ঢাকা ১১:২৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

রমজানের বরকতময় সাহরি: রোজার শক্তি ও আধ্যাত্মিকতার উৎস

রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য সংযম, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির এক পবিত্র মাস। এই মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো সাহরি। রাতের শেষ প্রহরে গ্রহণ করা এই খাবার কেবল শারীরিক শক্তি যোগায় না, বরং এর পেছনে রয়েছে মহান আল্লাহর বিশেষ বরকত ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহরিকে বরকতময় আখ্যা দিয়েছেন এবং এটিকে মুসলিমদের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবেও বিবেচিত করেছেন।

সাহরি আরবি শব্দ, যার অর্থ রাতের শেষ ভাগে খাওয়া খাবার। মহান আল্লাহ তাআলা রোজাদারদের জন্য সাহরি গ্রহণের বিধান দিয়েছেন, যাতে সারাদিনের রোজা রাখা সহজ হয় এবং ইবাদতের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি পাওয়া যায়। এটি কেবল একটি খাবার নয়, বরং একটি বরকতময় ইবাদত, যা রোজার সওয়াব বৃদ্ধি করে।

সাহরির সময়সীমা
সাহরির সময় নিয়ে ইসলামিক স্কলারদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য থাকলেও এর সমাপ্তির বিষয়ে সবাই একমত। আল্লামা যামাখশারী (রহ.)-এর মতে, রাতের শেষ ষষ্ঠাংশ হলো সাহরির সময়। মোল্লা আলী কারী (রহ.) বলেন, রাতের অর্ধাংশের পর থেকে সাহরির সময় শুরু হয়ে ফজরের পূর্ব পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকে। তবে সর্বসম্মতভাবে সুবহে সাদিক অর্থাৎ ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাহরির সময় শেষ হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “আর তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ রাতের কালো রেখা থেকে উষার সাদা রেখা তোমাদের কাছে স্পষ্ট না হয়। অতঃপর রাত আগমন পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো।” (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৭)। সুতরাং, সুবহে সাদিকের পর কোনো প্রকার পানাহার করলে রোজা ভেঙে যাবে।

সাহরির ফজিলত ও বরকত
সাহরির ফজিলত অপরিসীম। হযরত আনাস ইবন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা সাহরি খাও, কারণ সাহরিতে বরকত রয়েছে।” (বুখারি, মুসলিম)। এই বরকত শারীরিক ও আত্মিক উভয় প্রকারের হতে পারে। হযরত আমর ইবন আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, “আমাদের এবং কিতাবধারীদের (ইহুদি-খ্রিষ্টান) রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সাহরি খাওয়া।” (মুসলিম)। এর মাধ্যমে সাহরি মুসলিম উম্মাহর একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়াও, হযরত ইবন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেশতারা সাহরি গ্রহণকারীদের প্রতি রহমতের জন্য প্রার্থনা করেন।” (ইবন হিব্বান)। এই হাদিসগুলো সাহরির আধ্যাত্মিক গুরুত্ব তুলে ধরে।

সাহরিতে যা খাওয়া যায়
সাহরি বরকতময় খাবার হলেও এর জন্য বিশাল আয়োজনের প্রয়োজন নেই। অল্প খাবার বা এক ঢোক পানি পান করলেও সাহরির সুন্নত আদায় হয়ে যায়। (ইবন হিব্বান)। খেজুর দিয়ে সাহরি খাওয়াকে রাসূলুল্লাহ (সা.) মুমিনের উত্তম সাহরি বলে আখ্যায়িত করেছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মুমিনের উত্তম সাহরি হলো খেজুর।” (আবু দাউদ)। তাই হালকা ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা উচিত, যা সারাদিন রোজা রাখতে সাহায্য করবে।

শেষ সময়ে সাহরি খাওয়ার গুরুত্ব
সুন্নত হলো সাহরির শেষ সময়ের কাছাকাছি সময়ে সাহরি খাওয়া। রাসূলুল্লাহ (সা.) সবসময় দেরিতে সাহরি গ্রহণ করতেন। হযরত যায়দ ইবন সাবেত (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহরি ও ফজরের নামাজের মধ্যে ৫০ আয়াত পাঠ করার মতো সময়ের ব্যবধান থাকত। (বুখারি, মুসলিম)। ৫০ আয়াত তেলাওয়াত করতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে। দেরিতে সাহরি খেলে রোজা রাখতে অধিকতর সহজ হয় এবং ফজরের নামাজ আদায়ের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় না। ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার অনেক আগে সাহরি শেষ করে ফেলা সুন্নত নয়, বরং শেষ সময় পর্যন্ত বিলম্ব করাই উত্তম।

সাহরি ও ফজরের আজান
অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা আছে যে, ফজরের আজান শুরু হলে সাহরির সময় শেষ হয়। কিন্তু শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, সুবহে সাদিক শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাহরির সময় শেষ হয়ে যায়। আজান দেওয়া বা না দেওয়া এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে সাহরি ও তাহাজ্জুদের জন্য হযরত বেলাল (রা.) আজান দিতেন, যা ছিল মূলত ঘুম থেকে জাগানোর জন্য। এরপর ফজরের সময় হলে হযরত আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম (রা.) ফজরের আজান দিতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “বেলাল রাতে আজান দেয়। তোমরা খাও ও পান করো যতক্ষণ না ইবন উম্মে মাকতুমের আজান শুনতে পাও।” (বুখারি, মুসলিম)। এটি স্পষ্ট করে যে, সুবহে সাদিকের আজানই সাহরির শেষ সময় নির্দেশ করে।

সাহরি ও ফজরের নামাজ
যেমনটি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহরি ও ফজরের নামাজের মধ্যে প্রায় ৫০ আয়াত তেলাওয়াত পরিমাণ সময়ের ব্যবধান ছিল, যা আনুমানিক ১৫-২০ মিনিট। তাই শেষ সময়ে সাহরি সম্পন্ন করে, ফজরের আজান হওয়ার পর এই নির্দিষ্ট সময়টুকু অপেক্ষা করে নামাজ আদায় করলে সকল সুন্নত পালিত হয়। এটি রোজাদারকে শারীরিক ও আত্মিকভাবে সতেজ রাখে এবং ইবাদতে মনোনিবেশ করতে সাহায্য করে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রমজানের বরকতময় সাহরি: রোজার শক্তি ও আধ্যাত্মিকতার উৎস

আপডেট সময় : ০৯:৪৪:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য সংযম, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির এক পবিত্র মাস। এই মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো সাহরি। রাতের শেষ প্রহরে গ্রহণ করা এই খাবার কেবল শারীরিক শক্তি যোগায় না, বরং এর পেছনে রয়েছে মহান আল্লাহর বিশেষ বরকত ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহরিকে বরকতময় আখ্যা দিয়েছেন এবং এটিকে মুসলিমদের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবেও বিবেচিত করেছেন।

সাহরি আরবি শব্দ, যার অর্থ রাতের শেষ ভাগে খাওয়া খাবার। মহান আল্লাহ তাআলা রোজাদারদের জন্য সাহরি গ্রহণের বিধান দিয়েছেন, যাতে সারাদিনের রোজা রাখা সহজ হয় এবং ইবাদতের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি পাওয়া যায়। এটি কেবল একটি খাবার নয়, বরং একটি বরকতময় ইবাদত, যা রোজার সওয়াব বৃদ্ধি করে।

সাহরির সময়সীমা
সাহরির সময় নিয়ে ইসলামিক স্কলারদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য থাকলেও এর সমাপ্তির বিষয়ে সবাই একমত। আল্লামা যামাখশারী (রহ.)-এর মতে, রাতের শেষ ষষ্ঠাংশ হলো সাহরির সময়। মোল্লা আলী কারী (রহ.) বলেন, রাতের অর্ধাংশের পর থেকে সাহরির সময় শুরু হয়ে ফজরের পূর্ব পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকে। তবে সর্বসম্মতভাবে সুবহে সাদিক অর্থাৎ ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাহরির সময় শেষ হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “আর তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ রাতের কালো রেখা থেকে উষার সাদা রেখা তোমাদের কাছে স্পষ্ট না হয়। অতঃপর রাত আগমন পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো।” (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৭)। সুতরাং, সুবহে সাদিকের পর কোনো প্রকার পানাহার করলে রোজা ভেঙে যাবে।

সাহরির ফজিলত ও বরকত
সাহরির ফজিলত অপরিসীম। হযরত আনাস ইবন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা সাহরি খাও, কারণ সাহরিতে বরকত রয়েছে।” (বুখারি, মুসলিম)। এই বরকত শারীরিক ও আত্মিক উভয় প্রকারের হতে পারে। হযরত আমর ইবন আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, “আমাদের এবং কিতাবধারীদের (ইহুদি-খ্রিষ্টান) রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সাহরি খাওয়া।” (মুসলিম)। এর মাধ্যমে সাহরি মুসলিম উম্মাহর একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়াও, হযরত ইবন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেশতারা সাহরি গ্রহণকারীদের প্রতি রহমতের জন্য প্রার্থনা করেন।” (ইবন হিব্বান)। এই হাদিসগুলো সাহরির আধ্যাত্মিক গুরুত্ব তুলে ধরে।

সাহরিতে যা খাওয়া যায়
সাহরি বরকতময় খাবার হলেও এর জন্য বিশাল আয়োজনের প্রয়োজন নেই। অল্প খাবার বা এক ঢোক পানি পান করলেও সাহরির সুন্নত আদায় হয়ে যায়। (ইবন হিব্বান)। খেজুর দিয়ে সাহরি খাওয়াকে রাসূলুল্লাহ (সা.) মুমিনের উত্তম সাহরি বলে আখ্যায়িত করেছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মুমিনের উত্তম সাহরি হলো খেজুর।” (আবু দাউদ)। তাই হালকা ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা উচিত, যা সারাদিন রোজা রাখতে সাহায্য করবে।

শেষ সময়ে সাহরি খাওয়ার গুরুত্ব
সুন্নত হলো সাহরির শেষ সময়ের কাছাকাছি সময়ে সাহরি খাওয়া। রাসূলুল্লাহ (সা.) সবসময় দেরিতে সাহরি গ্রহণ করতেন। হযরত যায়দ ইবন সাবেত (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহরি ও ফজরের নামাজের মধ্যে ৫০ আয়াত পাঠ করার মতো সময়ের ব্যবধান থাকত। (বুখারি, মুসলিম)। ৫০ আয়াত তেলাওয়াত করতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে। দেরিতে সাহরি খেলে রোজা রাখতে অধিকতর সহজ হয় এবং ফজরের নামাজ আদায়ের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় না। ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার অনেক আগে সাহরি শেষ করে ফেলা সুন্নত নয়, বরং শেষ সময় পর্যন্ত বিলম্ব করাই উত্তম।

সাহরি ও ফজরের আজান
অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা আছে যে, ফজরের আজান শুরু হলে সাহরির সময় শেষ হয়। কিন্তু শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, সুবহে সাদিক শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাহরির সময় শেষ হয়ে যায়। আজান দেওয়া বা না দেওয়া এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে সাহরি ও তাহাজ্জুদের জন্য হযরত বেলাল (রা.) আজান দিতেন, যা ছিল মূলত ঘুম থেকে জাগানোর জন্য। এরপর ফজরের সময় হলে হযরত আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম (রা.) ফজরের আজান দিতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “বেলাল রাতে আজান দেয়। তোমরা খাও ও পান করো যতক্ষণ না ইবন উম্মে মাকতুমের আজান শুনতে পাও।” (বুখারি, মুসলিম)। এটি স্পষ্ট করে যে, সুবহে সাদিকের আজানই সাহরির শেষ সময় নির্দেশ করে।

সাহরি ও ফজরের নামাজ
যেমনটি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহরি ও ফজরের নামাজের মধ্যে প্রায় ৫০ আয়াত তেলাওয়াত পরিমাণ সময়ের ব্যবধান ছিল, যা আনুমানিক ১৫-২০ মিনিট। তাই শেষ সময়ে সাহরি সম্পন্ন করে, ফজরের আজান হওয়ার পর এই নির্দিষ্ট সময়টুকু অপেক্ষা করে নামাজ আদায় করলে সকল সুন্নত পালিত হয়। এটি রোজাদারকে শারীরিক ও আত্মিকভাবে সতেজ রাখে এবং ইবাদতে মনোনিবেশ করতে সাহায্য করে।