ঢাকা ০৯:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

বঙ্গোপসাগরে সাবমেরিন মোতায়েনের পরিকল্পনা পাকিস্তানের, উদ্বেগে ভারতীয় গণমাধ্যম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

দীর্ঘ কয়েক দশক পর বঙ্গোপসাগরে পুনরায় সামরিক উপস্থিতি জোরদারের পরিকল্পনা করছে পাকিস্তান। ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চীনের সহযোগিতায় নির্মিত নতুন ‘হাঙ্গর’ শ্রেণির সাবমেরিন বহরকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান নৌবাহিনী এবার আরব সাগরের গণ্ডি পেরিয়ে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে তাদের কৌশলগত উপস্থিতি বিস্তারের উদ্যোগ নিয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি চীনে কমিশনপ্রাপ্ত পাকিস্তান নৌবাহিনীর ‘হাঙ্গর’ শ্রেণির একটি আধুনিক সাবমেরিন করাচি নৌঘাঁটিতে পৌঁছেছে। এ সাবমেরিনকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান নৌবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি সামুদ্রিক পরিকল্পনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পাকিস্তান নৌবাহিনী ভবিষ্যতে মোট আটটি হাঙ্গর শ্রেণির সাবমেরিন তাদের বহরে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, এই সাবমেরিনগুলো তাদের নৌবাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে এবং ভারত মহাসাগরসহ বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত অঞ্চলে কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

চীন থেকে পাকিস্তানে ফেরার পথে শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ ‘পিএনএস তৈমুর’-এ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তান নৌবাহিনীর বহর কমান্ডার কমোডর ওমর ফারুক নতুন সাবমেরিনটিকে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো বলছে, ইসলামাবাদ এখন কেবল উপকূলীয় প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; বরং আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিজেদের কৌশলগত উপস্থিতি আরও বিস্তৃত করতে চায়।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই পদক্ষেপ মূলত ভারত মহাসাগর অঞ্চলে নিজেদের সামুদ্রিক সক্ষমতা প্রদর্শনের অংশ। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নৌযান সংগ্রহের মাধ্যমে পাকিস্তান নৌবাহিনী নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।

তবে ভারতীয় সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের নতুন সাবমেরিন বহর তাৎক্ষণিকভাবে আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে না পারলেও এটি ভারতের জন্য একটি নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

বর্তমানে ভারতীয় নৌবাহিনী দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী নৌবাহিনী হিসেবে বিবেচিত। তাদের বহরে রয়েছে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন, বিমানবাহী রণতরী, আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং উন্নত সামুদ্রিক নজরদারি প্রযুক্তি। ফলে সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে ভারত এখনো পাকিস্তানের তুলনায় অনেক এগিয়ে রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো ১৯৭১ সালের একটি ঐতিহাসিক ঘটনারও উল্লেখ করেছে। সে সময় পাকিস্তানি সাবমেরিন ‘পিএনএস হাঙ্গর’ ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ ‘আইএনএস খুকরি’ ডুবিয়ে দিয়েছিল, যা ভারত-পাকিস্তান সামুদ্রিক সংঘাতের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ঘটনা। নতুন ‘হাঙ্গর’ শ্রেণির সাবমেরিন মোতায়েনের পরিকল্পনাকে সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তুলনা করে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো সম্ভাব্য নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রভাব নিয়ে আলোচনা করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগর বর্তমানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন, সমুদ্রসম্পদ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার কারণে এ অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে এখানে যেকোনো নতুন সামরিক উপস্থিতি বা নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নজর কাড়ছে।

যদিও পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গোপসাগরে সাবমেরিন মোতায়েনের নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করেনি, তবুও ভারতীয় গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী দেশটি দীর্ঘমেয়াদে এ অঞ্চলে সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। বিষয়টি ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার সামুদ্রিক ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

মিরসরাইয়ে ফুটবল খেলা নিয়ে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের সংঘর্ষ, আহত ২

বঙ্গোপসাগরে সাবমেরিন মোতায়েনের পরিকল্পনা পাকিস্তানের, উদ্বেগে ভারতীয় গণমাধ্যম

আপডেট সময় : ১১:৪১:০০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

দীর্ঘ কয়েক দশক পর বঙ্গোপসাগরে পুনরায় সামরিক উপস্থিতি জোরদারের পরিকল্পনা করছে পাকিস্তান। ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চীনের সহযোগিতায় নির্মিত নতুন ‘হাঙ্গর’ শ্রেণির সাবমেরিন বহরকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান নৌবাহিনী এবার আরব সাগরের গণ্ডি পেরিয়ে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে তাদের কৌশলগত উপস্থিতি বিস্তারের উদ্যোগ নিয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি চীনে কমিশনপ্রাপ্ত পাকিস্তান নৌবাহিনীর ‘হাঙ্গর’ শ্রেণির একটি আধুনিক সাবমেরিন করাচি নৌঘাঁটিতে পৌঁছেছে। এ সাবমেরিনকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান নৌবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি সামুদ্রিক পরিকল্পনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পাকিস্তান নৌবাহিনী ভবিষ্যতে মোট আটটি হাঙ্গর শ্রেণির সাবমেরিন তাদের বহরে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, এই সাবমেরিনগুলো তাদের নৌবাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে এবং ভারত মহাসাগরসহ বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত অঞ্চলে কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

চীন থেকে পাকিস্তানে ফেরার পথে শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ ‘পিএনএস তৈমুর’-এ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তান নৌবাহিনীর বহর কমান্ডার কমোডর ওমর ফারুক নতুন সাবমেরিনটিকে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো বলছে, ইসলামাবাদ এখন কেবল উপকূলীয় প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; বরং আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিজেদের কৌশলগত উপস্থিতি আরও বিস্তৃত করতে চায়।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই পদক্ষেপ মূলত ভারত মহাসাগর অঞ্চলে নিজেদের সামুদ্রিক সক্ষমতা প্রদর্শনের অংশ। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নৌযান সংগ্রহের মাধ্যমে পাকিস্তান নৌবাহিনী নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।

তবে ভারতীয় সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের নতুন সাবমেরিন বহর তাৎক্ষণিকভাবে আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে না পারলেও এটি ভারতের জন্য একটি নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

বর্তমানে ভারতীয় নৌবাহিনী দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী নৌবাহিনী হিসেবে বিবেচিত। তাদের বহরে রয়েছে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন, বিমানবাহী রণতরী, আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং উন্নত সামুদ্রিক নজরদারি প্রযুক্তি। ফলে সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে ভারত এখনো পাকিস্তানের তুলনায় অনেক এগিয়ে রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো ১৯৭১ সালের একটি ঐতিহাসিক ঘটনারও উল্লেখ করেছে। সে সময় পাকিস্তানি সাবমেরিন ‘পিএনএস হাঙ্গর’ ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ ‘আইএনএস খুকরি’ ডুবিয়ে দিয়েছিল, যা ভারত-পাকিস্তান সামুদ্রিক সংঘাতের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ঘটনা। নতুন ‘হাঙ্গর’ শ্রেণির সাবমেরিন মোতায়েনের পরিকল্পনাকে সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তুলনা করে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো সম্ভাব্য নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রভাব নিয়ে আলোচনা করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগর বর্তমানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন, সমুদ্রসম্পদ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার কারণে এ অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে এখানে যেকোনো নতুন সামরিক উপস্থিতি বা নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নজর কাড়ছে।

যদিও পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গোপসাগরে সাবমেরিন মোতায়েনের নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করেনি, তবুও ভারতীয় গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী দেশটি দীর্ঘমেয়াদে এ অঞ্চলে সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। বিষয়টি ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার সামুদ্রিক ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।