ঢাকা ০৫:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

সুরক্ষাই প্রথম: শিশুর নিরাপদ শৈশবকে জাতীয় অগ্রাধিকারের দাবি

‘দশ মাস দশ দিন ধরে গর্ভধারণ…’—জেমসের গাওয়া এই কালজয়ী গানের মর্মার্থ গর্ভধারণের পরই একজন মা গভীর থেকে উপলব্ধি করতে পারেন। অনাগত সন্তানের নিরাপদ আগমনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে পিতামাতা ও পরিবারের হাজারো উদ্বেগ, ভালোবাসা ও অনাবিল স্বপ্ন। শিশু জন্মের সাথে সাথে একটি পরিবার যে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, তার সাথে বস্তুত পুরো দেশের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে। কারণ আজকের শিশুই আগামী দিনের শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী বা রাষ্ট্রনায়ক। তাই শিশুর নিরাপত্তা ও বিকাশ কেবল একটি পরিবারের নিজস্ব দায়িত্ব নয়, এটি জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে শিশুদের জীবনের নিরাপত্তা প্রতিনিয়ত নানা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে মৃত্যু, সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এর বড় প্রমাণ। সাম্প্রতিক সময়ে মাইলস্টোন স্কুলের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আমাদের ভাবিয়ে তোলে যে, আমরা আসলে কতটা নিরাপদ পরিবেশ উপহার দিতে পেরেছি। সাধারণত কোনো দুর্ঘটনার পর দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত ও জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা হয়; তবে কেবল দায় নির্ধারণ করলেই রাষ্ট্রের কাজ শেষ হয় না। প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিরাপদ নগর পরিকল্পনা, দুর্নীতি রোধ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার সমন্বয়ে একটি টেকসই সমাধান বের করা জরুরি।

শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো একক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়; বরং এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, সড়ক পরিবহন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সকলের যৌথ ও সমন্বিত উদ্যোগ। একে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে না দেখে জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিণত করতে হবে। বিদ্যালয় পর্যায়ে ভবন নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, নিয়মিত মহড়া, প্রাথমিক চিকিৎসা ও দুর্যোগ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের গুড টাচ-ব্যাড টাচ, জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ ও জীবনদক্ষতা (Life Skills) শেখানো অপরিহার্য।

স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও শিশু সুরক্ষা অত্যন্ত সংবেদনশীল। টিকাদান, পরিষ্কার পরিবেশ, বিশুদ্ধ পানি ও দ্রুত চিকিৎসার অভাবে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুর মৃত্যু জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। এর পাশাপাশি খাদ্যে ভেজাল, অননুমোদিত ওষুধ ও ভুল চিকিৎসা শিশুদের নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা একধরনের ‘সাইলেন্ট ডেথ’। অন্যদিকে পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে সাঁতার প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি।

বিশ্বের অনেক দেশ বড় দুর্ঘটনার পর তদন্তের পাশাপাশি নতুন নিরাপত্তা মানদণ্ড ও বিধিমালা তৈরি করে তা বাস্তবায়ন করে। আমাদের দেশেও শুধু শোক প্রকাশ না করে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের মতো শিশুদের নিরাপত্তা, সুস্থতা ও মর্যাদাকে দেশের উন্নয়নের প্রধান জাতীয় সূচক হিসেবে গণ্য করতে হবে। জন্ম থেকে কৈশোর পর্যন্ত নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত ‘জাতীয় শিশু নিরাপত্তা কাঠামো’ প্রণয়ন করা এবং জাতীয় বাজেটে বিদ্যালয় নিরাপত্তা, শিশুস্বাস্থ্য, সাঁতার শিক্ষা ও খেলার মাঠের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা এখন সময়ের দাবি। শিশুর নিরাপত্তা কেবল বিশেষ দিনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের প্রতিদিনের অঙ্গীকারে রূপ দিতে হবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাই সনদের আইনি বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্য

সুরক্ষাই প্রথম: শিশুর নিরাপদ শৈশবকে জাতীয় অগ্রাধিকারের দাবি

আপডেট সময় : ০৩:১৫:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

‘দশ মাস দশ দিন ধরে গর্ভধারণ…’—জেমসের গাওয়া এই কালজয়ী গানের মর্মার্থ গর্ভধারণের পরই একজন মা গভীর থেকে উপলব্ধি করতে পারেন। অনাগত সন্তানের নিরাপদ আগমনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে পিতামাতা ও পরিবারের হাজারো উদ্বেগ, ভালোবাসা ও অনাবিল স্বপ্ন। শিশু জন্মের সাথে সাথে একটি পরিবার যে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, তার সাথে বস্তুত পুরো দেশের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে। কারণ আজকের শিশুই আগামী দিনের শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী বা রাষ্ট্রনায়ক। তাই শিশুর নিরাপত্তা ও বিকাশ কেবল একটি পরিবারের নিজস্ব দায়িত্ব নয়, এটি জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে শিশুদের জীবনের নিরাপত্তা প্রতিনিয়ত নানা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে মৃত্যু, সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এর বড় প্রমাণ। সাম্প্রতিক সময়ে মাইলস্টোন স্কুলের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আমাদের ভাবিয়ে তোলে যে, আমরা আসলে কতটা নিরাপদ পরিবেশ উপহার দিতে পেরেছি। সাধারণত কোনো দুর্ঘটনার পর দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত ও জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা হয়; তবে কেবল দায় নির্ধারণ করলেই রাষ্ট্রের কাজ শেষ হয় না। প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিরাপদ নগর পরিকল্পনা, দুর্নীতি রোধ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার সমন্বয়ে একটি টেকসই সমাধান বের করা জরুরি।

শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো একক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়; বরং এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, সড়ক পরিবহন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সকলের যৌথ ও সমন্বিত উদ্যোগ। একে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে না দেখে জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিণত করতে হবে। বিদ্যালয় পর্যায়ে ভবন নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, নিয়মিত মহড়া, প্রাথমিক চিকিৎসা ও দুর্যোগ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের গুড টাচ-ব্যাড টাচ, জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ ও জীবনদক্ষতা (Life Skills) শেখানো অপরিহার্য।

স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও শিশু সুরক্ষা অত্যন্ত সংবেদনশীল। টিকাদান, পরিষ্কার পরিবেশ, বিশুদ্ধ পানি ও দ্রুত চিকিৎসার অভাবে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুর মৃত্যু জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। এর পাশাপাশি খাদ্যে ভেজাল, অননুমোদিত ওষুধ ও ভুল চিকিৎসা শিশুদের নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা একধরনের ‘সাইলেন্ট ডেথ’। অন্যদিকে পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে সাঁতার প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি।

বিশ্বের অনেক দেশ বড় দুর্ঘটনার পর তদন্তের পাশাপাশি নতুন নিরাপত্তা মানদণ্ড ও বিধিমালা তৈরি করে তা বাস্তবায়ন করে। আমাদের দেশেও শুধু শোক প্রকাশ না করে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের মতো শিশুদের নিরাপত্তা, সুস্থতা ও মর্যাদাকে দেশের উন্নয়নের প্রধান জাতীয় সূচক হিসেবে গণ্য করতে হবে। জন্ম থেকে কৈশোর পর্যন্ত নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত ‘জাতীয় শিশু নিরাপত্তা কাঠামো’ প্রণয়ন করা এবং জাতীয় বাজেটে বিদ্যালয় নিরাপত্তা, শিশুস্বাস্থ্য, সাঁতার শিক্ষা ও খেলার মাঠের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা এখন সময়ের দাবি। শিশুর নিরাপত্তা কেবল বিশেষ দিনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের প্রতিদিনের অঙ্গীকারে রূপ দিতে হবে।