রাজধানী ঢাকায় ছিনতাই ও চুরির মতো অপরাধে লিপ্ত হওয়া ব্যক্তিদের জন্য জেলখানা যেন এক ‘ডালভাত’ বা সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। মাত্র এক থেকে তিন মাসের ব্যবধানে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সপ্তাহের ব্যবধানে জামিনে বেরিয়ে এসে অপরাধীরা আবারও একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার দাপিয়ে বেড়ানো প্রায় ৮ হাজার ছিনতাইকারীর অর্ধেকেরও বেশি সদস্যের নামে ৫ থেকে ১১টি পর্যন্ত মামলা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সকালে জামিনে বেরিয়ে বিকালেই অপরাধ করার মতো দুঃসাহসী নজিরও দেখা যাচ্ছে।
অপরাধের পুনরাবৃত্তির প্রধান কারণসমূহ
বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, অপরাধীদের বারবার জামিনে বেরিয়ে আসার পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করছে:
- আইনি দুর্বলতা ও প্রমাণের অভাব: অনেক ক্ষেত্রে মামলার তদারকিতে উদাসীনতা এবং দুর্বল আইনি ধারায় চার্জশিট দাখিল করার ফলে অপরাধীরা সহজেই জামিন পেয়ে যায়।
- মাদকাসক্তি: অধিকাংশ ছিনতাইকারী মাদকাসক্ত। নেশার টাকা যোগাতে তারা জামিনে বের হওয়ার পরপরই দ্রুত অর্থ উপার্জনের পথ হিসেবে আবারও ছিনতাইকেই বেছে নেয়।
- পেশাদার আইনজীবীদের ভূমিকা: ছিনতাইকারী চক্রের অনেক সদস্যের নিজস্ব আইনজীবী থাকে, যারা দ্রুত জামিন নিশ্চিত করতে কাজ করে। তবে জামিনের পর আসামির গতিবিধি নজরদারিতে রাখার অঙ্গীকার আইনজীবীরা রক্ষা করেন না।
- পারিবারিক প্রশ্রয়: অনেক অপরাধীর পরিবার তাদের অপরাধলব্ধ আয় ভোগ করে এবং বারবার জামিন করিয়ে এনে তাদের অপরাধে উৎসাহ দেয়।
পরিসংখ্যান ও বর্তমান চিত্র
২০২৩ সাল থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত একটি চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
- ছিনতাইয়ের সময় হাতেনাতে গ্রেপ্তার হয়েছে ১,৮৪১ জন।
- একই সময়ে জামিন পেয়েছে ১,৭৮৬ জন।
- ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকাটি বর্তমানে এই ধরনের অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে, যেখানে গ্রেপ্তার ও জামিনের চক্রটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান।
নতুন পদক্ষেপ: থানায় সাপ্তাহিক হাজিরা
এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির একটি নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারিসহ পেশাদার অপরাধীরা জামিনে আসার পর তাদের ওপর নজরদারি রাখতে:
“এলাকাভিত্তিক তালিকা তৈরি করা হবে এবং জামিনে থাকা অপরাধীদের প্রতি সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট থানার ওসির কাছে হাজিরা দিতে হবে।”
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক এবং অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ মনে করেন, শুধু গ্রেপ্তার করলেই অপরাধ কমবে না। তদন্ত প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, পুলিশের দেওয়া আইনি ধারার সঠিক প্রয়োগ এবং আদালতের কাছে অপরাধের ভয়াবহতা সঠিকভাবে তুলে ধরতে হবে। এছাড়া অপরাধীদের সামাজিকভাবে পুনর্বাসন এবং পারিবারিক নজরদারি বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 






















