ইসলাম ধর্মে জুমার নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম এবং এটি প্রাপ্তবয়স্ক ও মানসিক-শারীরিকভাবে সক্ষম প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ বা বাধ্যতামূলক ইবাদত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআন এবং হাদিসে জুমার মর্যাদা এবং এই দিনের নামাজের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার আবশ্যকতা অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা সুরা জুমার নবম আয়াতে বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে, জুমার আজান শোনা মাত্রই দ্রুত আল্লাহর স্মরণে ছুটে যেতে হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ধরনের পার্থিব ব্যস্ততা সাময়িকভাবে পরিত্যাগ করতে হবে।
এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো মুসলমানদের মধ্যে সম্মিলিত ইবাদত, উপদেশ গ্রহণ এবং সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার একটি পরিবেশ তৈরি করা। হাদিসেও নবী করিম (সা.) জুমার নামাজে অবহেলা করার পরিণতি সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে লাগাতার তিনটি জুমা ত্যাগ করবে, আল্লাহ তার হৃদয়ে মোহর এঁটে দেন। এটি জুমার নামাজের প্রতি গভীর গুরুত্ব এবং তা অবহেলা না করার শিক্ষা প্রদান করে।
তবে বাস্তবতা সবসময় একরকম থাকে না। অনেক সময় মানুষের ব্যক্তিগত, শারীরিক বা পরিস্থিতিগত বিভিন্ন সমস্যার কারণে জুমার জামাতে উপস্থিত হওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। এই ধরনের পরিস্থিতিতে শরিয়ত অত্যন্ত বাস্তবমুখী বিধান প্রদান করেছে—যেখানে মানুষের কষ্ট, দুর্বলতা বা অক্ষমতা বিবেচনা করে বৈধ অজুহাতকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
ইমাম মালিক (রহ.) জুমা নামাজে উপস্থিত না হওয়ার জন্য কিছু যুক্তিসঙ্গত কারণ উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে গুরুতর অসুস্থতা, শরীরের চরম দুর্বলতা, প্রবল বৃষ্টির কারণে রাস্তা কাদা হয়ে যাওয়া, জীবননাশের সম্ভাবনা, কারাবন্দি অবস্থা, কিংবা এমন রোগীর সেবা করা যার সেবা ছাড়া সে বিপদের সম্মুখীন হতে পারে।
এই ধরনের অনিবার্য পরিস্থিতিতে শরিয়ত নির্দেশ দেয় যে, জুমা নামাজ না পড়ে ব্যক্তি চার রাকাত যোহর নামাজ আদায় করবে, যা তার ফরজ আদায়ের বিকল্প হিসেবে গণ্য হবে। এর কারণ হলো, আল্লাহ ঘোষণা করেছেন—তিনি দ্বীনে কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি এবং কোনো মানুষকে তার সাধ্যের বাইরে কোনো দায়িত্বও দেন না।
তবে এই ধরনের ছাড় কেবল বিশেষ ও অনিবার্য পরিস্থিতির জন্য প্রযোজ্য, এটি সাধারণ বা অজুহাতস্বরূপ ব্যস্ততার জন্য নয়। শুধু কাজের চাপ, সামান্য বৃষ্টি, অলসতা, দূরত্বের অজুহাত, কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য জুমা এড়িয়ে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা অবশ্যই গুনাহ হিসেবে গণ্য হয়। জুমা কেবল একটি ফরজ ইবাদতই নয়—বরং এটি মুসলিম সমাজের ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। মসজিদে ইমামের খুতবা মানুষকে নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও ঈমানি চেতনায় উজ্জীবিত করে থাকে। তাই জুমার নামাজ কেবল একটি নিয়মিত প্রথা নয়, বরং একজন মুসলমানের সাপ্তাহিক আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণের ক্ষেত্র।
সর্বশেষ কথা হলো, ইসলাম কঠোরতার ধর্ম নয়, বরং সহজতা ও ভারসাম্যের ধর্ম। তাই বিশেষ ও অনিবার্য পরিস্থিতিতে জুমার নামাজে অংশগ্রহণ করতে না পারলে শরিয়ত-স্বীকৃত বিকল্প হিসেবে চার রাকাত যোহর আদায় করলেই বিধান পূর্ণ হয়। তবে কোনো অবস্থাতেই জুমার নামাজকে হালকাভাবে নেওয়া যায় না। যথাযথ কারণ ছাড়া জুমা ত্যাগ করা নিষিদ্ধ এবং আধ্যাত্মিক ক্ষতির কারণ। প্রত্যেক মুসলমানের উচিত জুমার মর্যাদা, গুরুত্ব ও বরকত সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং যথাসম্ভব জামাতে উপস্থিত হয়ে এই ফরজ ইবাদতটি আদায় করা।
রিপোর্টারের নাম 

























