ঢাকা ০৭:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

স্মৃতির পাতায় ফেলে আসা নববর্ষ

পহেলা বৈশাখ এলেই কেমন যেন নস্টালজিক হয়ে যাই। মনে হয় আমার বয়সি যারা, তাদের অনেকেই বোধ হয় এ ধরনের স্মৃতিকাতরতায় ভোগেন। শৈশবে পহেলা বৈশাখের আনন্দ, চৈত্র সংক্রান্তি, নববর্ষের হালখাতা উৎসব—সবকিছুই একই সঙ্গে স্মৃতির পর্দায় ভেসে ওঠে।

নববর্ষের আগমনী বার্তা শুরু হতো চৈত্রের শেষদিকে। চারদিকে এক সাজসাজ রব দেখা যেত। ধর্মবিশ্বাস যার যাই থাকুক না কেন, চৈত্রের শেষে সবার বাড়িঘর চমৎকারভাবে মাটি দিয়ে নিকানোর ব্যবস্থা কেউ অমান্য করার সাহস দেখাত না। ফলে চৈত্রের শেষ দিনের আগেই সারা বাড়িঘর ও উঠোন একেবারে ঝকঝকে ও তকতকে হয়ে যেত। নিকোনো উঠোনের সোঁদা গন্ধ একদিকে যেমন ফেলে আসা বছরের স্মৃতির আবহে ভরপুর করে রাখত, তেমনি অন্যদিকে নতুন বছরের নতুন সম্ভাবনার ছায়া রেখাপাত করত। পাড়ার সব বাড়িঘর নিকোনো, ঝকঝকে ও তকতকে থাকত। সবচেয়ে সুন্দর লাগত সাঁওতালদের বাড়ি। আল্পনার রঙিন ছোঁয়ায় তাদের বাড়িঘর এবং প্রকৃতি হয়ে উঠত জীবন্ত।

বিপত্তিটা হতো চৈত্র মাসের শেষ দিনে, অর্থাৎ ত্রিশে চৈত্র। বাড়িতে দাদা-দাদি-নানা-নানি থাকলে তো কথাই নেই। সেই কাকভোরে তারা বসে থাকতেন দহলিজে। তাদের সামনে দিয়েই যেতে হতো পুকুরে গোসল করতে। গোসল শেষে তাদের সামনে দিয়েই ফিরতে হতো। ফেরার সময় তারা হাতে ধরিয়ে দিতেন কাঁচা হলুদ। তাদের সামনেই এটা খেতে হতো। বিস্বাদ কাঁচা হলুদ খেলেই যে শেষ হতো না, এরপর যা ধরিয়ে দিতেন এখনো শরীর শিউরে ওঠে এর তেতো স্বাদের কথা মনে পড়লে। এদিন বাড়ির মুরুব্বিরা পেঁয়াজ-রসুন একসঙ্গে বেঁধে পাকঘরের কোণে ঝুলিয়ে দিতেন। পুরোনো শিমগাছ, লাউগাছ ও বেগুনগাছ—সবই ফেলে দেওয়া হতো। এ যেন নতুনের আবাহনে পুরোনোকে বিসর্জন দেওয়ার এক মহোৎসব। নাশতা হতো চাল আর কলাই ভাজা দিয়ে। সঙ্গে সংগতি ভেদে থাকত নারকেল।

দুপুর হলেই বয়স্করা জাল, পলো নিয়ে ছুটতেন বাড়ির পাশের বিলে অথবা নদীতে। সবাই মিলে মাছ ধরার সেই দৃশ্য এখন শুধু কল্পনাই করা যায়। মাছ ধরার পর সব মাছ একত্র করে গ্রামের সব বাড়ির জন্য ভাগ করে দেওয়া হতো, উপস্থিত-অনুপস্থিত নির্বিশেষে। আনন্দকে ভাগ করে নেওয়ার এই ঐতিহ্য এখন হারিয়ে গেছে। গাঁয়ের সাঁওতালরা দল বেঁধে তির-ধনুক নিয়ে ছুটতেন গ্রামের জঙ্গলে। বেলা শেষে বেরিয়ে আসত বেজি, খরগোশ, শেয়াল ও বুনো শূকর শিকার করে।

পরদিন পহেলা বৈশাখ। ওইদিন বাড়ির মুরুব্বিরা সজাগ দৃষ্টি রাখতেন আমরা যেন অন্য কোনো বাড়িতে না যাই। একটা ধারণা ছিল, বছরের প্রথম দিন প্রথম আহার অন্যের বাড়িতে করলে তাকে সারা বছর অন্যের ওপর নির্ভর করে চলতে হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সামরিক পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা বাড়বে: ইরানের প্রেসিডেন্ট

স্মৃতির পাতায় ফেলে আসা নববর্ষ

আপডেট সময় : ০৩:৫৩:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

পহেলা বৈশাখ এলেই কেমন যেন নস্টালজিক হয়ে যাই। মনে হয় আমার বয়সি যারা, তাদের অনেকেই বোধ হয় এ ধরনের স্মৃতিকাতরতায় ভোগেন। শৈশবে পহেলা বৈশাখের আনন্দ, চৈত্র সংক্রান্তি, নববর্ষের হালখাতা উৎসব—সবকিছুই একই সঙ্গে স্মৃতির পর্দায় ভেসে ওঠে।

নববর্ষের আগমনী বার্তা শুরু হতো চৈত্রের শেষদিকে। চারদিকে এক সাজসাজ রব দেখা যেত। ধর্মবিশ্বাস যার যাই থাকুক না কেন, চৈত্রের শেষে সবার বাড়িঘর চমৎকারভাবে মাটি দিয়ে নিকানোর ব্যবস্থা কেউ অমান্য করার সাহস দেখাত না। ফলে চৈত্রের শেষ দিনের আগেই সারা বাড়িঘর ও উঠোন একেবারে ঝকঝকে ও তকতকে হয়ে যেত। নিকোনো উঠোনের সোঁদা গন্ধ একদিকে যেমন ফেলে আসা বছরের স্মৃতির আবহে ভরপুর করে রাখত, তেমনি অন্যদিকে নতুন বছরের নতুন সম্ভাবনার ছায়া রেখাপাত করত। পাড়ার সব বাড়িঘর নিকোনো, ঝকঝকে ও তকতকে থাকত। সবচেয়ে সুন্দর লাগত সাঁওতালদের বাড়ি। আল্পনার রঙিন ছোঁয়ায় তাদের বাড়িঘর এবং প্রকৃতি হয়ে উঠত জীবন্ত।

বিপত্তিটা হতো চৈত্র মাসের শেষ দিনে, অর্থাৎ ত্রিশে চৈত্র। বাড়িতে দাদা-দাদি-নানা-নানি থাকলে তো কথাই নেই। সেই কাকভোরে তারা বসে থাকতেন দহলিজে। তাদের সামনে দিয়েই যেতে হতো পুকুরে গোসল করতে। গোসল শেষে তাদের সামনে দিয়েই ফিরতে হতো। ফেরার সময় তারা হাতে ধরিয়ে দিতেন কাঁচা হলুদ। তাদের সামনেই এটা খেতে হতো। বিস্বাদ কাঁচা হলুদ খেলেই যে শেষ হতো না, এরপর যা ধরিয়ে দিতেন এখনো শরীর শিউরে ওঠে এর তেতো স্বাদের কথা মনে পড়লে। এদিন বাড়ির মুরুব্বিরা পেঁয়াজ-রসুন একসঙ্গে বেঁধে পাকঘরের কোণে ঝুলিয়ে দিতেন। পুরোনো শিমগাছ, লাউগাছ ও বেগুনগাছ—সবই ফেলে দেওয়া হতো। এ যেন নতুনের আবাহনে পুরোনোকে বিসর্জন দেওয়ার এক মহোৎসব। নাশতা হতো চাল আর কলাই ভাজা দিয়ে। সঙ্গে সংগতি ভেদে থাকত নারকেল।

দুপুর হলেই বয়স্করা জাল, পলো নিয়ে ছুটতেন বাড়ির পাশের বিলে অথবা নদীতে। সবাই মিলে মাছ ধরার সেই দৃশ্য এখন শুধু কল্পনাই করা যায়। মাছ ধরার পর সব মাছ একত্র করে গ্রামের সব বাড়ির জন্য ভাগ করে দেওয়া হতো, উপস্থিত-অনুপস্থিত নির্বিশেষে। আনন্দকে ভাগ করে নেওয়ার এই ঐতিহ্য এখন হারিয়ে গেছে। গাঁয়ের সাঁওতালরা দল বেঁধে তির-ধনুক নিয়ে ছুটতেন গ্রামের জঙ্গলে। বেলা শেষে বেরিয়ে আসত বেজি, খরগোশ, শেয়াল ও বুনো শূকর শিকার করে।

পরদিন পহেলা বৈশাখ। ওইদিন বাড়ির মুরুব্বিরা সজাগ দৃষ্টি রাখতেন আমরা যেন অন্য কোনো বাড়িতে না যাই। একটা ধারণা ছিল, বছরের প্রথম দিন প্রথম আহার অন্যের বাড়িতে করলে তাকে সারা বছর অন্যের ওপর নির্ভর করে চলতে হবে।