ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বৃহৎ পরিসরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ভোটদানের আয়োজন করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর ফলে প্রবাসীদের মধ্যে যেমন ভোট নিয়ে উৎসাহ বাড়ছে, তেমনি নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের আশঙ্কাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে আচরণবিধি সঠিকভাবে কার্যকর করতে নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থাটির ভূমিকা কেমন হবে, সেই প্রশ্নটি সামনে এসেছে। দেশের ভেতরে আচরণবিধি মানানোর ক্ষেত্রে ইসির শক্তিশালী আইনি ভিত্তি রয়েছে, যেখানে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধি এবং অন্যান্য আইন প্রয়োগ করা হয়। তবে বিদেশে কোন আইনের ভিত্তিতে এই নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাছাড়া, নির্বাচন কমিশন এই বিষয়ে প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক প্রচার চালানোরও কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তাই বিদেশের মাটিতে নির্বাচনী আচরণবিধি ভাঙার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে দেশের রাজনীতিতে নির্বাচনের আমেজ শুরু হয়েছে, যা সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও বারবার উল্লেখ করছেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রবাসীদের মধ্যেও এ নিয়ে আগ্রহ ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, জনশক্তি ব্যুরো, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি-বায়রাসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে দেখেছে যে ৪০টি দেশে বাংলাদেশি প্রবাসীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। এই দেশগুলোকে ঘিরেই তাদের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দেশগুলো হলো—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন, লেবানন, জর্ডান, লিবিয়া, সুদান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, ইতালি, হংকং, মিশর, ব্রুনাই, মৌরিশাস, ইরাক, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, গ্রীস, স্পেন, জার্মানী, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, ব্রাজিল, চীন, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, নিউজিল্যান্ড, রাশিয়া, তুরস্ক ও সাইপ্রাস।
এই দেশগুলোতে মোট ১ কোটি ৪০ লাখ ৪৬ হাজার ৫৩৪ জন প্রবাসী বসবাস করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী রয়েছেন সৌদি আরবে (৪০ লাখ ৪৯ হাজার ৫৮৮ জন) এবং সবচেয়ে কম নিউজিল্যান্ডে (২ হাজার ৫০০ জন)। ইসি ধারণা করছে, এদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটারের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) আছে। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ প্রবাসী ভোটারের কাছ থেকে সাড়া পাওয়া যাবে বলে তারা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, “বিভিন্ন দেশে ঠিক কত সংখ্যক প্রবাসী রয়েছেন, তার সঠিক হিসাব নেই। প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর সাথে কথা বলে আমরা জেনেছি ১ কোটি ৩০ লাখের মতো বা তার কিছু বেশি প্রবাসী আছেন। এদের মধ্যে অন্তত ৭০ শতাংশ বাংলাদেশির এনআইডি আছে। সেই হিসাবে ৫০ লাখের মতো ভোটারকে পাবো বলে আশা করছি। যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে প্রবাসী ভোটের হার সাধারণত ২০ থেকে ২২ শতাংশের মতো হয়।”
ইসি কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, বর্তমানে আইনে বিদেশের মাটিতে অফলাইনে বা অনলাইনে প্রচার চালানোর বিষয়ে দলগুলোর জন্য কোনো বিধিনিষেধ নেই। ফলে দলগুলো তাদের প্রবাসী শাখাগুলোকে ব্যবহার করে প্রচার চালাবে। আর এই প্রচার চালাতে গেলেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়াও, অনলাইন প্রচারে বিদ্বেষ ছড়ানোর বিষয়টিও সামনে আসতে পারে। বিশেষ করে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক অপপ্রচার দুষ্কৃতকারীদের জন্য একটি হাতিয়ার হতে পারে।
নির্বাচন কমিশন বলছে, তারা এআই ভিত্তিক অপপ্রচার নিষিদ্ধ করেছে। এটি লঙ্ঘন হলে দল ও প্রার্থীর শাস্তি হতে পারে। অফলাইনে বা সরাসরি আচরণবিধি ভাঙলেও সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এ বিষয়ে বলেন, “এআই ব্যবহার করে যেকোনো ধরনের মিথ্যাচার বা অপবাদ ছড়ানো ইত্যাদি ব্যাপারে প্রার্থী, দল, সংস্থা, মিডিয়া সংস্থা—সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান আইনে রাখা হয়েছে। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা, শুধু বাংলাদেশের একার নয়।”
জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “আমরা আরপিওতে এবং আচরণ বিধিমালাতেও একটি বিষয় যুক্ত করেছি যে, অনলাইনে বা অফলাইনে যেকোনো ধরনের অপপ্রচারই হোক না কেন, তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে। এছাড়া, বিদেশের মাটিতেও কেউ যদি সহিংসতায় জড়িয়ে যায়, বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি প্রবাসীদের মধ্যে নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারবেন। তবে যদি অন্য প্রার্থীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়, তবে তাকে শাস্তির আওতায় আনা যাবে। এক্ষেত্রে দেশে ও দেশের বাইরে আইনের প্রয়োগ একই হবে।”
এছাড়া, কেউ যদি সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে যায়, তবে তার বিরুদ্ধেও দেশের প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। যদি সংশ্লিষ্ট দেশের প্রচলিত আইনে অপরাধীর বিচার হয়, তবে দেশে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার পক্ষে অন্য কেউ নির্বাচন কমিশন বা পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন।
নির্বাচনে অসৎ উদ্দেশ্যে প্রার্থী, তার এজেন্ট বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার করলে ইসি তাদের প্রার্থিতা বাতিল করে দেবে। একই সাথে জেল-জরিমানা হতে পারে। শুধু প্রার্থীর নয়, দলের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে
রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় ১৬ নম্বর বিধি সংযোজন করে বলা হয়েছে:
কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারবেন। তবে প্রচার শুরুর আগে রিটার্নিং অফিসারের কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম, একাউন্ট আইডি, ই-মেইল আইডিসহ অন্যান্য শনাক্তকরণ তথ্য দাখিল করতে হবে।
প্রচার-প্রচারণাসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করা যাবে না।
ঘৃণা ছড়ানোর মতো বক্তব্য, ভুল তথ্য, কারও চেহারা বিকৃত করা এবং নির্বাচন সংক্রান্ত বানোয়াট তথ্যসহ সকল প্রকার ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করা যাবে না।
প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য কোনো গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না।
নির্বাচনী সুবিধা পাওয়ার জন্য ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা যাবে না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচন সংক্রান্ত সকল কনটেন্ট শেয়ার ও প্রকাশ করার আগে সত্যতা যাচাই করতে হবে।
রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে, কিংবা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কোনো প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্র হনন বা সুনাম নষ্ট করার উদ্দেশ্যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে, সাধারণভাবে বা সম্পাদননা করে কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ এবং মানহানিকর কোনো আধেয় (কনটেন্ট) তৈরি, প্রকাশ, প্রচার ও শেয়ার করতে পারবেন না।
নির্বাচন পূর্ব সময়ে (তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ পর্যন্ত) বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তির অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা অনধিক এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
একই সময়ে কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এই বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে অনধিক এক লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে।
এছাড়াও, কমিশন যদি মনে করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সংগঠিত অপরাধ প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার মতো, তাহলে তদন্ত করে প্রার্থিতাও বাতিল করতে পারবে।
প্রবাসে আচরণবিধি প্রতিপালনে প্রচারের উদ্যোগের অভাব
নির্বাচন কমিশন গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নির্বাচন আচরণবিধি পালনের বিষয়ে দেশের ভেতরে প্রচার চালিয়ে থাকে। প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কেউ কী করতে পারবেন, মূলত সেই প্রচারই করা হয়। তবে প্রবাসীদের ভোটের আয়োজন করলেও এই বিষয়ে কোনো প্রচারের উদ্যোগ ইসির ভাবনায় নেই।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ এই প্রসঙ্গে বলেন, “এটি একটি ভালো উদ্যোগ হতে পারে। যেহেতু প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের জন্য বড় আকারে ভোটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, বিষয়টি বিবেচনায় আনা উচিত। এ নিয়ে কমিশন সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।”
কমিশন ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে তফসিল ঘোষণা করে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভোটগ্রহণের কথা ভাবছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে ভোটার নিবন্ধনের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে ইসি। সামনে প্রবাসীরা যেন ভোট দেয়, সেজন্য ব্যাপক প্রচারের পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি।
আগামী নভেম্বরে প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার জন্য অনলাইন নিবন্ধনের ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপটি ইসি তৈরি করে ফেলবে। এরপরই প্রবাসীদের নিবন্ধনের জন্য প্রচার শুরু হবে। এক্ষেত্রে তারা ওই অ্যাপের মাধ্যমে নিজের এনআইডি নম্বর, বর্তমান ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করবেন।
যারা নিবন্ধন করবেন, তাদের জন্য সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় প্রবাসীদের পৃথক ভোটার তালিকা তৈরি করা হবে। তফসিল ঘোষণার পর সেই তালিকা অনুযায়ী পোস্টাল ব্যালট ছাপানো হবে। সেই ব্যালটে শুধু দলগুলোর প্রতীক থাকবে, কোনো প্রার্থীর নাম থাকবে না। কারণ প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার আগে কারও নাম ব্যালটে ছাপানো যায় না। আবার প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পর ব্যালট পাঠানোর জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া যাবে না। এছাড়া, মামলার রায়ে কেউ প্রার্থিতা পেলে নতুন করে ব্যালট ছাপাতে হতে পারে। তাই আগেই প্রার্থীর নাম ছাড়া ব্যালট ছাপানো হবে এবং সেই ব্যালট প্রবাসীর দেওয়া ঠিকানায় ডাক বিভাগের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে প্রার্থিতা চূড়ান্ত হলে অনলাইনে নিবন্ধনকারী ভোটারের মোবাইলে মেসেজ দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হবে—আপনি অনলাইনে গিয়ে আপনার এলাকার চূড়ান্ত প্রার্থীদের তালিকা দেখুন এবং পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকে ভোট দিন। সেই মেসেজ পেয়ে প্রবাসী ভোটার তার ভোটটি দিয়ে ডাকযোগে পাঠিয়ে দেবেন।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ এ বিষয়ে জানান, “ডাক বিভাগ জানিয়েছে সবচেয়ে দূরের দেশে একটি চিঠি পাঠাতে এবং আনতে ২৮ দিন লাগে। তাই দেশের ভোটারদের আগেই প্রবাসী ভোটাররা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন।” এজন্য দেশে বিদেশে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার চালানো হবে।
ইসি সচিব আরও বলেন, “যাদের এনআইডি আছে, শুধু তারাই এই সুযোগ পাবেন। কারণ এনআইডি ছাড়া নিবন্ধন করার সুযোগ থাকবে না।”
রিপোর্টারের নাম 


















