ঢাকা ০৪:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

বিসিএস-এর গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে দেশের মেধা: উচ্চশিক্ষার সংকট?

সকাল ৮টা বাজতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে দীর্ঘ লাইন। দূর থেকে মনে হতে পারে, তরুণ-তরুণীরা বুঝি গবেষণা, সাহিত্য বা নতুন জ্ঞানের সন্ধানে ভিড় জমিয়েছে। তবে কাছে গেলেই চোখে পড়ে এক ভিন্ন বাস্তবতা। অধিকাংশের হাতেই গবেষণাপত্র নয়, মোটা মোটা বিসিএস প্রিলিমিনারি গাইড। এই দৃশ্য শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, পাবলিক লাইব্রেরিসহ দেশের প্রায় সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই এক পরিচিত ছবি। অনার্সের প্রথম বর্ষে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই অনেক শিক্ষার্থীর একাডেমিক লক্ষ্যকে ছাপিয়ে যায় সরকারি চাকরির প্রস্তুতি। যে বয়সে তাদের উদ্ভাবন, গবেষণা, দক্ষতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার কথা, সেই সময়ের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে মুখস্থনির্ভর একটি প্রতিযোগিতার পেছনে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়; এটি আমাদের উচ্চশিক্ষা, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন।

বাংলাদেশের সমাজে বিসিএস এখন আর শুধু একটি চাকরি নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা, নিরাপদ ও সুখময় ভবিষ্যৎ জীবনের প্রতীক। একজন মানুষকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এখনো পদমর্যাদাই প্রধান মানদণ্ড। করপোরেট খাত, গবেষণা বা উদ্যোক্তা হিসেবে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও পারিবারিক আড্ডা থেকে শুরু করে বিয়ের বাজার—সবখানেই বিসিএস ক্যাডারের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলকভাবে বেশি। এই মানসিক ও সামাজিক চাপ অসংখ্য তরুণকে মুখস্থনির্ভর এই প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয়।

৪৫তম বিসিএসে আবেদন করেছিলেন প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার প্রার্থী। চূড়ান্তভাবে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার মিলিয়ে সুপারিশ পেয়েছেন মাত্র ২ হাজার ৩৫২ জন। ৪৬তম বিসিএসে ক্যাডার পদে সুপারিশ পেয়েছেন ১ হাজার ৪৫৭ জন। ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে ক্যাডার পদে সুপারিশপ্রাপ্তের সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ১ হাজার ৩২০ জন। অর্থাৎ, প্রতিটি বিসিএসে অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীর ৯৯.৫ শতাংশেরও বেশি শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেন না। বছরের পর বছর প্রস্তুতি, অনিশ্চয়তা ও প্রত্যাশার ভার বহন করে এই বিপুলসংখ্যক তরুণের বড় অংশ হতাশা, আত্মবিশ্বাসের সংকট এবং পেশাগত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন, যা দীর্ঘ মেয়াদে সমাজ ও অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক।

এই বিসিএসকেন্দ্রিক প্রবণতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে দেশের মেধা ও উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে। যখন একজন প্রকৌশলী, চিকিৎসক বা কৃষিবিজ্ঞানী নিজের বিশেষায়িত জ্ঞানচর্চা ছেড়ে প্রশাসন বা পুলিং-এর মতো ভিন্ন খাতে যেতে আগ্রহী হন, তখন তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে। উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জ্ঞানার্জন, গবেষণা ও নতুন কিছু সৃষ্টি করা, কিন্তু বিসিএস-এর মোহ অনেক সময় সেই পথ থেকে বিচ্যুত করে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন বহুমুখী পদক্ষেপ, যেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি সামাজিক মানসিকতায় পরিবর্তন আনা জরুরি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লোহাগাড়া প্রেস ইউনিটের নতুন কমিটি গঠিত: নুরুল আলম সভাপতি, সেলিম উদ্দীন সাধারণ সম্পাদক

বিসিএস-এর গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে দেশের মেধা: উচ্চশিক্ষার সংকট?

আপডেট সময় : ০১:৪১:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

সকাল ৮টা বাজতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে দীর্ঘ লাইন। দূর থেকে মনে হতে পারে, তরুণ-তরুণীরা বুঝি গবেষণা, সাহিত্য বা নতুন জ্ঞানের সন্ধানে ভিড় জমিয়েছে। তবে কাছে গেলেই চোখে পড়ে এক ভিন্ন বাস্তবতা। অধিকাংশের হাতেই গবেষণাপত্র নয়, মোটা মোটা বিসিএস প্রিলিমিনারি গাইড। এই দৃশ্য শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, পাবলিক লাইব্রেরিসহ দেশের প্রায় সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই এক পরিচিত ছবি। অনার্সের প্রথম বর্ষে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই অনেক শিক্ষার্থীর একাডেমিক লক্ষ্যকে ছাপিয়ে যায় সরকারি চাকরির প্রস্তুতি। যে বয়সে তাদের উদ্ভাবন, গবেষণা, দক্ষতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার কথা, সেই সময়ের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে মুখস্থনির্ভর একটি প্রতিযোগিতার পেছনে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়; এটি আমাদের উচ্চশিক্ষা, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন।

বাংলাদেশের সমাজে বিসিএস এখন আর শুধু একটি চাকরি নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা, নিরাপদ ও সুখময় ভবিষ্যৎ জীবনের প্রতীক। একজন মানুষকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এখনো পদমর্যাদাই প্রধান মানদণ্ড। করপোরেট খাত, গবেষণা বা উদ্যোক্তা হিসেবে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও পারিবারিক আড্ডা থেকে শুরু করে বিয়ের বাজার—সবখানেই বিসিএস ক্যাডারের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলকভাবে বেশি। এই মানসিক ও সামাজিক চাপ অসংখ্য তরুণকে মুখস্থনির্ভর এই প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয়।

৪৫তম বিসিএসে আবেদন করেছিলেন প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার প্রার্থী। চূড়ান্তভাবে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার মিলিয়ে সুপারিশ পেয়েছেন মাত্র ২ হাজার ৩৫২ জন। ৪৬তম বিসিএসে ক্যাডার পদে সুপারিশ পেয়েছেন ১ হাজার ৪৫৭ জন। ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে ক্যাডার পদে সুপারিশপ্রাপ্তের সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ১ হাজার ৩২০ জন। অর্থাৎ, প্রতিটি বিসিএসে অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীর ৯৯.৫ শতাংশেরও বেশি শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেন না। বছরের পর বছর প্রস্তুতি, অনিশ্চয়তা ও প্রত্যাশার ভার বহন করে এই বিপুলসংখ্যক তরুণের বড় অংশ হতাশা, আত্মবিশ্বাসের সংকট এবং পেশাগত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন, যা দীর্ঘ মেয়াদে সমাজ ও অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক।

এই বিসিএসকেন্দ্রিক প্রবণতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে দেশের মেধা ও উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে। যখন একজন প্রকৌশলী, চিকিৎসক বা কৃষিবিজ্ঞানী নিজের বিশেষায়িত জ্ঞানচর্চা ছেড়ে প্রশাসন বা পুলিং-এর মতো ভিন্ন খাতে যেতে আগ্রহী হন, তখন তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে। উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জ্ঞানার্জন, গবেষণা ও নতুন কিছু সৃষ্টি করা, কিন্তু বিসিএস-এর মোহ অনেক সময় সেই পথ থেকে বিচ্যুত করে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন বহুমুখী পদক্ষেপ, যেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি সামাজিক মানসিকতায় পরিবর্তন আনা জরুরি।