ঢাকা ১০:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশে ব্যারাজ কি মরীচিকা? প্রস্তাবিত প্রকল্প নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:১৯:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বড় ধরনের ব্যারাজ নির্মাণ ও এর মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে নীতিনির্ধারণী ও জনপরিসরে কিছু বড় ধরনের বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি উচ্চমহল থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে যে, প্রস্তাবিত ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে বর্ষাকালের বিপুল নদীপ্রবাহ কার্যকরভাবে ধরে রাখা সম্ভব হবে এবং সেই সঞ্চিত পানি শুষ্ক শীতকালে ব্যবহার করা যাবে। সম্প্রতি মালয়েশিয়া সফরকালে নতুন গঠিত সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এই একই ধারণার কথা ব্যক্ত করেছেন। এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, তিনি এই সংক্রান্ত ধারণা মূলত প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের মূল প্রবক্তাদের উপস্থাপনা এবং এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ‘সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন’ (Feasibility Report) থেকেই লাভ করেছেন।

তবে সেই সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনে দেওয়া গাণিতিক হিসাব-নিকাশই সরাসরি প্রমাণ করে দেয় যে, বর্ষার পানি ধরে রেখে শীতকালে ব্যবহারের এই সরকারি ধারণাটি একেবারেই সঠিক নয়। প্রকল্পের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, পাবনার পাংশাতে ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে পানির উচ্চতা সর্বোচ্চ ১২.৫ মিটার পর্যন্ত রাখা সম্ভব হবে। এর ফলে রাজশাহীর পাংখা থেকে শুরু করে রাজবাড়ীর পাংশা পর্যন্ত বাংলাদেশের গঙ্গা নদীতে মোট জমাকৃত সঞ্চিত পানির পরিমাণ দাঁড়াবে আনুমানিক ২৮৯ কোটি ঘনমিটার।

অন্যদিকে আমরা সবাই জানি যে, বর্ষাকালে বাংলাদেশে গঙ্গা নদীর মোট পানি প্রবাহের আনুমানিক পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৮৮০ কোটি ঘনমিটার। অর্থাৎ প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজ যে বিপুল সর্বোচ্চ পানি সঞ্চয় করতে সক্ষম হবে (২৮৯ কোটি ঘনমিটার), তা আসলে বাংলাদেশে গঙ্গার মোট বর্ষাকালীন পানি প্রবাহের মাত্র ১.০৪ শতাংশ ছাড়া আর কিছুই নয়!

বিষয়টিকে আরও সহজ ও পরিষ্কার গাণিতিক হিসাবে দেখা যেতে পারে। গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের মূল সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যারাজের সাহায্যে গঙ্গার পানির সার্বিক উচ্চতা বৃদ্ধি করে বাংলাদেশের গঙ্গার মোট পাঁচটি শাখা নদী এবং দুটি আলাদা পাম্পহাউসে সর্বমোট গড়ে ২ হাজার ৭৬৮ কিউমেক পানি সরবরাহ করার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এর বিবরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—গঙ্গার ডান পাশের হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদীতে ৩২৭ কিউমেক, ভেড়ামারা পাম্পহাউসে ৯৩ কিউমেক, ঐতিহ্যবাহী গড়াই-মধুমতীতে ২ হাজার ১০৮ কিউমেক এবং চন্দনা-বারসিয়া নদীতে ৩০০ কিউমেক; অন্যদিকে গঙ্গার বাঁ পাশের গোদাগাড়ী পাম্পহাউসে ৪০ কিউমেক, বড়াল নদীতে ২১ কিউমেক এবং ইছামতী নদীতে ১৫.৫ কিউমেক পানি প্রবাহিত করা হবে। এখন হিসাব হলো, শুধু যদি প্রস্তাবিত ব্যারাজের সঞ্চিত পানি (২৮৯ কোটি ঘনমিটার) থেকে এই নির্ধারিত হারে পানি সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয়, তবে মাত্র সাড়ে সাত দিনের (৭.৫ দিন) মধ্যে জমা থাকা পুরো পানি একেবারে শূন্য বা নিঃশেষিত হয়ে যাবে। কাজেই এটি দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে, প্রস্তাবিত ব্যারাজের মাধ্যমে গঙ্গার বিভিন্ন শাখা ও পাম্পহাউসে যা পানি দেওয়া হবে, তা মূলত গঙ্গার প্রতিদিনের চলতি প্রবাহ থেকেই দেওয়া হবে, জমানো সঞ্চিত পানি থেকে একেবারেই নয়।

পাংশায় গঙ্গার পানি আধাআধি ভাগ হবে:
প্রকল্পের মূল বাস্তবায়ন প্রতিবেদনের সরকারি হিসাব মতে, শুষ্ক মৌসুমে (নভেম্বর থেকে মে) উল্লিখিত সাতটি অভিমুখে প্রবাহিত মোট পানির পরিমাণ ধরা হয়েছে ১ হাজার ২১০ কিউমেক। একই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা আছে যে, ১৯৯৭ থেকে ২০১০ সালের সময়কালে এই নির্দিষ্ট শুষ্ক মাসগুলোতে বাংলাদেশে গঙ্গার স্বাভাবিক গড় প্রবাহের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬৯৪ কিউমেক। এর অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট—শুষ্ক মৌসুমে যেটুকু পানি ভারতের ফারাক্কা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে, তার প্রায় অর্ধেক (৪৫ শতাংশ) গোয়ালন্দের মূল গতিপথের দিকে আর যেতে পারবে না। এ কারণেই প্রকল্পের অফিশিয়াল সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনে দেখা যায়, পাংশার উজানে গঙ্গার পানির উচ্চতা ১২.৫ মিটার রাখা হলেও ভাটির অংশে সেই পানির উচ্চতা আশঙ্কাজনকভাবে ২ মিটারের নিচে নেমে যায়।

অর্থাৎ বিষয়টিকে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ফারাক্কা পয়েন্টে যেমন শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আধাআধি ভাগ হয়ে যায়, ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের ভেতরে পাংশা পয়েন্টে বাকি অবশিষ্ট পানিটুকু উজান ও ভাটি এলাকার মধ্যে আধাআধি বিভক্ত হবে। এই কঠোর ও কঠিন বৈজ্ঞানিক সত্যকে কোনোভাবেই এড়ানোর সুযোগ নেই। (এ বিষয়ে বিষদ জানতে ১৯ মে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট পানিবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামানের সাক্ষাৎকার দ্রষ্টব্য)।

ব্যারাজ নিয়ে ‘মির্যাজ’ বা মরীচিকা:
ব্যারাজ তৈরির মাধ্যমে পদ্মার বর্ষাকালীন গতিপ্রবাহ ধরে রেখে তা শীতকালে সংকটকালে ব্যবহার করা যাবে—এটি মূলত একটি কাল্পনিক লোককথা বা মিথ (Myth), যার সাথে বাস্তবতার রূপান্তর বিন্দুমাত্র নেই। এই অবাস্তব বয়ানের মধ্য দিয়ে ব্যারাজের মূল কাজের উদ্দেশ্য নিয়ে একটি বড় মরীচিকা বা ‘মির্যাজ’ (Mirage) তৈরি করা হচ্ছে, যা বাস্তবে কখনোই অর্জন করা সম্ভব নয়।

এই অবাস্তব মরীচিকার বিষয়টি প্রস্তাবিত দ্বিতীয় তিস্তা ব্যারাজের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। এই নতুন ব্যারাজের প্রস্তাবটি সম্পূর্ণ আকস্মিক ও নতুন। ডালিয়াতে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব তিস্তা ব্যারাজ থাকা সত্ত্বেও কেন আবার নতুন একটি ব্যারাজ নির্মাণ করতে হবে এবং কোথায় তা করা হবে, তা কারোর কাছে স্পষ্ট নয়। তবে এই নতুন ব্যারাজ যদি তৈরিও করা হয়, এর মূল কাজ হবে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের কেবল ভৌগোলিক দিক রূপান্তর করা—কোনোভাবেই বর্ষার পানি সঞ্চয় করে শীতকালের পানির স্বল্পতা দূর করা নয়।

মূলত এই সাধারণ প্রাকৃতিক বিষয়টি বোঝার জন্য জটিল কোনো গাণিতিক হিসাবের প্রয়োজন পড়ে না। আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে ভারতের তৈরি ফারাক্কা ও গজলডোবা ব্যারাজের সুদীর্ঘ ও তিক্ত অভিজ্ঞতা। ব্যারাজ দিয়ে যদি বর্ষার পানিকে শীতের জন্য ধরে রাখা যেত, তবে ভারতের ওই ব্যারাজগুলোর কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের গঙ্গা ও তিস্তায় পানির এমন চরম অভাব দেখা দেয় কেন?

আমাদের নিজস্ব ডালিয়ায় নির্মিত তিস্তা ব্যারাজের অভিজ্ঞতাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। ব্যারাজ যদি শীতের জন্য পানি জমা রাখতে পারত, তবে ডালিয়া থেকে চিলমারী পর্যন্ত বিস্তৃত তিস্তা নদীতে শীতের দিনে বিন্দুমাত্র পানি থাকে না কেন? কেন তিস্তা আজ পানিশূন্য হয়ে মারাত্মক সংকটে এবং কেনই বা তিস্তা রক্ষার জন্য কোটি কোটি টাকার ‘মহাপরিকল্পনা’র কথা বলতে হচ্ছে?

কাপ্তাই বাঁধ ও কৃত্রিম হ্রদের বাস্তব অভিজ্ঞতা:
প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী, এক ঋতুর বিশাল পানি অন্য ঋতুতে ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত বড় আয়তনের কৃত্রিম হ্রদের প্রয়োজন পড়ে, যা সাধারণত সাধারণ ব্যারাজের বদলে বড় বাঁধ (Dam) নির্মাণের মাধ্যমে তৈরি হয়। বাংলাদেশে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের কাপ্তাই বাঁধ এর অন্যতম প্রধান উদাহরণ। এই বাঁধের মাধ্যমে সৃষ্ট কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদের মোট আয়তন ৬৮৮ বর্গকিলোমিটার এবং এতে প্রায় ৬৪৮ কোটি ঘনমিটার পানি জমানো সম্ভব, যা প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজের পরিকল্পনা করা জলাধারের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি (২২৪ শতাংশ)। অন্যদিকে বাংলাদেশে গঙ্গা নদীর ১১ হাজার ৫০০ কিউমেকের তুলনায় কর্ণফুলী নদীর গড় বার্ষিক প্রবাহ মাত্র ১ হাজার ৯০১ কিউমেক, অর্থাৎ গঙ্গার ৬ ভাগের ১ ভাগ মাত্র।

সুতরাং, নদীর প্রবাহ ও পানি জমার অনুপাতের হিসাবে প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজের ধারণক্ষমতার তুলনায় কাপ্তাই হ্রদের ক্ষমতা প্রায় ১৩.৬ গুণ বেশি। যে কারণে কাপ্তাই হ্রদ কিছুটা হলেও বর্ষার পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে ছাড়তে পারে। কিন্তু দিনে দিনে পলি জমার কারণে সেই কাপ্তাইয়ের ধারণক্ষমতাও এখন চরম সংকটে। ১৯৯০-এর দশকেই পলি জমে কাপ্তাইয়ের ২৫ শতাংশ ধারণক্ষমতা নষ্ট হয়েছিল। গত ৩০ বছরে তা আরও অন্তত ২৫ শতাংশ কমে গেছে বলে স্পষ্ট অনুমান করা যায়। ফলে এত বড় অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও শীতকালে কর্ণফুলী নদীতে স্বাভাবিক প্রবাহ ২০০ কিউমেকের নিচে নেমে যায়। এতে কাপ্তাইয়ের জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে মাত্র ৪০ মেগাওয়াটে নেমে আসে এবং অনেক সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়। ভবিষ্যতে একসময় কাপ্তাই বাঁধকে অপসারণ করার মতো কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, অন্যথায় পলি জমে নদী বাঁধের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার মতো মারাত্মক বিপদ ডেকে আনবে। একই নিয়মে প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজের উজানেও দ্রুত পলি জমে পানি ধরে রাখার সক্ষমতা ক্রমান্বয়ে ধ্বংস হবে, উজানে নদীর পাড় ভাঙন প্রবল হবে এবং নদী অপ্রয়োজনীয়ভাবে চওড়া হয়ে ভূমি গ্রাস করবে।

ভাটি এলাকার ওপর ব্যারাজের মারাত্মক ধ্বংসাত্মক প্রভাব:
যেহেতু প্রস্তাবিত ব্যারাজ রাজবাড়ীর পাংশায় গঙ্গার প্রবাহকে সরাসরি দুটি ভাগে বিভক্ত করে ফেলবে, সেহেতু এই অবকাঠামোর কারণে ভাটি অঞ্চলে কী ধরনের ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটবে, তা পর্যালোচনা করা প্রকল্পের প্রবক্তাদের নৈতিক দায়িত্ব ছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রকল্পের মূল সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনে কেবল উজানের ইতিবাচক দিকের কাল্পনিক বিবরণ দেওয়া হয়েছে এবং ভাটির মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবকে পুরোপুরি অবহেলা ও উপেক্ষা করা হয়েছে।

সংক্ষেপে ভাটি অঞ্চলের ওপর এই ব্যারাজের ৫টি মূল বিধ্বংসী প্রভাব স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়:
১. ভাটির অংশে গঙ্গা, পদ্মা এবং এসবের সাথে যুক্ত প্রধান শাখা নদীগুলোর শুষ্ক মৌসুমের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাচীন কুমার, ইছামতী এবং বিশেষ করে আড়িয়াল খাঁ নদী, যা পুরো বরিশাল বিভাগের মূল পানির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে।
২. ভাটির নদীগুলোতে ঋতুভিত্তিক পানির বৈষম্য চরম রূপ নেবে। কারণ শুষ্ক মৌসুমে নদী থাকবে পানিশূন্য, অথচ বর্ষায় বিশাল পানি এসে প্লাবিত করবে।
৩. প্রবাহের এই তীব্র ঋতুভেদের কারণে পুরো নদী খাতের ভৌগোলিক আকৃতি সম্পূর্ণ বিকৃত হয়ে যাবে। শুষ্ক মৌসুমে নদীজুড়ে বিশাল চরাঞ্চল জেগে গভীরতা হারাবে, আর বর্ষায় সেই একই নদী তীরের হাজার হাজার একর জমি গ্রাস করে চওড়া হবে। ডালিয়া থেকে চিলমারী পর্যন্ত তিস্তা নদী এর জ্বলন্ত প্রমাণ।
৪. শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার ফলে পুরো বরিশাল বিভাগ এবং মেঘনা মোহনার বিশাল অঞ্চলে সাগরের ক্ষতিকর লবণাক্ততার প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যাবে।
৫. প্রস্তাবিত ব্যারাজের উজানভাগে প্রয়োজনীয় পলি ও পলি-বালু আটকে পড়ার দরুন দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মেঘনা মোহনায় নতুন রূপের প্রাকৃতিক বদ্বীপ (Delta) গঠনের চিরন্তন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।

ভাটি অঞ্চলের ওপর ব্যারাজের এই নেতিবাচক প্রভাব যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, আমাদের প্রতিবেশী ভারতের ফারাক্কা ও গজলডোবা ব্যারাজই তার সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রমাণ এবং বাংলাদেশ নিজে তার প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী। এমন পরিস্থিতিতে একটি একপেশে ও অসম্পূর্ণ সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে কীভাবে দেশের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (NEC) এই বিতর্কিত ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদন প্রদান করে, তা সত্যি চরম বিস্ময়ের সৃষ্টি করে।

বর্ষাকালের পানি ধরে রাখার প্রকৃত বাস্তবসম্মত বিকল্প:
প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক বিচারে বিশাল আকৃতির কৃত্রিম হ্রদ ছাড়া বর্ষার বিপুল পানি সঞ্চয় করে তা শীতকালে ব্যাপকভাবে কাজে লাগানোর কোনো সাধারণ প্রযুক্তিগত সুযোগ নেই। তবে বাংলাদেশকে রক্ষায় একটিমাত্র প্রাকৃতিক উপায় খোলা রয়েছে—আর তা হলো, পুরো বাংলাদেশকে একটি বিশাল ‘বিচ্ছুরিত প্রাকৃতিক হ্রদ’ (Diffused lake) হিসেবে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, গত প্রায় সাত দশক ধরে বিদেশি পরামর্শক ও বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাসমূহের প্রভাবে বাংলাদেশ মূলত এই স্বাভাবিক পথের ঠিক বিপরীত দিকে হেঁটেছে। নদ-নদীকে বিভিন্ন কৃত্রিম বাঁধ বা বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে ফেলার ভুল নীতির কারণে দেশের বিস্তৃত প্লাবনভূমি ও জোয়ারভূমিকে নদী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ধ্বংস করা হয়েছে।

এর ফলে অতীতে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ছোট-বড় নদী, নালা, ছড়া, খাল, প্রাকৃতিক বিল, ঝিল, হাওর, বাঁওড় ও দীঘি—যেগুলোতে বর্ষাকালে নদীর অতিরিক্ত পানি ঢুকে জমা থাকত এবং শীতকালে সারা দেশের পানির জোগান দিত, সেগুলোকে বেষ্টনী দিয়ে দিয়ে ভরাট ও ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে মাটির নিচের ভূগর্ভস্থ পানির রিচার্জ বন্ধ হয়েছে এবং শুষ্ক মৌসুমে প্রাকৃতিক উপায়ে নদীতে পানি আসার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে।

প্রকৃতির দেওয়া বাংলাদেশের দুটি সবচেয়ে বড় স্বাভাবিক জলাধার হলো—দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুবিশাল হাওর অঞ্চল এবং উত্তরবঙ্গের ঐতিহাসিক চলন বিল। গবেষকদের নথিপত্র অনুযায়ী, একসময় একা চলন বিলের আয়তনই ছিল ১ হাজার ৮৫ বর্গকিলোমিটার। কিন্তু এই বিলে যাতে নদী বা বর্ষার পানি সহজে ঢুকতে না পারে, সে জন্য সরকারি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বিলের পেটের ভেতর অন্তত ৮টি কৃত্রিম পোল্ডার নির্মাণ করেছে এবং খাল-নদীর মুখে অজস্র স্লুইসগেট ও রেগুলেটর বসিয়ে পুরো ব্যবস্থাটি ধ্বংস করেছে। পাউবোর এই ভুল নীতির কারণে চলন বিলের স্বাভাবিক চরিত্র আজ ধ্বংস হয়ে গেছে; বর্ষায় এর আয়তন কমে মাত্র ১৬৮ বর্গকিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে তা নামমাত্র ৫২ থেকে ৭৮ বর্গকিলোমিটারে এসে ঠেকেছে। অথচ এই চলন বিল একসময় বর্ষায় যমুনা ও গঙ্গার পানির ভারসাম্য বজায় রাখত এবং শীতকালে পুরো এলাকার নদীতে পানিপ্রবাহ ধরে রাখত। একইভাবে ১৯৫৫ সালে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হাওর অঞ্চলের পরিধি যেখানে ছিল প্রায় ২৩২.৭০ বর্গকিলোমিটার, ২০১৫ সালে তা ৫৫.৪ শতাংশ কমে মাত্র ১০৩.৬০ বর্গকিলোমিটারে এসে পৌঁছেছে।

ব্যারাজের মরীচিকা সরকারের জন্য বুমেরাং হতে পারে:
অতএব, কৃত্রিম ব্যারাজ নির্মাণ করে কোনো সমাধান আসবে না। বাংলাদেশের বর্ষার পানি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে তা শীতকালে ব্যবহারের একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত উপায় হলো—সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা সমস্ত প্রাকৃতিক জলাধার, খাল, বিল ও হাওরকে পুনরুজ্জীবিত করা। এই লক্ষ্য অর্জনে গত সাত দশকের ভুল ‘বেষ্টনী নীতি’ সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে নদ-নদীর স্বাভাবিক ও উন্মুক্ত নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্লাবনভূমি ও নদীর মুক্ত প্রবাহের পথে যে হাজার হাজার কৃত্রিম বাধা, অপ্রয়োজনীয় পোল্ডার ও বাঁধ তৈরি করা হয়েছে, তা অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে।

প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজের নিজস্ব সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ দিয়ে পানি আটকে রাখা সত্ত্বেও বর্ষাকালে বাংলাদেশে গঙ্গার পানির উচ্চতা হার্ডিঞ্জ সেতুর নিচে ১২ থেকে ১৪ মিটার পর্যন্ত উঠে যায়। এত বিপুল পানি থাকা সত্ত্বেও তা কেন বর্ষাকালে স্বাভাবিকভাবে গড়াই-মধুমতী নদী দিয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হতে পারছে না—সেই আসল বাধা ও প্রতিবন্ধকতাগুলো খুঁজে বের করে দ্রুত সমাধান করাই এখন সরকারের সবচেয়ে জরুরি কাজ। কৃত্রিম ব্যারাজের পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় না করে পাউবো যদি এসব বাস্তব সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দেয়, তবেই দেশের প্রকৃত মঙ্গল সাধিত হবে। অন্যথায়, কাজের কাজ না করে ব্যারাজের পেছনে ছুটে অবাস্তব মরীচিকা সৃষ্টি করা হলে, তা দীর্ঘমেয়াদে বর্তমান সরকারের জন্য রাজনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে একটি বড় বুমেরাং হয়ে দেখা দেবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইয়েমেনে অবরোধ না তুললে সৌদি আরামকোতে হামলার হুঁশিয়ারি হুথিদের

বাংলাদেশে ব্যারাজ কি মরীচিকা? প্রস্তাবিত প্রকল্প নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ

আপডেট সময় : ০৯:১৯:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বড় ধরনের ব্যারাজ নির্মাণ ও এর মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে নীতিনির্ধারণী ও জনপরিসরে কিছু বড় ধরনের বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি উচ্চমহল থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে যে, প্রস্তাবিত ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে বর্ষাকালের বিপুল নদীপ্রবাহ কার্যকরভাবে ধরে রাখা সম্ভব হবে এবং সেই সঞ্চিত পানি শুষ্ক শীতকালে ব্যবহার করা যাবে। সম্প্রতি মালয়েশিয়া সফরকালে নতুন গঠিত সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এই একই ধারণার কথা ব্যক্ত করেছেন। এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, তিনি এই সংক্রান্ত ধারণা মূলত প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের মূল প্রবক্তাদের উপস্থাপনা এবং এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ‘সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন’ (Feasibility Report) থেকেই লাভ করেছেন।

তবে সেই সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনে দেওয়া গাণিতিক হিসাব-নিকাশই সরাসরি প্রমাণ করে দেয় যে, বর্ষার পানি ধরে রেখে শীতকালে ব্যবহারের এই সরকারি ধারণাটি একেবারেই সঠিক নয়। প্রকল্পের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, পাবনার পাংশাতে ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে পানির উচ্চতা সর্বোচ্চ ১২.৫ মিটার পর্যন্ত রাখা সম্ভব হবে। এর ফলে রাজশাহীর পাংখা থেকে শুরু করে রাজবাড়ীর পাংশা পর্যন্ত বাংলাদেশের গঙ্গা নদীতে মোট জমাকৃত সঞ্চিত পানির পরিমাণ দাঁড়াবে আনুমানিক ২৮৯ কোটি ঘনমিটার।

অন্যদিকে আমরা সবাই জানি যে, বর্ষাকালে বাংলাদেশে গঙ্গা নদীর মোট পানি প্রবাহের আনুমানিক পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৮৮০ কোটি ঘনমিটার। অর্থাৎ প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজ যে বিপুল সর্বোচ্চ পানি সঞ্চয় করতে সক্ষম হবে (২৮৯ কোটি ঘনমিটার), তা আসলে বাংলাদেশে গঙ্গার মোট বর্ষাকালীন পানি প্রবাহের মাত্র ১.০৪ শতাংশ ছাড়া আর কিছুই নয়!

বিষয়টিকে আরও সহজ ও পরিষ্কার গাণিতিক হিসাবে দেখা যেতে পারে। গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের মূল সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যারাজের সাহায্যে গঙ্গার পানির সার্বিক উচ্চতা বৃদ্ধি করে বাংলাদেশের গঙ্গার মোট পাঁচটি শাখা নদী এবং দুটি আলাদা পাম্পহাউসে সর্বমোট গড়ে ২ হাজার ৭৬৮ কিউমেক পানি সরবরাহ করার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এর বিবরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—গঙ্গার ডান পাশের হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদীতে ৩২৭ কিউমেক, ভেড়ামারা পাম্পহাউসে ৯৩ কিউমেক, ঐতিহ্যবাহী গড়াই-মধুমতীতে ২ হাজার ১০৮ কিউমেক এবং চন্দনা-বারসিয়া নদীতে ৩০০ কিউমেক; অন্যদিকে গঙ্গার বাঁ পাশের গোদাগাড়ী পাম্পহাউসে ৪০ কিউমেক, বড়াল নদীতে ২১ কিউমেক এবং ইছামতী নদীতে ১৫.৫ কিউমেক পানি প্রবাহিত করা হবে। এখন হিসাব হলো, শুধু যদি প্রস্তাবিত ব্যারাজের সঞ্চিত পানি (২৮৯ কোটি ঘনমিটার) থেকে এই নির্ধারিত হারে পানি সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয়, তবে মাত্র সাড়ে সাত দিনের (৭.৫ দিন) মধ্যে জমা থাকা পুরো পানি একেবারে শূন্য বা নিঃশেষিত হয়ে যাবে। কাজেই এটি দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে, প্রস্তাবিত ব্যারাজের মাধ্যমে গঙ্গার বিভিন্ন শাখা ও পাম্পহাউসে যা পানি দেওয়া হবে, তা মূলত গঙ্গার প্রতিদিনের চলতি প্রবাহ থেকেই দেওয়া হবে, জমানো সঞ্চিত পানি থেকে একেবারেই নয়।

পাংশায় গঙ্গার পানি আধাআধি ভাগ হবে:
প্রকল্পের মূল বাস্তবায়ন প্রতিবেদনের সরকারি হিসাব মতে, শুষ্ক মৌসুমে (নভেম্বর থেকে মে) উল্লিখিত সাতটি অভিমুখে প্রবাহিত মোট পানির পরিমাণ ধরা হয়েছে ১ হাজার ২১০ কিউমেক। একই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা আছে যে, ১৯৯৭ থেকে ২০১০ সালের সময়কালে এই নির্দিষ্ট শুষ্ক মাসগুলোতে বাংলাদেশে গঙ্গার স্বাভাবিক গড় প্রবাহের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬৯৪ কিউমেক। এর অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট—শুষ্ক মৌসুমে যেটুকু পানি ভারতের ফারাক্কা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে, তার প্রায় অর্ধেক (৪৫ শতাংশ) গোয়ালন্দের মূল গতিপথের দিকে আর যেতে পারবে না। এ কারণেই প্রকল্পের অফিশিয়াল সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনে দেখা যায়, পাংশার উজানে গঙ্গার পানির উচ্চতা ১২.৫ মিটার রাখা হলেও ভাটির অংশে সেই পানির উচ্চতা আশঙ্কাজনকভাবে ২ মিটারের নিচে নেমে যায়।

অর্থাৎ বিষয়টিকে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ফারাক্কা পয়েন্টে যেমন শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আধাআধি ভাগ হয়ে যায়, ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের ভেতরে পাংশা পয়েন্টে বাকি অবশিষ্ট পানিটুকু উজান ও ভাটি এলাকার মধ্যে আধাআধি বিভক্ত হবে। এই কঠোর ও কঠিন বৈজ্ঞানিক সত্যকে কোনোভাবেই এড়ানোর সুযোগ নেই। (এ বিষয়ে বিষদ জানতে ১৯ মে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট পানিবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামানের সাক্ষাৎকার দ্রষ্টব্য)।

ব্যারাজ নিয়ে ‘মির্যাজ’ বা মরীচিকা:
ব্যারাজ তৈরির মাধ্যমে পদ্মার বর্ষাকালীন গতিপ্রবাহ ধরে রেখে তা শীতকালে সংকটকালে ব্যবহার করা যাবে—এটি মূলত একটি কাল্পনিক লোককথা বা মিথ (Myth), যার সাথে বাস্তবতার রূপান্তর বিন্দুমাত্র নেই। এই অবাস্তব বয়ানের মধ্য দিয়ে ব্যারাজের মূল কাজের উদ্দেশ্য নিয়ে একটি বড় মরীচিকা বা ‘মির্যাজ’ (Mirage) তৈরি করা হচ্ছে, যা বাস্তবে কখনোই অর্জন করা সম্ভব নয়।

এই অবাস্তব মরীচিকার বিষয়টি প্রস্তাবিত দ্বিতীয় তিস্তা ব্যারাজের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। এই নতুন ব্যারাজের প্রস্তাবটি সম্পূর্ণ আকস্মিক ও নতুন। ডালিয়াতে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব তিস্তা ব্যারাজ থাকা সত্ত্বেও কেন আবার নতুন একটি ব্যারাজ নির্মাণ করতে হবে এবং কোথায় তা করা হবে, তা কারোর কাছে স্পষ্ট নয়। তবে এই নতুন ব্যারাজ যদি তৈরিও করা হয়, এর মূল কাজ হবে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের কেবল ভৌগোলিক দিক রূপান্তর করা—কোনোভাবেই বর্ষার পানি সঞ্চয় করে শীতকালের পানির স্বল্পতা দূর করা নয়।

মূলত এই সাধারণ প্রাকৃতিক বিষয়টি বোঝার জন্য জটিল কোনো গাণিতিক হিসাবের প্রয়োজন পড়ে না। আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে ভারতের তৈরি ফারাক্কা ও গজলডোবা ব্যারাজের সুদীর্ঘ ও তিক্ত অভিজ্ঞতা। ব্যারাজ দিয়ে যদি বর্ষার পানিকে শীতের জন্য ধরে রাখা যেত, তবে ভারতের ওই ব্যারাজগুলোর কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের গঙ্গা ও তিস্তায় পানির এমন চরম অভাব দেখা দেয় কেন?

আমাদের নিজস্ব ডালিয়ায় নির্মিত তিস্তা ব্যারাজের অভিজ্ঞতাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। ব্যারাজ যদি শীতের জন্য পানি জমা রাখতে পারত, তবে ডালিয়া থেকে চিলমারী পর্যন্ত বিস্তৃত তিস্তা নদীতে শীতের দিনে বিন্দুমাত্র পানি থাকে না কেন? কেন তিস্তা আজ পানিশূন্য হয়ে মারাত্মক সংকটে এবং কেনই বা তিস্তা রক্ষার জন্য কোটি কোটি টাকার ‘মহাপরিকল্পনা’র কথা বলতে হচ্ছে?

কাপ্তাই বাঁধ ও কৃত্রিম হ্রদের বাস্তব অভিজ্ঞতা:
প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী, এক ঋতুর বিশাল পানি অন্য ঋতুতে ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত বড় আয়তনের কৃত্রিম হ্রদের প্রয়োজন পড়ে, যা সাধারণত সাধারণ ব্যারাজের বদলে বড় বাঁধ (Dam) নির্মাণের মাধ্যমে তৈরি হয়। বাংলাদেশে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের কাপ্তাই বাঁধ এর অন্যতম প্রধান উদাহরণ। এই বাঁধের মাধ্যমে সৃষ্ট কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদের মোট আয়তন ৬৮৮ বর্গকিলোমিটার এবং এতে প্রায় ৬৪৮ কোটি ঘনমিটার পানি জমানো সম্ভব, যা প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজের পরিকল্পনা করা জলাধারের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি (২২৪ শতাংশ)। অন্যদিকে বাংলাদেশে গঙ্গা নদীর ১১ হাজার ৫০০ কিউমেকের তুলনায় কর্ণফুলী নদীর গড় বার্ষিক প্রবাহ মাত্র ১ হাজার ৯০১ কিউমেক, অর্থাৎ গঙ্গার ৬ ভাগের ১ ভাগ মাত্র।

সুতরাং, নদীর প্রবাহ ও পানি জমার অনুপাতের হিসাবে প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজের ধারণক্ষমতার তুলনায় কাপ্তাই হ্রদের ক্ষমতা প্রায় ১৩.৬ গুণ বেশি। যে কারণে কাপ্তাই হ্রদ কিছুটা হলেও বর্ষার পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে ছাড়তে পারে। কিন্তু দিনে দিনে পলি জমার কারণে সেই কাপ্তাইয়ের ধারণক্ষমতাও এখন চরম সংকটে। ১৯৯০-এর দশকেই পলি জমে কাপ্তাইয়ের ২৫ শতাংশ ধারণক্ষমতা নষ্ট হয়েছিল। গত ৩০ বছরে তা আরও অন্তত ২৫ শতাংশ কমে গেছে বলে স্পষ্ট অনুমান করা যায়। ফলে এত বড় অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও শীতকালে কর্ণফুলী নদীতে স্বাভাবিক প্রবাহ ২০০ কিউমেকের নিচে নেমে যায়। এতে কাপ্তাইয়ের জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে মাত্র ৪০ মেগাওয়াটে নেমে আসে এবং অনেক সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়। ভবিষ্যতে একসময় কাপ্তাই বাঁধকে অপসারণ করার মতো কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, অন্যথায় পলি জমে নদী বাঁধের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার মতো মারাত্মক বিপদ ডেকে আনবে। একই নিয়মে প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজের উজানেও দ্রুত পলি জমে পানি ধরে রাখার সক্ষমতা ক্রমান্বয়ে ধ্বংস হবে, উজানে নদীর পাড় ভাঙন প্রবল হবে এবং নদী অপ্রয়োজনীয়ভাবে চওড়া হয়ে ভূমি গ্রাস করবে।

ভাটি এলাকার ওপর ব্যারাজের মারাত্মক ধ্বংসাত্মক প্রভাব:
যেহেতু প্রস্তাবিত ব্যারাজ রাজবাড়ীর পাংশায় গঙ্গার প্রবাহকে সরাসরি দুটি ভাগে বিভক্ত করে ফেলবে, সেহেতু এই অবকাঠামোর কারণে ভাটি অঞ্চলে কী ধরনের ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটবে, তা পর্যালোচনা করা প্রকল্পের প্রবক্তাদের নৈতিক দায়িত্ব ছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রকল্পের মূল সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনে কেবল উজানের ইতিবাচক দিকের কাল্পনিক বিবরণ দেওয়া হয়েছে এবং ভাটির মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবকে পুরোপুরি অবহেলা ও উপেক্ষা করা হয়েছে।

সংক্ষেপে ভাটি অঞ্চলের ওপর এই ব্যারাজের ৫টি মূল বিধ্বংসী প্রভাব স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়:
১. ভাটির অংশে গঙ্গা, পদ্মা এবং এসবের সাথে যুক্ত প্রধান শাখা নদীগুলোর শুষ্ক মৌসুমের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাচীন কুমার, ইছামতী এবং বিশেষ করে আড়িয়াল খাঁ নদী, যা পুরো বরিশাল বিভাগের মূল পানির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে।
২. ভাটির নদীগুলোতে ঋতুভিত্তিক পানির বৈষম্য চরম রূপ নেবে। কারণ শুষ্ক মৌসুমে নদী থাকবে পানিশূন্য, অথচ বর্ষায় বিশাল পানি এসে প্লাবিত করবে।
৩. প্রবাহের এই তীব্র ঋতুভেদের কারণে পুরো নদী খাতের ভৌগোলিক আকৃতি সম্পূর্ণ বিকৃত হয়ে যাবে। শুষ্ক মৌসুমে নদীজুড়ে বিশাল চরাঞ্চল জেগে গভীরতা হারাবে, আর বর্ষায় সেই একই নদী তীরের হাজার হাজার একর জমি গ্রাস করে চওড়া হবে। ডালিয়া থেকে চিলমারী পর্যন্ত তিস্তা নদী এর জ্বলন্ত প্রমাণ।
৪. শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার ফলে পুরো বরিশাল বিভাগ এবং মেঘনা মোহনার বিশাল অঞ্চলে সাগরের ক্ষতিকর লবণাক্ততার প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যাবে।
৫. প্রস্তাবিত ব্যারাজের উজানভাগে প্রয়োজনীয় পলি ও পলি-বালু আটকে পড়ার দরুন দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মেঘনা মোহনায় নতুন রূপের প্রাকৃতিক বদ্বীপ (Delta) গঠনের চিরন্তন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।

ভাটি অঞ্চলের ওপর ব্যারাজের এই নেতিবাচক প্রভাব যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, আমাদের প্রতিবেশী ভারতের ফারাক্কা ও গজলডোবা ব্যারাজই তার সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রমাণ এবং বাংলাদেশ নিজে তার প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী। এমন পরিস্থিতিতে একটি একপেশে ও অসম্পূর্ণ সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে কীভাবে দেশের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (NEC) এই বিতর্কিত ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদন প্রদান করে, তা সত্যি চরম বিস্ময়ের সৃষ্টি করে।

বর্ষাকালের পানি ধরে রাখার প্রকৃত বাস্তবসম্মত বিকল্প:
প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক বিচারে বিশাল আকৃতির কৃত্রিম হ্রদ ছাড়া বর্ষার বিপুল পানি সঞ্চয় করে তা শীতকালে ব্যাপকভাবে কাজে লাগানোর কোনো সাধারণ প্রযুক্তিগত সুযোগ নেই। তবে বাংলাদেশকে রক্ষায় একটিমাত্র প্রাকৃতিক উপায় খোলা রয়েছে—আর তা হলো, পুরো বাংলাদেশকে একটি বিশাল ‘বিচ্ছুরিত প্রাকৃতিক হ্রদ’ (Diffused lake) হিসেবে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, গত প্রায় সাত দশক ধরে বিদেশি পরামর্শক ও বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাসমূহের প্রভাবে বাংলাদেশ মূলত এই স্বাভাবিক পথের ঠিক বিপরীত দিকে হেঁটেছে। নদ-নদীকে বিভিন্ন কৃত্রিম বাঁধ বা বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে ফেলার ভুল নীতির কারণে দেশের বিস্তৃত প্লাবনভূমি ও জোয়ারভূমিকে নদী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ধ্বংস করা হয়েছে।

এর ফলে অতীতে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ছোট-বড় নদী, নালা, ছড়া, খাল, প্রাকৃতিক বিল, ঝিল, হাওর, বাঁওড় ও দীঘি—যেগুলোতে বর্ষাকালে নদীর অতিরিক্ত পানি ঢুকে জমা থাকত এবং শীতকালে সারা দেশের পানির জোগান দিত, সেগুলোকে বেষ্টনী দিয়ে দিয়ে ভরাট ও ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে মাটির নিচের ভূগর্ভস্থ পানির রিচার্জ বন্ধ হয়েছে এবং শুষ্ক মৌসুমে প্রাকৃতিক উপায়ে নদীতে পানি আসার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে।

প্রকৃতির দেওয়া বাংলাদেশের দুটি সবচেয়ে বড় স্বাভাবিক জলাধার হলো—দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুবিশাল হাওর অঞ্চল এবং উত্তরবঙ্গের ঐতিহাসিক চলন বিল। গবেষকদের নথিপত্র অনুযায়ী, একসময় একা চলন বিলের আয়তনই ছিল ১ হাজার ৮৫ বর্গকিলোমিটার। কিন্তু এই বিলে যাতে নদী বা বর্ষার পানি সহজে ঢুকতে না পারে, সে জন্য সরকারি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বিলের পেটের ভেতর অন্তত ৮টি কৃত্রিম পোল্ডার নির্মাণ করেছে এবং খাল-নদীর মুখে অজস্র স্লুইসগেট ও রেগুলেটর বসিয়ে পুরো ব্যবস্থাটি ধ্বংস করেছে। পাউবোর এই ভুল নীতির কারণে চলন বিলের স্বাভাবিক চরিত্র আজ ধ্বংস হয়ে গেছে; বর্ষায় এর আয়তন কমে মাত্র ১৬৮ বর্গকিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে তা নামমাত্র ৫২ থেকে ৭৮ বর্গকিলোমিটারে এসে ঠেকেছে। অথচ এই চলন বিল একসময় বর্ষায় যমুনা ও গঙ্গার পানির ভারসাম্য বজায় রাখত এবং শীতকালে পুরো এলাকার নদীতে পানিপ্রবাহ ধরে রাখত। একইভাবে ১৯৫৫ সালে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হাওর অঞ্চলের পরিধি যেখানে ছিল প্রায় ২৩২.৭০ বর্গকিলোমিটার, ২০১৫ সালে তা ৫৫.৪ শতাংশ কমে মাত্র ১০৩.৬০ বর্গকিলোমিটারে এসে পৌঁছেছে।

ব্যারাজের মরীচিকা সরকারের জন্য বুমেরাং হতে পারে:
অতএব, কৃত্রিম ব্যারাজ নির্মাণ করে কোনো সমাধান আসবে না। বাংলাদেশের বর্ষার পানি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে তা শীতকালে ব্যবহারের একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত উপায় হলো—সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা সমস্ত প্রাকৃতিক জলাধার, খাল, বিল ও হাওরকে পুনরুজ্জীবিত করা। এই লক্ষ্য অর্জনে গত সাত দশকের ভুল ‘বেষ্টনী নীতি’ সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে নদ-নদীর স্বাভাবিক ও উন্মুক্ত নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্লাবনভূমি ও নদীর মুক্ত প্রবাহের পথে যে হাজার হাজার কৃত্রিম বাধা, অপ্রয়োজনীয় পোল্ডার ও বাঁধ তৈরি করা হয়েছে, তা অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে।

প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজের নিজস্ব সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ দিয়ে পানি আটকে রাখা সত্ত্বেও বর্ষাকালে বাংলাদেশে গঙ্গার পানির উচ্চতা হার্ডিঞ্জ সেতুর নিচে ১২ থেকে ১৪ মিটার পর্যন্ত উঠে যায়। এত বিপুল পানি থাকা সত্ত্বেও তা কেন বর্ষাকালে স্বাভাবিকভাবে গড়াই-মধুমতী নদী দিয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হতে পারছে না—সেই আসল বাধা ও প্রতিবন্ধকতাগুলো খুঁজে বের করে দ্রুত সমাধান করাই এখন সরকারের সবচেয়ে জরুরি কাজ। কৃত্রিম ব্যারাজের পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় না করে পাউবো যদি এসব বাস্তব সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দেয়, তবেই দেশের প্রকৃত মঙ্গল সাধিত হবে। অন্যথায়, কাজের কাজ না করে ব্যারাজের পেছনে ছুটে অবাস্তব মরীচিকা সৃষ্টি করা হলে, তা দীর্ঘমেয়াদে বর্তমান সরকারের জন্য রাজনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে একটি বড় বুমেরাং হয়ে দেখা দেবে।