ঢাকা ০৭:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

বাংলাদেশে বাড়ছে পাঁচ ধরনের ক্যান্সার, উদ্বেগে চিকিৎসকরা

বাংলাদেশে প্রতিবছরই বাড়ছে ক্যান্সারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর এক লাখ ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে প্রাণ হারাচ্ছেন এক লাখ ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষ। চিকিৎসকদের মতে, বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বর্তমানে খাদ্যনালীর ক্যান্সার, মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সার, ফুসফুসের ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার এবং জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। পরিবেশ দূষণ, তামাক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

খাদ্যনালীর ক্যান্সারে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে খাদ্যনালীর ক্যান্সার। বর্তমানে প্রায় ৪২ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষ।

এই ক্যান্সারে মৃত্যুর সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি। প্রতি বছর প্রায় ২৪ হাজার মানুষ খাদ্যনালীর ক্যান্সারে মারা যাচ্ছেন, যা মোট ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সারে উদ্বেগ

আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সার। বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ এ রোগে ভুগছেন। প্রতিবছর নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন ১৬ হাজারের বেশি মানুষ।

চিকিৎসকদের মতে, জর্দা, গুল, খৈনি, পান-সুপারি এবং অন্যান্য তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের কারণে এই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছে।

ফুসফুসের ক্যান্সারে বাড়ছে মৃত্যু

ফুসফুসের ক্যান্সার দেশে অন্যতম প্রাণঘাতী রোগে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৭ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর নতুন রোগী যুক্ত হচ্ছেন প্রায় ১৩ হাজার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূমপানের পাশাপাশি ভয়াবহ বায়ুদূষণও ফুসফুসের ক্যান্সার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার দূষণ এবং নগরাঞ্চলের খারাপ বায়ুমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার শীর্ষে

নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে স্তন ক্যান্সার। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩৫ হাজার নারী এ রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রায় ১৩ হাজার নারী।

চিকিৎসকরা বলছেন, উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে তুলনামূলক কম বয়সী নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।

জরায়ুমুখের ক্যান্সারও বড় হুমকি

নারীদের মৃত্যুহারের দিক থেকে জরায়ুমুখের ক্যান্সার অন্যতম বড় সমস্যা। বর্তমানে প্রায় ২৬ হাজার নারী এই রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রায় সাড়ে নয় হাজার নারী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস সংক্রমণ, সচেতনতার অভাব এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করার কারণে এ রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

কেন বাড়ছে ক্যান্সার?

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ক্যান্সার বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • বায়ুদূষণ বৃদ্ধি
  • ধূমপান ও তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার
  • ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য
  • অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন
  • স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
  • পরিবেশগত দূষণ
  • নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করা
  • দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া

প্রতিরোধেই গুরুত্ব

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সারের একটি বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তামাক বর্জন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, দূষণ থেকে সুরক্ষা এবং সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।

এছাড়া স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং টিকাদান কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

তাদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই ক্যান্সার সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব। তাই দীর্ঘদিনের কাশি, গিলতে সমস্যা, মুখে ঘা, অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ বা শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জামালপুরে পুকুরে ডুবে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু, শোকস্তব্ধ এলাকাবাসী

বাংলাদেশে বাড়ছে পাঁচ ধরনের ক্যান্সার, উদ্বেগে চিকিৎসকরা

আপডেট সময় : ০৯:৩৬:২৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬

বাংলাদেশে প্রতিবছরই বাড়ছে ক্যান্সারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর এক লাখ ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে প্রাণ হারাচ্ছেন এক লাখ ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষ। চিকিৎসকদের মতে, বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বর্তমানে খাদ্যনালীর ক্যান্সার, মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সার, ফুসফুসের ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার এবং জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। পরিবেশ দূষণ, তামাক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

খাদ্যনালীর ক্যান্সারে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে খাদ্যনালীর ক্যান্সার। বর্তমানে প্রায় ৪২ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষ।

এই ক্যান্সারে মৃত্যুর সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি। প্রতি বছর প্রায় ২৪ হাজার মানুষ খাদ্যনালীর ক্যান্সারে মারা যাচ্ছেন, যা মোট ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সারে উদ্বেগ

আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সার। বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ এ রোগে ভুগছেন। প্রতিবছর নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন ১৬ হাজারের বেশি মানুষ।

চিকিৎসকদের মতে, জর্দা, গুল, খৈনি, পান-সুপারি এবং অন্যান্য তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের কারণে এই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছে।

ফুসফুসের ক্যান্সারে বাড়ছে মৃত্যু

ফুসফুসের ক্যান্সার দেশে অন্যতম প্রাণঘাতী রোগে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৭ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর নতুন রোগী যুক্ত হচ্ছেন প্রায় ১৩ হাজার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূমপানের পাশাপাশি ভয়াবহ বায়ুদূষণও ফুসফুসের ক্যান্সার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার দূষণ এবং নগরাঞ্চলের খারাপ বায়ুমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার শীর্ষে

নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে স্তন ক্যান্সার। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩৫ হাজার নারী এ রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রায় ১৩ হাজার নারী।

চিকিৎসকরা বলছেন, উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে তুলনামূলক কম বয়সী নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।

জরায়ুমুখের ক্যান্সারও বড় হুমকি

নারীদের মৃত্যুহারের দিক থেকে জরায়ুমুখের ক্যান্সার অন্যতম বড় সমস্যা। বর্তমানে প্রায় ২৬ হাজার নারী এই রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রায় সাড়ে নয় হাজার নারী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস সংক্রমণ, সচেতনতার অভাব এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করার কারণে এ রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

কেন বাড়ছে ক্যান্সার?

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ক্যান্সার বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • বায়ুদূষণ বৃদ্ধি
  • ধূমপান ও তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার
  • ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য
  • অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন
  • স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
  • পরিবেশগত দূষণ
  • নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করা
  • দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া

প্রতিরোধেই গুরুত্ব

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সারের একটি বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তামাক বর্জন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, দূষণ থেকে সুরক্ষা এবং সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।

এছাড়া স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং টিকাদান কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

তাদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই ক্যান্সার সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব। তাই দীর্ঘদিনের কাশি, গিলতে সমস্যা, মুখে ঘা, অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ বা শরীরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।