ঢাকা ০১:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে জাকাত

## শিরোনাম: জাকাত: সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির এক শক্তিশালী হাতিয়ার

লিড প্যারাগ্রাফ:

আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের অন্যতম অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, যা সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করে। যদিও এর ধারণা অতি প্রাচীন, তবে বর্তমানে এটি সুসংগঠিত না হলেও দানশীলতা, মানবতাবোধ এবং ধর্মীয় অনুপ্রেরণায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রাচীন মিসর, গ্রিস, রোম, চীন ও ভারতসহ বিভিন্ন সভ্যতায় এর নজির পাওয়া যায়। বিশ্বমানবতার শ্রেষ্ঠ দূত হজরত মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক ৬২২ সালে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন, সাম্য ও ন্যায়বিচারভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র এবং খোলাফায়ে রাশেদিনের সুসংগঠিত সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা আজও মানবকল্যাণে এক আলোকবর্তিকা।

বিস্তারিত বর্ণনা:

ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বিশ্ব মানবতার জন্য এক বিরাট অভিশাপ। এই বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে ইসলাম কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক, মানবিক ও সামাজিক সাহায্যের বিধান রেখেছে। সম্পদ যেন কেবল বিত্তবানদের হাতেই কুক্ষিগত না থাকে, সে জন্য দরিদ্রদের একটি নির্দিষ্ট অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সুখী, সুন্দর ও উন্নত সমাজ গঠনে ধনাঢ্য মুসলমানদের ‘নিসাব’ পরিমাণ সম্পদের একটি অংশ দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের দুর্দশা মোচনে ব্যয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কেবল অসহায় মানবতার কল্যাণই হবে না, বরং সমাজে আয়বণ্টনের বৈষম্যও হ্রাস পাবে। বস্তুত, সমাজে ধনসম্পদের আবর্তন ও বিস্তার সাধন এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের মহান উদ্দেশ্যেই জাকাত ব্যবস্থার প্রবর্তন। পবিত্র কোরআনে এই নীতি ঘোষিত হয়েছে: “যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান, কেবল তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে।”

ইসলামি বিধান অনুসারে, ধনী ব্যক্তিরা তাদের সম্পদের ৪০ ভাগের এক অংশ (এক দশমাংশ) অসহায়-দরিদ্রদের মধ্যে জাকাত বিতরণ করলে গরিবেরা দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কশাঘাত থেকে মুক্তি পায়। এর মাধ্যমে সমাজের ঋণগ্রস্ত, দুঃখী, অনাথ, বিধবা, বৃদ্ধ, রুগ্ন ও অক্ষম ব্যক্তিরা তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে। জাকাতের অর্থ অভাবী মানুষের হাতে কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বণ্টিত হয়ে তাদের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক হয়। ধনীরা যদি সঠিকভাবে জাকাত আদায় করেন, তবে সমাজে অন্নহীন, বস্ত্রহীন, আশ্রয়হীন বা শিক্ষাহীন দরিদ্র মানুষের অস্তিত্ব থাকার কথা নয়। জাকাতের সুষ্ঠু উশুল (সংগ্রহ) এবং সুষম বণ্টনের মাধ্যমেই সমাজের দারিদ্র্য দূরীকরণ সম্ভব। পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছে, “তাদের ধনসম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতের হক।”

জাকাত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বণ্টনব্যবস্থা। ইসলামি শরিয়তে তাই এটি অন্যান্য ইবাদতের উপর অগ্রাধিকার পেয়েছে। জাকাত হতদরিদ্র, অভাবী ও অক্ষম জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়। পবিত্র কোরআনে সালাত বা নামাজ কায়েমের নির্দেশের পরপরই প্রায় সব ক্ষেত্রে জাকাত আদায়ের কথা এসেছে। পবিত্র কোরআনের ১৬টি স্থানে এটি ‘সাদাকাহ’ শব্দে ব্যবহৃত হয়েছে। ভূমির উৎপাদিত ফল-ফসলের জাকাতকে ‘উশর’ বলা হয়। গচ্ছিত অর্থ, স্বর্ণ-রুপা, ব্যবসায়িক পণ্য, গৃহপালিত পশু, খনিজ সম্পদ এবং জমিতে উৎপাদিত ফসলের উপর জাকাত আদায় বাধ্যতামূলক। এর ধর্মীয়, নৈতিক ও নানাবিধ ইতিবাচক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্যও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনের ৩২টি স্থানে সরাসরি জাকাত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হজরত আবু বকর (রা.) জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের জাকাত প্রদানে বাধ্য করেছিলেন।

জাকাতের মূল উদ্দেশ্য হলো, জাকাত গ্রহীতাকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা এবং তাকে দাতার পর্যায়ে উন্নীত করা। কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতিতে জাকাত দানের ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে না, বরং তারা ভিক্ষুকে পরিণত হচ্ছে। জাকাতপ্রার্থীরা দ্বারে দ্বারে ঘুরে জাকাতের কাপড় বা অর্থ সংগ্রহ করছে, যা ধীরে ধীরে ভিক্ষার অভ্যাস তৈরি করছে। তাছাড়া, জাকাত যে সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়, তার সুফলও পাওয়া যাচ্ছে না। যদি সরকারি উদ্যোগে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এবং বাধ্যবাধকতার সঙ্গে জাকাত সংগ্রহ এবং একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা অনুযায়ী তা বণ্টন করা হতো, তবে দেশের দারিদ্র্য অনেকাংশে হ্রাস পেত।

লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সতর্কতা মার্কিন দূতাবাসের

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে জাকাত

আপডেট সময় : ০৯:৩৭:৩৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

## শিরোনাম: জাকাত: সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির এক শক্তিশালী হাতিয়ার

লিড প্যারাগ্রাফ:

আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের অন্যতম অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, যা সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করে। যদিও এর ধারণা অতি প্রাচীন, তবে বর্তমানে এটি সুসংগঠিত না হলেও দানশীলতা, মানবতাবোধ এবং ধর্মীয় অনুপ্রেরণায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রাচীন মিসর, গ্রিস, রোম, চীন ও ভারতসহ বিভিন্ন সভ্যতায় এর নজির পাওয়া যায়। বিশ্বমানবতার শ্রেষ্ঠ দূত হজরত মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক ৬২২ সালে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন, সাম্য ও ন্যায়বিচারভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র এবং খোলাফায়ে রাশেদিনের সুসংগঠিত সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা আজও মানবকল্যাণে এক আলোকবর্তিকা।

বিস্তারিত বর্ণনা:

ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বিশ্ব মানবতার জন্য এক বিরাট অভিশাপ। এই বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে ইসলাম কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক, মানবিক ও সামাজিক সাহায্যের বিধান রেখেছে। সম্পদ যেন কেবল বিত্তবানদের হাতেই কুক্ষিগত না থাকে, সে জন্য দরিদ্রদের একটি নির্দিষ্ট অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সুখী, সুন্দর ও উন্নত সমাজ গঠনে ধনাঢ্য মুসলমানদের ‘নিসাব’ পরিমাণ সম্পদের একটি অংশ দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের দুর্দশা মোচনে ব্যয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কেবল অসহায় মানবতার কল্যাণই হবে না, বরং সমাজে আয়বণ্টনের বৈষম্যও হ্রাস পাবে। বস্তুত, সমাজে ধনসম্পদের আবর্তন ও বিস্তার সাধন এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের মহান উদ্দেশ্যেই জাকাত ব্যবস্থার প্রবর্তন। পবিত্র কোরআনে এই নীতি ঘোষিত হয়েছে: “যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান, কেবল তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে।”

ইসলামি বিধান অনুসারে, ধনী ব্যক্তিরা তাদের সম্পদের ৪০ ভাগের এক অংশ (এক দশমাংশ) অসহায়-দরিদ্রদের মধ্যে জাকাত বিতরণ করলে গরিবেরা দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কশাঘাত থেকে মুক্তি পায়। এর মাধ্যমে সমাজের ঋণগ্রস্ত, দুঃখী, অনাথ, বিধবা, বৃদ্ধ, রুগ্ন ও অক্ষম ব্যক্তিরা তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে। জাকাতের অর্থ অভাবী মানুষের হাতে কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বণ্টিত হয়ে তাদের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক হয়। ধনীরা যদি সঠিকভাবে জাকাত আদায় করেন, তবে সমাজে অন্নহীন, বস্ত্রহীন, আশ্রয়হীন বা শিক্ষাহীন দরিদ্র মানুষের অস্তিত্ব থাকার কথা নয়। জাকাতের সুষ্ঠু উশুল (সংগ্রহ) এবং সুষম বণ্টনের মাধ্যমেই সমাজের দারিদ্র্য দূরীকরণ সম্ভব। পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছে, “তাদের ধনসম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতের হক।”

জাকাত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বণ্টনব্যবস্থা। ইসলামি শরিয়তে তাই এটি অন্যান্য ইবাদতের উপর অগ্রাধিকার পেয়েছে। জাকাত হতদরিদ্র, অভাবী ও অক্ষম জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়। পবিত্র কোরআনে সালাত বা নামাজ কায়েমের নির্দেশের পরপরই প্রায় সব ক্ষেত্রে জাকাত আদায়ের কথা এসেছে। পবিত্র কোরআনের ১৬টি স্থানে এটি ‘সাদাকাহ’ শব্দে ব্যবহৃত হয়েছে। ভূমির উৎপাদিত ফল-ফসলের জাকাতকে ‘উশর’ বলা হয়। গচ্ছিত অর্থ, স্বর্ণ-রুপা, ব্যবসায়িক পণ্য, গৃহপালিত পশু, খনিজ সম্পদ এবং জমিতে উৎপাদিত ফসলের উপর জাকাত আদায় বাধ্যতামূলক। এর ধর্মীয়, নৈতিক ও নানাবিধ ইতিবাচক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্যও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনের ৩২টি স্থানে সরাসরি জাকাত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হজরত আবু বকর (রা.) জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের জাকাত প্রদানে বাধ্য করেছিলেন।

জাকাতের মূল উদ্দেশ্য হলো, জাকাত গ্রহীতাকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা এবং তাকে দাতার পর্যায়ে উন্নীত করা। কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতিতে জাকাত দানের ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে না, বরং তারা ভিক্ষুকে পরিণত হচ্ছে। জাকাতপ্রার্থীরা দ্বারে দ্বারে ঘুরে জাকাতের কাপড় বা অর্থ সংগ্রহ করছে, যা ধীরে ধীরে ভিক্ষার অভ্যাস তৈরি করছে। তাছাড়া, জাকাত যে সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়, তার সুফলও পাওয়া যাচ্ছে না। যদি সরকারি উদ্যোগে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এবং বাধ্যবাধকতার সঙ্গে জাকাত সংগ্রহ এবং একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা অনুযায়ী তা বণ্টন করা হতো, তবে দেশের দারিদ্র্য অনেকাংশে হ্রাস পেত।

লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান