আজ পবিত্র রমজানের দশম তারাবিতে তিলাওয়াত করা হবে কুরআনের ত্রয়োদশ পারা। এ অংশে থাকছে সূরা ইউসুফের শেষাংশ (আয়াত ৫৩-১১১), সম্পূর্ণ সূরা রাদ এবং সম্পূর্ণ সূরা ইবরাহিম। নবীদের সংগ্রাম, মহান আল্লাহর একত্ববাদের অকাট্য প্রমাণ এবং মানবজাতির প্রতি চিরন্তন হেদায়েতের বার্তা নিয়ে এই সূরাগুলো মুমিনের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে, নবী ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের ‘সুন্দরতম ঘটনা’র সমাপ্তি ও এর শিক্ষাই আজকের তারাবির অন্যতম আকর্ষণ।
সূরা ইউসুফ (৫৩-১১১): ধৈর্যের পুরস্কার ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন
আজকের তিলাওয়াতে নবী ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের সেই অংশ উঠে আসবে, যেখানে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম ও ধৈর্যের ফলস্বরূপ তিনি ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করেন। বাদশার স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি শুধু কারাগার থেকেই মুক্তি পাননি, সবার সামনে নিজের নির্দোষিতাও প্রমাণ করেছিলেন। আজিজে মিশরের স্ত্রী অকপটে নিজের অপরাধ স্বীকার করে ইউসুফ (আ.)-এর পবিত্রতার সাক্ষ্য দেন। এরপর ইউসুফ (আ.) মিশরের অর্থবিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন। একসময় তাঁর ভাইয়েরা সাহায্যের জন্য মিশরে এলে ইউসুফ (আ.) নিজেকে তাদের সামনে প্রকাশ করেন। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর পিতা-মাতার সঙ্গে তাঁর মিলন হয় এবং শৈশবের দেখা স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়। সূরা ইউসুফ এই বার্তা দিয়ে শেষ হয়েছে যে, এসব মহামনীষীর ঘটনা জ্ঞানীদের জন্য অসংখ্য শিক্ষা ও উপদেশ বহন করে।
সূরা রাদ: তাওহিদের প্রমাণ ও জাতির উত্থান-পতনের সূত্র
মক্কায় অবতীর্ণ সূরা রা’দ তাওহিদ, রিসালাত ও কিয়ামত—এই তিনটি মৌলিক বিষয়ে আলোকপাত করে। সূরার শুরুতেই কোরআনের সত্যতা এবং মহান আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্ববাদের অকাট্য প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। আসমান-জমিন, চাঁদ-সূর্য, রাত-দিন, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, লতা-গুল্ম এবং বৈচিত্র্যময় ফলমূলের স্রষ্টা হিসেবে একমাত্র আল্লাহকেই চিহ্নিত করা হয়েছে। জীবন ও মরণের একচ্ছত্র মালিকানা এবং কল্যাণ-অকল্যাণের ক্ষমতা কেবল তাঁর হাতেই। এরপর কিয়ামতের পুনরুত্থান ও প্রতিদানের আলোচনা এসেছে। ফেরেশতাদের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখেন, সে প্রসঙ্গ আলোচনার পর একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি ঘোষণা করা হয়েছে: “আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” (১১)। এই আয়াতটি মুসলিম উম্মাহর জন্য সম্মান ও মর্যাদার পথ অবলম্বনের এক দিকনির্দেশনা। বাতিলকে ঢেউয়ের বুদবুদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যা ক্ষণস্থায়ী; আর হক বা সত্যকে খাঁটি সোনা-রুপার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যা সব বাধা পেরিয়ে টিকে থাকে এবং আগুনে বিশুদ্ধতা লাভ করে (১৭)। এই সূরায় মুত্তাকি ও বুদ্ধিমানদের আটটি গুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, আল্লাহর ভয়, ধৈর্যধারণ, সালাত কায়েম, প্রকাশ্যে ও গোপনে দান এবং মন্দের জবাবে উত্তম আচরণ অন্যতম। সূরাটি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তের সাক্ষ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।
সূরা ইবরাহিম: অন্ধকারের পথ থেকে আলোর পথে
মক্কায় অবতীর্ণ সূরা ইবরাহিমের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে অন্ধকারের পথ থেকে আলোর পথে নিয়ে আসা, যা সূরার শুরুতেই সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। তাওহিদ, রিসালাত ও আখেরাত—এই তিনটি মৌলিক বিষয়ই এখানে প্রাধান্য পেয়েছে। কাফেরদের নিন্দার পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায় তাদের নবীদের সাথে কেমন আচরণ করেছিল, তার কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহর অস্তিত্ব, মানব রাসুলের প্রয়োজনীয়তা, পূর্বপুরুষদের ধর্ম অনুসরণ এবং মোজেজা প্রদর্শনের দাবি—এই চারটি সাধারণ সন্দেহকে যৌক্তিক উপায়ে খণ্ডন করা হয়েছে। সত্যসন্ধানীদের জন্য সন্দেহের পথ পরিহার করে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা অপরিহার্য। কারণ আল্লাহ কৃতজ্ঞদের প্রতি তাঁর নেয়ামত বাড়িয়ে দেন, আর অকৃতজ্ঞদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। সূরার দ্বিতীয়, তৃতীয় ও শেষ রুকুতে কিয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্য এবং জাহান্নামের কঠিন আজাবের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। শয়তানের অনুসারীদের থেকে পলায়নের প্রসঙ্গ এবং হক-বাতিলের চমৎকার উপমা এখানে স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে, হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর সেই অবিস্মরণীয় দোয়াগুলো এই সূরার অন্যতম আকর্ষণ, যা তিনি বায়তুল্লাহ নির্মাণের পর মক্কাবাসী, নিজের সন্তানসন্ততি, ভবিষ্যৎ বংশধর এবং সমগ্র মানবজাতির নিরাপত্তা, রিজিকের ব্যবস্থা, সালাত কায়েম এবং মাগফিরাতের জন্য করেছিলেন। সূরার সূচনাপর্বের মতোই এর সমাপ্তিও পবিত্র কোরআনের মহিমা ও শিক্ষার আলোচনা দিয়ে হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 

























