশির দশকের শুরু থেকে তিনি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্ব দেন।

শামসুজ্জামান দুদু উল্লেখ করেন, ‘সেই থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রধান নিয়ামক শক্তি ছিলেন তিনি। কোনও বিষয়ে স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুকে ভয় করেননি। সেই থেকে দেশের মানুষের অন্তরে স্থান করে নেন। যার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে ১৯৯১ সালের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে।’

‘সে সময় আওয়ামী লীগের একটি অংশ ধরেই নিয়েছিলে, তারা সরকার গঠন করবে। এমনকি শেখ হাসিনাকে প্রধান করে তারা মন্ত্রিসভা গঠনেরও ছক কষেছিলেন। কিন্তু দেশের মানুষ তাদের সে পরিকল্পনা ভণ্ডল করে বেগম খালেদা জিয়াকেই নির্বাচিত করেছিলেন।’ বলেন দুদু।

তিন প্রশ্নে বিতর্কে খালেদা জিয়া

নিজের জন্মদিন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী জামায়াতে ইসলামীকে সরকারে নেওয়া এবং প্রতিবেশি ভারত প্রশ্নে রাজনৈতিক জীবনে বিতর্কে পড়েছেন খালেদা জিয়া।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, নব্বইয়ের শুরুতে কয়েকজন নেতার আগ্রহে ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালনের উৎসাহ শুরু হয়। স্বাধীনতার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপরিবার নিহতের দিনটিতে জন্মদিন পালন নিয়ে নানা বিতর্ক ছড়ায়। যদিও ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান খালেদা জিয়া। ওই আহ্বানের আগে থেকে ২০১৬ সালেই ১৫ আগস্টের প্রথম প্রহরে কেক কাটা থেকে বিরত থাকেন খালেদা জিয়া।

ওই সময় প্রয়াত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ বিশিষ্টজনদের একান্ত অনুরোধে সাড়া দেন খালেদা জিয়া। ওই বছরেই একটি সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সকল নেতাদের সম্মান করার আহ্বান জানান তিনি।

রাজনৈতিক মহলে ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ না করার ঘটনাটিকে পররাষ্ট্রনৈতিক জায়গা থেকে বেগম জিয়ার সমালোচনার সুযোগ রয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা এসেছে।

পরে ২০১৫ সালে ভারতের দ্য সানডে গার্ডিয়ান পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়া জানিয়েছিলেন, জীবনের প্রতি হুমকি থাকায় ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাননি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

রাজনৈতিক সমালোচনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলো, একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামের বিরোধী জামায়াতের সঙ্গে ১৯৯৯ সালে জোট ও ২০০১ সালে সরকার গঠন। স্বাধীনতা বিরোধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের প্রসঙ্গ এনে সমালোচনা হয়েছে বিএনপিপ্রধানের।

ওয়ান-ইলেভেনের মঈন উদ্দীন ও ফখরুদ্দীন সরকারের সময় দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালে নিম্ন আদালতে পাঁচ বছরের সাজা হলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। বিশেষ ব্যবস্থায় পুরোনো ঢাকার পরিত্যক্ত কারাগারে তাকে রাখা হয়। এরপর ওই বছরের ১ এপ্রিল তাকে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। পরবর্তী সময়ে নিম্ন আদালতের সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করেন হাইকোর্ট।

খালেদা জিয়া ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এরমধ্যে দ্বিতীয়দফার দায়িত্বকাল ছিল একমাস। বিএনপির চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে খালেদা জিয়া, তার দল বিএনপিও বিজয়ী হয়। ওই বছরই বেগম জিয়া পঞ্চম সংসদে প্রধানমন্ত্রী হন। তার নেতৃত্বেই সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারপদ্ধতি থেকে সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন হয়। এরপর ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর এক মাসের জন্য ষষ্ঠ সংসদের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রণয়নের পর ওই বছরে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেরে যায় খালেদা জিয়ার দল বিএনপি; তিনি হন বিরোধীদলীয় নেতা।

১৯৯৯ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত গোলাম আজমের নেতৃত্বাধীন জামায়াতে ইসলামী ও শায়খল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটের সমন্বয়ে গঠিত চারদলীয় ঐক্যজোটের ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ২০০১ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া। জোটে চারদল থাকলেও সরকারগঠনে বিএনপির সঙ্গে শুধু একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াতকে সঙ্গে নেন তিনি।

২০০৮ সালের নির্বাচনের পর ফের বিরোধীদলীয় নেতা হন খালেদা জিয়া। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেন তিনি। একইসঙ্গে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই সে বছর নির্বাচন থেকে বিরত থাকে। ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় খালেদা জিয়া যখন কারাগারে, তখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের মধ্যে সমন্বয় করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপি। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে থাকায় সেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি খালেদা জিয়া। এমনকি, এই নির্বাচনে জিয়া পরিবারের কোনও সদস্যই অংশগ্রহণ করেননি।

 খালেদা জিয়া, ছবি: সালমান তারেক শাকিল খালেদা জিয়া, ছবি: সালমান তারেক শাকিল ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকে অসুস্থতা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। বন্দি থাকা অবস্থায় তিনি দীর্ঘদিন তৎকালীণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষ মুক্তি পেয়ে বাসায় ফেরেন যান খালেদা জিয়া।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে একবার, ২০১৮ সাল একবারসহ এরপর থেকে প্রতিবছরই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে খালেদা জিয়াকে।

প্রায় দুই বছর কারাবন্দি থাকার পর ২০২০ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময় পারিবারিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ছয় মাসের জন্য শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি পান খালেদা জিয়া।

এর আগে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে ওই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর কারারুদ্ধ হন তিনি। পরে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান খালেদা জিয়া।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যাওয়ার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ১৪টি ঈদ কেটেছে একটি রুমের ভেতরে অবস্থান করেই। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৭ জুন ঈদুল আজহার দিনটিও ব্যতিক্রম ছিল না। গুলশান-২-এর বাসা ‘ফিরোজা’তেই নিজের কক্ষে কাটান ঈদের সময়।

প্রসঙ্গত, এক-এগারোর মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকারের সময় সংসদ ভবন এলাকায় সাবজেলে বন্দি থাকাকালে দুটি ঈদ কাটিয়েছেন খালেদা জিয়া।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে কারাগারে যাওয়ার আগে ৭ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া নিজে শেষ সংবাদ সম্মেলন করেন। মাসের শুরুতেই তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটি, বিলুপ্ত ২০ দলীয় জোটেরও সভাও করেন। ওই সময়েই তিনি তার স্বামী, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত করেন।

শায়রুল কবির খান উল্লেখ করেন, বেগম জিয়া সর্বশেষ সমাবেশ করেন ২০১৭ সালে। সর্বশেষ ইফতার ও ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন ২০১৬ সালে।

রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া ২০২৪ সালে এবং ও এ বছর স্বশস্ত্র বাহিনী দিবসে অংশগ্রহণ করেন। উভয় অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও আলোচনা করেন।

শায়রুল কবির খান জানান, ১৩ নভেম্বর ২০১০ বেগম জিয়া তার ২৮ বছরের আবাসস্থল ছেড়ে যান। তিনি অভিযোগ করেন তাকে বলপ্রয়োগে বাসা থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। তবে সরকারি পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তিনি স্বেচ্ছায় বাসা ত্যাগ করেছেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হিসেবে জিয়াউর রহমানের সাথে শহীদ মইনুল সড়কের ৬ নম্বর বাড়িতে ওঠেন খালেদা জিয়া। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়া চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যূত্থানে নিহত হলে ১২ জুন তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার সেনানিবাসের ওই বাড়িটি খালেদার নামে বরাদ্দ দেন।

শায়রুল কবির খান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় চির অম্লান আপোষহীন নেত্রী খালেদা জিয়া। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম ও একদলীয় শাসন বাকশাল থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুণঃপ্রবর্তনে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ এর ভিত্তিতে জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠিত করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার সহধর্মিণী খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনঃউদ্ধারে দীর্ঘ সংগ্রামে বিজয়গাঁথার প্রতিক একমাত্র আপোষহীন নেত্রী। তাদের দেখানো পথ ধরে রক্তের ও রাজনৈতিক দর্শনের উত্তরাধিকার বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান  ‘৩১ দফা’র ভিত্তিতে আগামীর কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তুলবেন বলে আশা করি।’

সংসারে, পরিবারে খালেদা জিয়া

বেগম খালেদা জিয়ার প্রকৃত নাম খালেদা খানম, ডাক নাম পুতুল। আগস্ট ১৫, ১৯৪৬ সালে জলপাইগুড়িতে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তিন বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ভাইয়েরা সবার ছোট। তাঁর পিতামহ হাজী সালামত আলী, মাতামহ জলপাইগুড়ির তোয়াবুর রহমান। বাবা জনাব ইস্কান্দর মজুমদার এবং মা বেগম তৈয়বা মজুমদার।

খালেদা জিয়ার স্বামী স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তি যুদ্ধে প্রথম ব্রিগেড জেড ফোর্স-এর কমান্ডার ও সেক্টর কমান্ডার হিসেবে রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান,সাবেক ভিশনারি রাষ্ট্র নায়ক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তম।

তার এক ভাই মেজর (অব.) সাইদ ইস্কান্দার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে ফেনী-১ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। তার দুই ছেলের মধ্যে বড় তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তার কনিষ্ঠ ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি মালায়া হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান।

দিনাজপুর শহরের মুদিপাড়া। আদি পিতৃ-ভিটা ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের মজুমদার বাড়ী তার নিবাস। বাবা জনাব ইস্কান্দর মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। ইস্কান্দর মজুমদার ১৯১৯ সালে ফেনী থেকে জলপাইগুড়ি যান। বোনের বাসায় থেকে মেট্রিক পাস করেন ও পরে চা ব্যবসায়ে জড়িত হন। ১৯৩৭ সালে জলপাইগুড়িতে বিয়ে করেন। জল্পাইগুড়ির নয়াবস্তি এলাকায় ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বসবাস করেন। ১৯৮৪ সালের ১৫ নভেম্বর ইন্তেকাল করেন। মা বেগম তৈয়বা মজুমদার ছিলেন একান্ত ভাবে একজন গৃহিনী।

বিএনপি জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার স্কুলজীবন শুরু হয় পাঁচ বছর বয়সে দিনাজপুরের মিশন স্কুলে। এরপর দিনাজপুর গার্লস স্কুলে ভর্তি হন। পরবর্তীতে পড়াশুনা করেন সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। ১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সাথে তার বিয়ে হয়। জিয়াউর রহমানের ডাক নাম কমল। জিয়া তখন ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। ডি এফ আই এর অফিসার হিসাবে তখন দিনাজপুরে কর্মরত ছিলেন।

১৯৬৫ সালে খালেদা জিয়া স্বামীর সাথে পশ্চিম পাকিস্তানে (বর্তমানে পাকিস্তান)যান। ১৯৬৯ সালের মার্চ পর্যন্ত করাচিতে স্বামীর সাথে ছিলেন। এরপর ঢাকায় চলে আসেন। কিছুদিন জয়দেবপুর থাকার পর চট্টগ্রামে স্বামীর পোস্টিং হলে তার সঙ্গে সেখানে এবং চট্টগ্রামের ষোলশহর একালায় বসবাস করেন।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে খালেদা জিয়া কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকার পর ১৬ মে নৌপথে ঢাকায় চলে আসেন। বড় বোন খুরশিদ জাহানের বাসায় ১৭ জুন পর্যন্ত থাকেন। ২ জুলাই সিদ্ধেশরীতে  এস আব্দুল্লাহর বাসা থেকে পাক সেনারা তাকে দুই ছেলে সহ বন্দী করে। ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি মুক্তি পান। রাজনীতিতে আসার আগ পর্যন্ত বেগম জিয়া একজন সাধারণ গৃহবধু ছিলেন।  জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীনও রাজনীতিতে বেগম জিয়ার উপস্থিতি ছিল না।