মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
ঢাকা ০২:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

এসএসসির ফলে বড় দরপতন: দেড় যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হারের নেপথ্যে কী?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:২৩:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে

এ বছরের ফলাফলের সার্বিক চিত্রে দেখা যায়, মোট সোয়া ১৮ লাখের বেশি পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৬২.২৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। সবচেয়ে কম পাসের হার মাদ্রাসা বোর্ডে (৫৫.৪৯%) এবং সর্বোচ্চ পাসের হার ঢাকা বোর্ডে (৭১.৬৩%)। বোর্ডের প্রধানগণ এবং সরকারের নীতি-নির্ধারকদের ভাষ্যমতে, বিগত সরকারের আমলে কৃত্রিমভাবে কৃপা বা অযাচিত নম্বর দিয়ে ফল ফুলিয়ে-ফাপিয়ে দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, তা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসে শতভাগ নিরপেক্ষ ও খাতার সঠিক মূল্যায়নের ভিত্তিতেই এই ফল তৈরি হয়েছে। ফলে এটিকে তারা একটি ‘সুস্থ ও স্বাভাবিক’ ধারার প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন।

তবে মাঠপর্যায়ের শিক্ষক, শিক্ষাবিদ এবং খাতা মূল্যায়নকারীদের বিশ্লেষণ থেকে পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক মূল কারণ চিহ্নিত হয়েছে:

  • ইংরেজি ও গণিতে গণফেল: পাসের হার কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল আবশ্যিক বিষয় ইংরেজি ও গণিতে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া। বোর্ডভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি বড় বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ছিল মাত্র ৬৬ থেকে ৬৯ শতাংশ এবং গণিতে ৬৯ থেকে ৭১ শতাংশ।
  • শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব: ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রণীত নতুন শিক্ষাক্রমে পাঠদান করা হলেও, ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার সেই শিক্ষাক্রম বাতিল করে শিক্ষার্থীদের পরিমার্জিত ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের ওপর দশম শ্রেণিতে পাঠদান করায়। হঠাৎ মলাট ও মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
  • অভ্যুত্থান-পরবর্তী ভঙ্গুর ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক: ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে দীর্ঘদিনের স্বাভাবিক লেখাপড়ার পরিবেশ নষ্ট হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের প্রতি অসদাচরণ বা মব কালচারের দরুন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার পারস্পরিক অনুশাসন ও দরদ ব্যাহত হয়।
  • কেন্দ্রীয় কড়াকড়ি ও ডিজিটাল নজরদারি: প্রথমবারের মতো পরীক্ষার সব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং দায়িত্বরত পুলিশের শরীরে বডি ক্যামেরা যুক্ত করার ফলে হলে অসদুপায় অবলম্বন বা দেখে লেখার সুযোগ একদম বন্ধ হয়ে যায়, যা ফলের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং শিক্ষাবিদেরা মনে করছেন, সমাজ ও পরিবারে পড়াশোনার স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ের মানহীন স্কুল ও দুর্বল বিষয়গুলোর (গণিত ও ইংরেজি) ওপর নিবিড় যত্ন না নিলে কেবল ‘মেধার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন’ দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়।

প্রতিনিধিত্বশীল প্রধান বোর্ডগুলোর ৩ বছরের ফলাফল তুলনা:

শিক্ষা বোর্ড২০২৪ (পাস % / জিপিএ-৫)২০২৫ (পাস % / জিপিএ-৫)২০২৬ (পাস % / জিপিএ-৫)
ঢাকা৮৩.৯২% (৪৯,১৯০)৬৭.৫১% (৩৭,০৬৮)৭১.৬৩% (৩৩,২৫৩)
রাজশাহী৮৯.২৬% (২৮,০৭৪)৭৭.৬৩% (২২,৩২৭)৬৩.৬৭% (১৬,১১৩)
কুমিল্লা৭৯.২৩% (১২,১০০)৬৩.৬০% (৯,৯০২)৬৫.৪২% (৯,৮১৪)
যশোর৯২.৩৩% (২০,৭৬১)৭৩.৬৯% (১৫,৪১০)৬৬.২৭% (১১,৪৭৮)
চট্টগ্রাম৮২.৮০% (১০,৮২৩)৭২.০৭% (১১,৮৪৩)৫৯.৪৮% (৯,৩৯৮)
মাদ্রাসা৭৯.৬৬% (১৪,২০৬)৬৮.০৯% (৯,০৬৬)৫৫.৪৯% (৬,৭১৬)
সর্বমোট গড়৮৩.০৪% (১,৮২,১২৯)৬৮.৪৫% (১,৩৯,০৩২)৬২.২৫% (১,১৬,৬৭৬)
ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তুরস্ক ত্যাগ: কনটেইনারে গোপন যাত্রার রহস্য

এসএসসির ফলে বড় দরপতন: দেড় যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হারের নেপথ্যে কী?

আপডেট সময় : ১২:২৩:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

এ বছরের ফলাফলের সার্বিক চিত্রে দেখা যায়, মোট সোয়া ১৮ লাখের বেশি পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৬২.২৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। সবচেয়ে কম পাসের হার মাদ্রাসা বোর্ডে (৫৫.৪৯%) এবং সর্বোচ্চ পাসের হার ঢাকা বোর্ডে (৭১.৬৩%)। বোর্ডের প্রধানগণ এবং সরকারের নীতি-নির্ধারকদের ভাষ্যমতে, বিগত সরকারের আমলে কৃত্রিমভাবে কৃপা বা অযাচিত নম্বর দিয়ে ফল ফুলিয়ে-ফাপিয়ে দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, তা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসে শতভাগ নিরপেক্ষ ও খাতার সঠিক মূল্যায়নের ভিত্তিতেই এই ফল তৈরি হয়েছে। ফলে এটিকে তারা একটি ‘সুস্থ ও স্বাভাবিক’ ধারার প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন।

তবে মাঠপর্যায়ের শিক্ষক, শিক্ষাবিদ এবং খাতা মূল্যায়নকারীদের বিশ্লেষণ থেকে পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক মূল কারণ চিহ্নিত হয়েছে:

  • ইংরেজি ও গণিতে গণফেল: পাসের হার কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল আবশ্যিক বিষয় ইংরেজি ও গণিতে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া। বোর্ডভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি বড় বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ছিল মাত্র ৬৬ থেকে ৬৯ শতাংশ এবং গণিতে ৬৯ থেকে ৭১ শতাংশ।
  • শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব: ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রণীত নতুন শিক্ষাক্রমে পাঠদান করা হলেও, ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার সেই শিক্ষাক্রম বাতিল করে শিক্ষার্থীদের পরিমার্জিত ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের ওপর দশম শ্রেণিতে পাঠদান করায়। হঠাৎ মলাট ও মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
  • অভ্যুত্থান-পরবর্তী ভঙ্গুর ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক: ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে দীর্ঘদিনের স্বাভাবিক লেখাপড়ার পরিবেশ নষ্ট হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের প্রতি অসদাচরণ বা মব কালচারের দরুন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার পারস্পরিক অনুশাসন ও দরদ ব্যাহত হয়।
  • কেন্দ্রীয় কড়াকড়ি ও ডিজিটাল নজরদারি: প্রথমবারের মতো পরীক্ষার সব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং দায়িত্বরত পুলিশের শরীরে বডি ক্যামেরা যুক্ত করার ফলে হলে অসদুপায় অবলম্বন বা দেখে লেখার সুযোগ একদম বন্ধ হয়ে যায়, যা ফলের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং শিক্ষাবিদেরা মনে করছেন, সমাজ ও পরিবারে পড়াশোনার স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ের মানহীন স্কুল ও দুর্বল বিষয়গুলোর (গণিত ও ইংরেজি) ওপর নিবিড় যত্ন না নিলে কেবল ‘মেধার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন’ দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়।

প্রতিনিধিত্বশীল প্রধান বোর্ডগুলোর ৩ বছরের ফলাফল তুলনা:

শিক্ষা বোর্ড২০২৪ (পাস % / জিপিএ-৫)২০২৫ (পাস % / জিপিএ-৫)২০২৬ (পাস % / জিপিএ-৫)
ঢাকা৮৩.৯২% (৪৯,১৯০)৬৭.৫১% (৩৭,০৬৮)৭১.৬৩% (৩৩,২৫৩)
রাজশাহী৮৯.২৬% (২৮,০৭৪)৭৭.৬৩% (২২,৩২৭)৬৩.৬৭% (১৬,১১৩)
কুমিল্লা৭৯.২৩% (১২,১০০)৬৩.৬০% (৯,৯০২)৬৫.৪২% (৯,৮১৪)
যশোর৯২.৩৩% (২০,৭৬১)৭৩.৬৯% (১৫,৪১০)৬৬.২৭% (১১,৪৭৮)
চট্টগ্রাম৮২.৮০% (১০,৮২৩)৭২.০৭% (১১,৮৪৩)৫৯.৪৮% (৯,৩৯৮)
মাদ্রাসা৭৯.৬৬% (১৪,২০৬)৬৮.০৯% (৯,০৬৬)৫৫.৪৯% (৬,৭১৬)
সর্বমোট গড়৮৩.০৪% (১,৮২,১২৯)৬৮.৪৫% (১,৩৯,০৩২)৬২.২৫% (১,১৬,৬৭৬)