কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নসহ উপকূলীয় অঞ্চলে অপহরণ ও মানব পাচারের এক ভয়ংকর নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যা স্থানীয় জনজীবনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। গত এক বছরেই এই অঞ্চলে ৯৫টি অপহরণের ঘটনায় অন্তত ১৪০ জন অপহৃত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৮৬ জনই রোহিঙ্গা। অপরাধীরা পাহাড়ের গোপন আস্তানায় ভুক্তভোগীদের আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করছে এবং টাকা না পেলে তাদের সাগর পথে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডে পাচারের জন্য দালাল চক্রের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে। সম্প্রতি বাহারছড়ার পাহাড়ে তিনজনের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার এবং আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবিতে বহু মানুষ নিখোঁজের ঘটনায় এই আতঙ্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, পাহাড়ের ভেতরে বন্দিশালায় শত শত মানুষকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় এবং পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত বুধবার থেকে নৌবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে পাহাড়ে বিশেষ যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উখিয়া সার্কেল) রকিবুল হাসান জানিয়েছেন, বাহারছড়াসহ বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অপরাধীদের আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৯ বছরে এই উপকূল দিয়ে পাচারের শিকার ৩ হাজার ১৩৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং প্রায় ৬০০ পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মাদক চোরাচালান, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতার সুযোগে এই চক্রটি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বাহারছড়ার সাতটি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ এখন ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন; বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এই এলাকাগুলো জনশূন্য হয়ে পড়ে।
নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এই মানব পাচার ও অপহরণ চক্রের বিচার দ্রুত নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। বাহারছড়ার ইউপি সদস্য ফরিদ উল্লাহর মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত চেকপোস্ট স্থাপন এবং মাছ ধরার নৌযানগুলোর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা জরুরি। একইসাথে মেরিন ড্রাইভ সড়কে পর্যটকদের সন্ধ্যার পর একা চলাচল না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা আশ্বাস দিয়েছেন যে, পাচারকারীদের তালিকা ধরে দ্রুত তাদের আইনের মুখোমুখি করা হবে। তবে এলাকাবাসীর মতে, শুধুমাত্র সাময়িক অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা চৌকি ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ ছাড়া এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
রিপোর্টারের নাম 
























