“ও বাপ আবু, একটু আস্তে কোপা রে বাপ। ওদের যে বড্ড লাগে রে।” বারান্দায় বসে হাঁকিয়ে বললেন ফজিলা বানু। আবু কুড়াল চালানো থামিয়ে উত্তর দেয়, “কী যে কও চাচি, গাছের আবার লাগে?” ফজিলা বানু হেসে বলেন, “গাছ দুটোর উপর তোমার বড্ড মায়া আছে গো চাচি। তাই তোমার এমন মনে হইচ্চি।”
গাছের গোড়ায় আবার সজোরে কুড়াল চালায় আবু হোসেন। গাছ কোপানোর শব্দটা যেন তীরের মতো এসে বিঁধছে বৃদ্ধা ফজিলার বুকে। প্রথমে ডালপালা কেটে ন্যাড়া করা হলো। এরপর একের পর এক কুড়ালের কোপ বসানো হচ্ছে গাছের গোড়ায়। চোখের সামনে গাছ দুটো কাটতে দেখে বুকটা দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে যাচ্ছিল ফজিলার। ঘরের বারান্দা থেকে বের হয়ে উঠানে এসে দাঁড়ান তিনি। লাঠিতে ভর দিয়ে কাঁপতে থাকেন অনবরত। কাঁপতে কাঁপতে বলেন, “বাপরে, তোদের কাছে ওদুটো গাছ হইলেও আমার কাছে ওরা রাসুর মতোই সন্তান রে। রসুর চেয়ে ওরা কম না রে বাপ।”
এতটুকু বলে কেঁদে ফেলেন ফজিলা। লাঠিটা পাশে রেখে ঝিক ভেঙে পড়া মাটির চুলোর পাশে বসে পড়েন। একা একা বকতে শুরু করেন। শতেক ছেঁড়া ময়লা কাপড়ের আঁচলটা টেনে চোখ মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করেন। একা থাকা মানুষগুলো হঠাৎ কাউকে পেলে জীবনের গল্প খুলে বসে। সংসারের জীবনের ছবিগুলো যেন বায়োস্কোপের মতো ভেসে ওঠে চোখের পর্দায়। চোখ মেলে দেখে আর নিখুঁত বর্ণনা করে সেই কেচ্ছা। তখন এই সংসারটার ছিল ভরা যৌবন। এই তো সেদিনের কথা, রসু যেদিন জন্ম নিল তখন টনটনা দুপুরের রোদ। চৈত্র মাসের মেঘভাঙা রোদে বুকের ছাতি ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়ার উপক্রম। হাসেম আলী ভোরের আলো ফোটার আগেই শফি মণ্ডলের ধানক্ষেতে কাজ করছিল। পাশের বাড়ির হারেসের বউ স্বামীর জন্য খাবার নিয়ে গিয়েছিল। সেইসঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল রসুর জন্ম নেওয়ার খবরটা। ছেলে হওয়ার খবর পেয়ে রাস্তার তপ্ত ধুলো মাড়িয়ে টান পায়ে বাড়ি ছুটে এলো ছেলের মুখখানি দেখবে বলে। সংসারে বাতি জ্বালানোর প্রথম সন্তান এসেছে তার। খুশিতে আটখানা হয়ে তখনই ছুটে যায় মোকামে। দু কেজি রসগোল্লা কিনে ফেরার পথে সেগুন বাগান থেকে দুটো শিকড় তুলে নিয়ে আসে সঙ্গে। রসুর দাদি গোল্লার ভাঁড়টা হাতে নিয়ে বলেছিল, ‘পাগল ছেলের কাণ্ড দেখ, এই রোদে মদ্দে গাছ লাগালি হবে? তাও আবার সেগুন গাছ। পানির অভাবে মানুষ মরে খুন হইছে, আর পাগলটা লাগাবে গাছ।’ হাসেম বারান্দা থেকে শাবলটা নিয়ে হাসতে হাসতে বলে, ‘লিশ্চয় হবে, মা। সকাল-বিকাল পানি দিলে লিশ্চয় হবে।’
রিপোর্টারের নাম 

























