ঢাকা ০২:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক চ্যালেঞ্জ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৫৯:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

দক্ষিণ এশিয়া ভৌগোলিকভাবে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল। এই অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় দুই বিলিয়নেরও বেশি মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য, পুষ্টি ও মৌলিক জীবিকার সঙ্গে কৃষি খাত সরাসরি সম্পর্কিত। অথচ আশঙ্কাজনক জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি ক্রমাগত হ্রাস পাওয়া, মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা কমে যাওয়া, তীব্র পানির সংকট, সার্বিক উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধি এবং দুর্বল বাজার ব্যবস্থার মতো নানা জটিল কারণে খাদ্য নিরাপত্তা আজ এক মারাত্মক আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা বলতে কেবল বাজারে সাধারণ খাদ্যের প্রাপ্যতাই বোঝায় না; বরং পর্যাপ্ত নিরাপদ, পুষ্টিকর, সাশ্রয়ী ও গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য সুনিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই খাদ্যের মোট উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও শতভাগ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এখনো এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। চাষাবাদে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও ক্ষতিকর কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, উৎপাদনস্থল থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় খাদ্যের নিরাপত্তা বারবার মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় ‘উত্তম কৃষি চর্চা’ (GAP) কঠোরভাবে অনুসরণ করা এখন আর কেবল কোনো বিকল্প নয়, বরং একবারে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। জমি প্রস্তুতকরণ, সঠিক ও মানসম্মত বীজ নির্বাচন, পরিমিত সুষম সার প্রয়োগ, নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবস্থাপনা, সময়োপযোগী সেচ, ফসল সংগ্রহ, বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ—প্রতিটি ধাপে আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুসরণ করলে একদিকে যেমন বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজারে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিপণ্যের বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হবে।

বর্তমান বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত দক্ষিণ এশিয়াতেই সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, ক্ষণে ক্ষণে আকস্মিক বন্যা, উপকূলীয় লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং বায়ুমণ্ডলের অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি কৃষিকে চরম অনিশ্চিত করে তুলছে। ফলে জলবায়ু সহনশীল উন্নত নতুন জাত উদ্ভাবন, উচ্চতর গবেষণা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে কৃষি প্রযুক্তি বিনিময় এখন সময়ের দাবি। একটি দেশে উদ্ভাবিত কোনো সফল প্রযুক্তি বা সহনশীল জাত দ্রুত অন্য বন্ধুরাষ্ট্রে সম্প্রসারণ করা গেলে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা অনেক বেশি স্থিতিশীল হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী কৃষির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো মাটির সার্বিক স্বাস্থ্য। বছরের পর বছর অনিয়ন্ত্রিত কেমিক্যাল সার ব্যবহারের ফলে বহু অঞ্চলের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে, পুষ্টির প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং জমির প্রকৃত উৎপাদনশীলতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। তাই নিয়মিত মাটি পরীক্ষা, মাটির রূপভিত্তিক সার সুপারিশ, জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা সুনিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। মাটির প্রকৃত স্বাস্থ্য জেনে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করলে চাষির উৎপাদন খরচ বহুগুণ কমবে, ফলন বাড়বে এবং সার্বিক পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।

একইভাবে সঠিক পানি ব্যবস্থাপনাও খাদ্য নিরাপত্তার মূল শর্ত। দক্ষিণ এশিয়ার বহু কৃষি প্রধান এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে, আবার কোথাও কোথাও অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা ফসল বিনষ্ট করছে। তাই ড্রিপ ও স্প্রিংঙ্কলার সেচের মতো আধুনিক প্রযুক্তি, পানি সাশ্রয়ী কৃষি পদ্ধতি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে দক্ষ পানি ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এতে উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা সহজ হবে।

অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশকের প্রভাবে খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের অবশিষ্ঠান (Residual Effects) থেকে যায়, যা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। এ থেকে মুক্তি পেতে কৃষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM), জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সরকারি কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা হলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের সাফল্য আসবে।

খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি শক্তিশালী দক্ষিণ এশিয়ান ভ্যালু চেইন (South Asian Value Chain) গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে মাঠ পর্যায়ের মূল কৃষক ও শেষ ভোক্তার মাঝখানে দীর্ঘ ও অসাধু বিপণন ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকায় উৎপাদক কৃষক সঠিক মূল্য পান না, আবার ভোক্তাকেও চড়া দাম দিতে হয়। তাই আধুনিক হিমাগার, কোল্ড চেইন পরিবহন, মানসম্মত আধুনিক প্যাকেজিং, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, ই-কমার্স ও সীমান্ত বাণিজ্য সহজীকরণ করা গেলে কৃষিপণ্যের অপচয় বহুলাংশে কমবে এবং ক্ষুদ্র কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে।

বাজারমূল্যের (Market Price) স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও খাদ্য নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কৃষক যদি উৎপাদনের পর ফসলের ন্যায্য মূল্য না পান, তবে তিনি ভবিষ্যতে উৎপাদনে চরম আগ্রহ হারাবেন; অন্যদিকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তার খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকিতে ফেলে। তাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি বাজার দর প্রকাশ, অগ্রিম মূল্য পূর্বাভাস, চুক্তিভিত্তিক আধুনিক বিপণন এবং আঞ্চলিক বাজার সমন্বয় অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।

আজকের আধুনিক বিশ্বে কৃষি এখন আর কেবল ঐতিহ্যগত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয় না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), রিমোট সেন্সিং, স্যাটেলাইট উপাত্ত, কৃষি ড্রোন প্রযুক্তি এবং বিগ ডেটার সঠিক ব্যবহার কৃষিকে এক নতুন দিগন্তে নিয়ে যাচ্ছে। মাটির স্বাস্থ্য স্বয়ংক্রিয় বিশ্লেষণ, রোগ-পোকার আগাম উপস্থিতি শনাক্তকরণ, আবহাওয়ার নিখুঁত পূর্বাভাস এবং সুনির্দিষ্ট সেচ ব্যবস্থাপনা কৃষিকে বহুগুণ নিরাপদ করে তুলতে পারে।

সার্কভুক্ত (SAARC) দেশগুলোর উচিত আধুনিক প্রযুক্তির যৌথ গবেষণা, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ এবং ব্যবহারের ক্ষেত্র প্রসারে দ্রুত একটি টেকসই আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা। একই সাথে দক্ষিণ এশিয়ার মূল চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সক্ষমতা না বাড়ালে সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই প্রান্তিক চাষিদের জন্য সহজ শর্তে কৃষিঋণ, শস্য বীমা, আধুনিক প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল কৃষি সেবা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি কৃষিতে নারী ও নতুন প্রজন্মের তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রশাসনিক রূপরেখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে, দক্ষিণ এশিয়ার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি পরিবেশবান্ধব, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সহযোগিতামূলক কৃষি ব্যবস্থার ওপর। এখনকার সময় একক প্রতিযোগিতার নয়, বরং পারস্পরিক অংশীদারিত্বের; বিচ্ছিন্ন কোনো প্রচেষ্টার নয়, বরং সমন্বিত আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনার। খাদ্য নিরাপত্তা কোনো একক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, কারণ রোগবালাই, সাইক্লোন কিংবা বাজারের অস্থিরতা ভৌগোলিক সীমানা মানে না। একটি শক্তিশালী ‘দক্ষিণ এশীয় কৃষি সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম’ গড়ে তুলতে সার্কভুক্ত দেশগুলোর কার্যকর সমন্বয় ও সমঝোতা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

মানবতাবিরোধী অপরাধ: মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার দেখাল ট্রাইব্যুনাল, জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি

দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় : ১২:৫৯:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়া ভৌগোলিকভাবে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল। এই অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় দুই বিলিয়নেরও বেশি মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য, পুষ্টি ও মৌলিক জীবিকার সঙ্গে কৃষি খাত সরাসরি সম্পর্কিত। অথচ আশঙ্কাজনক জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি ক্রমাগত হ্রাস পাওয়া, মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা কমে যাওয়া, তীব্র পানির সংকট, সার্বিক উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধি এবং দুর্বল বাজার ব্যবস্থার মতো নানা জটিল কারণে খাদ্য নিরাপত্তা আজ এক মারাত্মক আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা বলতে কেবল বাজারে সাধারণ খাদ্যের প্রাপ্যতাই বোঝায় না; বরং পর্যাপ্ত নিরাপদ, পুষ্টিকর, সাশ্রয়ী ও গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য সুনিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই খাদ্যের মোট উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও শতভাগ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এখনো এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। চাষাবাদে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও ক্ষতিকর কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, উৎপাদনস্থল থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় খাদ্যের নিরাপত্তা বারবার মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় ‘উত্তম কৃষি চর্চা’ (GAP) কঠোরভাবে অনুসরণ করা এখন আর কেবল কোনো বিকল্প নয়, বরং একবারে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। জমি প্রস্তুতকরণ, সঠিক ও মানসম্মত বীজ নির্বাচন, পরিমিত সুষম সার প্রয়োগ, নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবস্থাপনা, সময়োপযোগী সেচ, ফসল সংগ্রহ, বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ—প্রতিটি ধাপে আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুসরণ করলে একদিকে যেমন বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজারে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিপণ্যের বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হবে।

বর্তমান বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত দক্ষিণ এশিয়াতেই সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, ক্ষণে ক্ষণে আকস্মিক বন্যা, উপকূলীয় লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং বায়ুমণ্ডলের অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি কৃষিকে চরম অনিশ্চিত করে তুলছে। ফলে জলবায়ু সহনশীল উন্নত নতুন জাত উদ্ভাবন, উচ্চতর গবেষণা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে কৃষি প্রযুক্তি বিনিময় এখন সময়ের দাবি। একটি দেশে উদ্ভাবিত কোনো সফল প্রযুক্তি বা সহনশীল জাত দ্রুত অন্য বন্ধুরাষ্ট্রে সম্প্রসারণ করা গেলে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা অনেক বেশি স্থিতিশীল হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী কৃষির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো মাটির সার্বিক স্বাস্থ্য। বছরের পর বছর অনিয়ন্ত্রিত কেমিক্যাল সার ব্যবহারের ফলে বহু অঞ্চলের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে, পুষ্টির প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং জমির প্রকৃত উৎপাদনশীলতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। তাই নিয়মিত মাটি পরীক্ষা, মাটির রূপভিত্তিক সার সুপারিশ, জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা সুনিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। মাটির প্রকৃত স্বাস্থ্য জেনে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করলে চাষির উৎপাদন খরচ বহুগুণ কমবে, ফলন বাড়বে এবং সার্বিক পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।

একইভাবে সঠিক পানি ব্যবস্থাপনাও খাদ্য নিরাপত্তার মূল শর্ত। দক্ষিণ এশিয়ার বহু কৃষি প্রধান এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে, আবার কোথাও কোথাও অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা ফসল বিনষ্ট করছে। তাই ড্রিপ ও স্প্রিংঙ্কলার সেচের মতো আধুনিক প্রযুক্তি, পানি সাশ্রয়ী কৃষি পদ্ধতি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে দক্ষ পানি ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এতে উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা সহজ হবে।

অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশকের প্রভাবে খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের অবশিষ্ঠান (Residual Effects) থেকে যায়, যা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। এ থেকে মুক্তি পেতে কৃষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM), জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সরকারি কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা হলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের সাফল্য আসবে।

খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি শক্তিশালী দক্ষিণ এশিয়ান ভ্যালু চেইন (South Asian Value Chain) গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে মাঠ পর্যায়ের মূল কৃষক ও শেষ ভোক্তার মাঝখানে দীর্ঘ ও অসাধু বিপণন ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকায় উৎপাদক কৃষক সঠিক মূল্য পান না, আবার ভোক্তাকেও চড়া দাম দিতে হয়। তাই আধুনিক হিমাগার, কোল্ড চেইন পরিবহন, মানসম্মত আধুনিক প্যাকেজিং, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, ই-কমার্স ও সীমান্ত বাণিজ্য সহজীকরণ করা গেলে কৃষিপণ্যের অপচয় বহুলাংশে কমবে এবং ক্ষুদ্র কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে।

বাজারমূল্যের (Market Price) স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও খাদ্য নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কৃষক যদি উৎপাদনের পর ফসলের ন্যায্য মূল্য না পান, তবে তিনি ভবিষ্যতে উৎপাদনে চরম আগ্রহ হারাবেন; অন্যদিকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তার খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকিতে ফেলে। তাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি বাজার দর প্রকাশ, অগ্রিম মূল্য পূর্বাভাস, চুক্তিভিত্তিক আধুনিক বিপণন এবং আঞ্চলিক বাজার সমন্বয় অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।

আজকের আধুনিক বিশ্বে কৃষি এখন আর কেবল ঐতিহ্যগত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয় না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), রিমোট সেন্সিং, স্যাটেলাইট উপাত্ত, কৃষি ড্রোন প্রযুক্তি এবং বিগ ডেটার সঠিক ব্যবহার কৃষিকে এক নতুন দিগন্তে নিয়ে যাচ্ছে। মাটির স্বাস্থ্য স্বয়ংক্রিয় বিশ্লেষণ, রোগ-পোকার আগাম উপস্থিতি শনাক্তকরণ, আবহাওয়ার নিখুঁত পূর্বাভাস এবং সুনির্দিষ্ট সেচ ব্যবস্থাপনা কৃষিকে বহুগুণ নিরাপদ করে তুলতে পারে।

সার্কভুক্ত (SAARC) দেশগুলোর উচিত আধুনিক প্রযুক্তির যৌথ গবেষণা, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ এবং ব্যবহারের ক্ষেত্র প্রসারে দ্রুত একটি টেকসই আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা। একই সাথে দক্ষিণ এশিয়ার মূল চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সক্ষমতা না বাড়ালে সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই প্রান্তিক চাষিদের জন্য সহজ শর্তে কৃষিঋণ, শস্য বীমা, আধুনিক প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল কৃষি সেবা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি কৃষিতে নারী ও নতুন প্রজন্মের তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রশাসনিক রূপরেখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে, দক্ষিণ এশিয়ার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি পরিবেশবান্ধব, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সহযোগিতামূলক কৃষি ব্যবস্থার ওপর। এখনকার সময় একক প্রতিযোগিতার নয়, বরং পারস্পরিক অংশীদারিত্বের; বিচ্ছিন্ন কোনো প্রচেষ্টার নয়, বরং সমন্বিত আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনার। খাদ্য নিরাপত্তা কোনো একক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, কারণ রোগবালাই, সাইক্লোন কিংবা বাজারের অস্থিরতা ভৌগোলিক সীমানা মানে না। একটি শক্তিশালী ‘দক্ষিণ এশীয় কৃষি সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম’ গড়ে তুলতে সার্কভুক্ত দেশগুলোর কার্যকর সমন্বয় ও সমঝোতা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।