ঢাকা ১০:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

সার উৎপাদনে সক্ষমতা ৩০ লাখ টন, উৎপাদন মাত্র ৫ লাখ: আমদানিনির্ভরতায় ঝুঁকিতে খাদ্যনিরাপত্তা

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা কৃষিখাত বর্তমানে এক চরম বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে সরকার আগামী জুন-জুলাই পর্যন্ত সারের পর্যাপ্ত মজুতের আশ্বাস দিচ্ছে, অন্যদিকে ইউরিয়া সারের জন্য কাতার ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর ওপর অতিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদী খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। কৃষিবিদ রঞ্জন কুমার দের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)-এর অধীনে থাকা কারখানাগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন হলেও বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৮ লাখ টন। অর্থাৎ, নিজস্ব সক্ষমতার মাত্র এক-চতুর্থাংশ ব্যবহার করতে পেরে বাকি বিশাল ঘাটতি চড়া দামে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।

এই অচলাবস্থার মূলে রয়েছে তীব্র প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণে নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শিতা। বিদ্যুৎ বা অন্যান্য শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহে যতটা তৎপরতা দেখা যায়, সার কারখানার ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন সীমিত। অনেক সময় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চাহিদা মেটাতে সার কারখানার গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। ফলে কারখানা বন্ধ থাকলেও রাষ্ট্রকে রক্ষণাবেক্ষণ ও জনবলের বিশাল ব্যয় বহন করতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিগত অদক্ষতা। আধুনিক মানদণ্ডে এক টন ইউরিয়া উৎপাদনে যেখানে ২২-২৫ এমসিএফ গ্যাস প্রয়োজন, সেখানে ৪৩ বছরের পুরোনো আশুগঞ্জ সার কারখানার মতো জরাজীর্ণ স্থাপনাগুলোতে ৩৫-৪০ এমসিএফ বা তারও বেশি গ্যাস অপচয় হচ্ছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বছরের অর্ধেক সময় এসব কারখানা বন্ধ থাকায় উৎপাদন খরচও বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন বা আমদানিতে সরকারের খরচ পড়ছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, যা কৃষকের কাছে মাত্র ২৭ হাজার টাকায় পৌঁছে দিতে রাষ্ট্রকে টন প্রতি ১৩ থেকে ২৩ হাজার টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এই ভর্তুকির একটি বড় অংশ অদক্ষ প্রযুক্তি ও গ্যাস অপচয়ের পেছনেই নষ্ট হচ্ছে। রঞ্জন কুমার দে মনে করেন, ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার পিএলসি-র মতো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্পগুলো আশার আলো দেখালেও, সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা ঢেলে না সাজালে আমদানিনির্ভরতা কাটবে না। বৈশ্বিক অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের এই সময়ে কৃষিকে স্থিতিশীল করতে হলে সার কারখানাগুলোকে জাতীয় জ্বালানি নীতিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং পুরোনো কারখানাগুলোর আধুনিকায়নে একটি সুনির্দিষ্ট ‘রোডম্যাপ’ বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

পারমাণবিক ইস্যু অজুহাত, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইরান

সার উৎপাদনে সক্ষমতা ৩০ লাখ টন, উৎপাদন মাত্র ৫ লাখ: আমদানিনির্ভরতায় ঝুঁকিতে খাদ্যনিরাপত্তা

আপডেট সময় : ০৩:০৮:৪৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা কৃষিখাত বর্তমানে এক চরম বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে সরকার আগামী জুন-জুলাই পর্যন্ত সারের পর্যাপ্ত মজুতের আশ্বাস দিচ্ছে, অন্যদিকে ইউরিয়া সারের জন্য কাতার ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর ওপর অতিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদী খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। কৃষিবিদ রঞ্জন কুমার দের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)-এর অধীনে থাকা কারখানাগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন হলেও বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৮ লাখ টন। অর্থাৎ, নিজস্ব সক্ষমতার মাত্র এক-চতুর্থাংশ ব্যবহার করতে পেরে বাকি বিশাল ঘাটতি চড়া দামে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।

এই অচলাবস্থার মূলে রয়েছে তীব্র প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণে নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শিতা। বিদ্যুৎ বা অন্যান্য শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহে যতটা তৎপরতা দেখা যায়, সার কারখানার ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন সীমিত। অনেক সময় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চাহিদা মেটাতে সার কারখানার গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। ফলে কারখানা বন্ধ থাকলেও রাষ্ট্রকে রক্ষণাবেক্ষণ ও জনবলের বিশাল ব্যয় বহন করতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিগত অদক্ষতা। আধুনিক মানদণ্ডে এক টন ইউরিয়া উৎপাদনে যেখানে ২২-২৫ এমসিএফ গ্যাস প্রয়োজন, সেখানে ৪৩ বছরের পুরোনো আশুগঞ্জ সার কারখানার মতো জরাজীর্ণ স্থাপনাগুলোতে ৩৫-৪০ এমসিএফ বা তারও বেশি গ্যাস অপচয় হচ্ছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বছরের অর্ধেক সময় এসব কারখানা বন্ধ থাকায় উৎপাদন খরচও বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন বা আমদানিতে সরকারের খরচ পড়ছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, যা কৃষকের কাছে মাত্র ২৭ হাজার টাকায় পৌঁছে দিতে রাষ্ট্রকে টন প্রতি ১৩ থেকে ২৩ হাজার টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এই ভর্তুকির একটি বড় অংশ অদক্ষ প্রযুক্তি ও গ্যাস অপচয়ের পেছনেই নষ্ট হচ্ছে। রঞ্জন কুমার দে মনে করেন, ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার পিএলসি-র মতো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্পগুলো আশার আলো দেখালেও, সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা ঢেলে না সাজালে আমদানিনির্ভরতা কাটবে না। বৈশ্বিক অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের এই সময়ে কৃষিকে স্থিতিশীল করতে হলে সার কারখানাগুলোকে জাতীয় জ্বালানি নীতিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং পুরোনো কারখানাগুলোর আধুনিকায়নে একটি সুনির্দিষ্ট ‘রোডম্যাপ’ বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।