আল্পস পর্বতমালার বিশালতায় ঘেরা অস্ট্রিয়ার সালসকামার্গাট লেক জেলায় অবস্থিত হলস্ট্যাট গ্রামটি বিশ্বজুড়ে মানুষের কাছে এক চিরকালীন বিস্ময়। ৯ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের শান্ত হলস্ট্যাটারসি হ্রদের তীরে পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা এই গ্রামটিকে দেখলে মনে হয় যেন কোনো রূপকথার বই থেকে উঠে আসা এক পুতুলের রাজ্য। ট্রেনে করে হ্রদের পূর্ব তীরের স্টেশনে নেমে বোটের মাধ্যমে যখন পর্যটকরা এই জনপদে পৌঁছান, তখন পাহাড়ের অভিভাবকত্ব আর বারোক স্থাপত্যশৈলীর প্রাচীন কাঠের বাড়িগুলোর সৌন্দর্য তাদের মুগ্ধ করে। প্রতিটি বাড়ির বারান্দায় ঝোলানো রঙিন অর্কিড আর শীতকালে তুষারের সাদা চাদরে ঢাকা গির্জার চূড়া এই গ্রামটিকে পৃথিবীর বাইরের কোনো এক মায়াপুরীতে পরিণত করে। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো একে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

হলস্ট্যাটের বিশেষত্বের মূলে রয়েছে এর ৩,৫০০ বছরের পুরনো ইতিহাস। এটি কেবল সুন্দরের আধার নয়, বরং মানব সভ্যতার ব্রোঞ্জ যুগের সমাপ্তি ও লৌহ যুগের সূচনার সাক্ষী। এখানকার পাহাড়ী অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বের প্রাচীনতম লবণ খনিকে কেন্দ্র করেই এই জনপদ বিকশিত হয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে এখানে প্রাচীন ‘হলস্ট্যাট সংস্কৃতি’র খোঁজ পাওয়া গেছে, যেখানে লবণের খনির ভেতরে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের দেহাবশেষ ও পোশাক লবণের প্রাকৃতিক গুণে নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এখানকার সরু আঁকাবাঁকা গলি আর টিম্বার-ফ্রেমিং শৈলীর বাড়িগুলো পর্যটকদের সময় ভ্রমণের অনুভূতি দেয়। এছাড়া পাহাড়ের গভীরে থাকা ইউরোপের গভীরতম ম্যামথ কেভ এবং ডাশ্চটেইন বরফ গুহা এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

এই গ্রামের সৌন্দর্য এতটাই অতুলনীয় যে, ২০১২ সালে চীন ৯৪০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে তাদের দেশে হলস্ট্যাটের একটি হুবহু নকল সংস্করণ তৈরি করেছে। তবে আসল হলস্ট্যাটের আবেদন আজও অটুট। মাত্র ৮৫৯ জন স্থায়ী বাসিন্দার এই গ্রামে প্রতি বছর প্রায় দশ লক্ষাধিক পর্যটক ভিড় জমান। পর্যটকদের এই বিপুল চাপ সামাল দেওয়া স্থানীয়দের জন্য চ্যালেঞ্জিং হলেও, তারা অত্যন্ত যত্নে তাদের ঐতিহ্য ও নান্দনিকতাকে ধরে রেখেছেন। পর্যটনের জোয়ার আর আধুনিকতার ছোঁয়া থাকলেও হলস্ট্যাট আজও ইতিহাসের প্রতি যত্ন এবং মানুষের উন্নত নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির এক অনন্য নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হ্রদের জলে পাহাড়ের স্থির ছায়া আর গলি পথে ফুটে থাকা ফুলের ঘ্রাণে ঘেরা এই গ্রামটি আসলে মানুষের তৈরি এক জীবন্ত স্বপ্নের নাম।
রিপোর্টারের নাম 

























