একসময় যেখানে বছরের অধিকাংশ সময় জমি পড়ে থাকত অনাবাদি, আজ সেখানে সবুজে ছেয়ে গেছে মাঠ। উচ্ছে, টমেটো, বাঁধাকপি, লাউ, মরিচ, ঢেঁড়স, পালংশাকসহ নানা ধরনের সবজিতে ভরে উঠেছে ক্ষেত। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার হাটছালা, দেওল ও শংকরকাটি গ্রামের এই বদলে যাওয়ার গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন একজন মানুষ—কৃষক মনোতোষ মণ্ডল।
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এই জনপদের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নোনা পানির চুনা খাল। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে একসময় এখানে বছরে একটি ফসলের বেশি ফলানো প্রায় অসম্ভব ছিল। কৃষকেরা ধীরে ধীরে চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন। সেই পরিস্থিতিতেই শুরু হয় মনোতোষ মণ্ডলের সংগ্রাম।
শুরুটা ছিল ছোট, স্বপ্ন ছিল বড়
প্রায় তিন দশক আগে নিজের বাড়ির আঙিনায় সীমিত পরিসরে শাক-সবজি চাষ শুরু করেন মনোতোষ। কিন্তু লবণাক্ত মাটিতে সবজি উৎপাদন সহজ ছিল না। বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ব্যর্থতা ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে খুঁজে বের করেন উপকূলীয় কৃষির নতুন পথ।
তিনি জানান, স্থানীয় মাটিতে সবজি ফলানো সম্ভব না হওয়ায় পাশের কালীগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর এলাকা থেকে ট্রলিতে করে উর্বর মাটি এনে জমি উঁচু করেন। এরপর শুরু করেন সবজির চাষ।
কিন্তু সামনে আসে আরেক বড় বাধা—সেচের পানি। চারপাশে শুধু লবণাক্ত পানি। সমাধান হিসেবে তিনি জমি কেটে পুকুর তৈরি করেন এবং সেখানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ শুরু করেন। সেই সংরক্ষিত মিষ্টি পানিই হয়ে ওঠে তার কৃষি বিপ্লবের ভিত্তি।
মনোতোষ মণ্ডল বলেন,
“সংরক্ষিত বৃষ্টির পানি দিয়েই আমাদের দিন বদলের শুরু। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।”
এখন বছরে লাখ টাকার লাভ
একসময় শাঁখা-পলা ফেরি করে বিক্রি করতেন মনোতোষ। পরে দেড় বিঘা জমিতে সবজি চাষ শুরু করে সাফল্য পান। ২০১৪ সাল থেকে আধুনিক পদ্ধতিতে বাণিজ্যিকভাবে সবজি উৎপাদন শুরু করেন।
বর্তমানে তার জমিতে বছরজুড়ে উৎপাদিত হয় উচ্ছে, আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, বেগুন, ঢেঁড়স, টমেটো, লাউ, বোম্বাই মরিচ, কাঁচামরিচ, লালশাক ও পালংশাকসহ বিভিন্ন সবজি।
সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে তার প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা লাভ হয়।
একজন কৃষকের হাত ধরে বদলে গেছে শতাধিক পরিবার
মনোতোষ মণ্ডল শুধু নিজের সাফল্যেই থেমে থাকেননি। নিজের অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিয়েছেন পুরো গ্রামে।
বর্তমানে হাটছালা গ্রামের অন্তত ১০০টি পরিবার বছরজুড়ে সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে। শুরুতে তিনি অনেক কৃষককে বিনামূল্যে বীজ দিয়েছেন, জমি প্রস্তুত থেকে পরিচর্যা পর্যন্ত হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং নিয়মিত পরামর্শ দিয়েছেন।
কৃষক শিবব্রত মণ্ডল বলেন,
“আগে সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। মনোতোষ দাদা আমাদের সবজি চাষে উৎসাহ দেন, বীজ দেন, নিয়মিত পরামর্শ দেন। আজ তার কারণেই দুই মেয়ের বিয়ে দিতে পেরেছি, বড় ছেলেকে প্রতিষ্ঠিত করেছি, ছোট ছেলে এখনও পড়াশোনা করছে।”
কৃষক প্রদীপ কুমার মণ্ডল বলেন,
“দুই বিঘা জমিতে উচ্ছে ও অন্যান্য সবজি চাষ করে গত বছর প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা আয় করেছি। সবই সম্ভব হয়েছে মনোতোষ দাদার শেখানো পদ্ধতিতে।”
আরেক কৃষক অনুপ মণ্ডলের ভাষায়,
“আগে বছরে একবার ধান চাষ করে জমি ফেলে রাখতাম। এখন নিজের জমিতেই কাজ করে ভালোভাবে সংসার চালাতে পারছি।”
এখনও বড় চ্যালেঞ্জ সেচের পানি
সাফল্যের পরও একটি বড় সমস্যা রয়ে গেছে—মিষ্টি পানির সংকট।
মনোতোষ মণ্ডল জানান, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করেও শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজন মেটানো যায় না। তখন পাশের গ্রাম থেকে বেশি দামে পানি কিনে আনতে হয়।
অনুপ মণ্ডল বলেন,
“গরমের সময় পুকুর শুকিয়ে গেলে পাইপ দিয়ে অন্য এলাকা থেকে পানি আনতে হয়। এতে খরচ ও শ্রম দুটোই বেড়ে যায়।”
কৃষক মকবুল মিয়ার মতে, এলাকায় স্থায়ী মিষ্টি পানির সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে উপকূলীয় কৃষিতে আরও বড় পরিবর্তন আসবে।
বছরে সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার সবজি
শ্যামনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়ালিউল ইসলাম জানান, হাটছালা গ্রামে প্রতিবছর প্রায় ১ হাজার ৩৮৪ মেট্রিক টন সবজি উৎপাদিত হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
তিনি বলেন,
“একজন সাধারণ কৃষকের স্বপ্ন, সাহস ও অধ্যবসায় কীভাবে একটি গ্রামের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, হাটছালা তার উজ্জ্বল উদাহরণ। উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকেরা এই মডেল অনুসরণ করলে কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।”
স্থানীয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শেখ লিয়াকত আলী বাবু বলেন,
“মনোতোষ মণ্ডল শুধু একজন সফল কৃষক নন, তিনি এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক। তার উদ্যোগেই হাটছালা গ্রামের কৃষিতে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে।”
রিপোর্টারের নাম 

























