ঢাকা ০১:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬

আট বছরে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কমেছে ৩৭%: আমদানিনির্ভরতায় চরম ঝুঁকিতে জ্বালানি নিরাপত্তা

দেশের জ্বালানি খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন গত আট বছরে রেকর্ড পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে যা জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকে এক ভয়াবহ সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে স্থানীয় উৎস থেকে দৈনিক গড় গ্যাসের উৎপাদন ছিল ২৬৩ কোটি ঘনফুট যা ২০১৮ সালে একদিনে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুটে পৌঁছেছিল। তবে বর্তমানে সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে এবং গতকাল স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন ১৭০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে যা গত আট বছরের ব্যবধানে প্রায় ৩৭ শতাংশের একটি বড় ঘাটতি।

স্থানীয় উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ার ফলে পেট্রোবাংলাকে এখন চাহিদার বড় অংশই মেটাতে হচ্ছে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি দিয়ে। বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির প্রধান উৎস হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য কিন্তু ওই অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় এখন কাতার ও ওমান থেকে জ্বালানি সরবরাহ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে যা দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতকে চরম অনিশ্চয়তায় ফেলেছে।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট সরবরাহ ২৫২ কোটি ৯৮ লাখ ঘনফুট যার মধ্যে আমদানিকৃত এলএনজি ৮২ কোটি ২৪ লাখ ঘনফুট এবং স্থানীয় উত্তোলন মাত্র ১৭১ কোটি ঘনফুট। স্থানীয় উত্তোলনের একটি বড় অংশ আবার আসছে বিদেশি দুই কোম্পানি শেভরন ও তাল্লোর মাধ্যমে যারা ৯৫ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট সরবরাহ করছে যেখানে স্থানীয় তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি দিচ্ছে মাত্র ৭৫ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। দেশে মোট ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ২০টি থেকে গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন বিগত দুই দশক ধরে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে এক ধরনের অচলাবস্থা বিরাজ করায় এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার জ্বালানি অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না করে আমদানিনির্ভর নীতি গ্রহণ করেছিল যা দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী প্রমাণিত হয়েছে। যদিও ৫০টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৩০টির বেশি খনন করা সম্ভব হয়নি এবং আবিষ্কৃত গ্যাসের একটি বড় অংশ পাইপলাইন সংকটে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাচ্ছে না।

এলএনজি আমদানির পেছনে গত সাত বছরে সরকারকে প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য আরও ৫১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকার এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিশ্ববাজারে অস্থিরতার কারণে চলতি মাসেই দ্বিগুণ দামে পাঁচটি এলএনজি কার্গো কিনতে হয়েছে যা দেশের রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরূল ইমামের মতে আবিষ্কার ও অনুসন্ধানকে নিষ্ক্রিয় রেখে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানোই আজ রাষ্ট্রকে এই চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে আগামী পাঁচ বছরে ১১৭টি নতুন কূপ খননের মাধ্যমে ১৫৩ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। পেট্রোবাংলা ইতোমধ্যে স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে নতুন দুটি রিগ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে এবং শ্রীকাইল ও বিয়ানীবাজার থেকে সামান্য পরিমাণ গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করা শুরু হয়েছে। তবে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় স্থল ও সমুদ্রসীমায় দ্রুত অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা না গেলে জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

নারায়ণগঞ্জে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ: একই পরিবারের ৪ জন দগ্ধ

আট বছরে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কমেছে ৩৭%: আমদানিনির্ভরতায় চরম ঝুঁকিতে জ্বালানি নিরাপত্তা

আপডেট সময় : ১২:৫৩:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬

দেশের জ্বালানি খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন গত আট বছরে রেকর্ড পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে যা জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকে এক ভয়াবহ সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে স্থানীয় উৎস থেকে দৈনিক গড় গ্যাসের উৎপাদন ছিল ২৬৩ কোটি ঘনফুট যা ২০১৮ সালে একদিনে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুটে পৌঁছেছিল। তবে বর্তমানে সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে এবং গতকাল স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন ১৭০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে যা গত আট বছরের ব্যবধানে প্রায় ৩৭ শতাংশের একটি বড় ঘাটতি।

স্থানীয় উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ার ফলে পেট্রোবাংলাকে এখন চাহিদার বড় অংশই মেটাতে হচ্ছে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি দিয়ে। বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির প্রধান উৎস হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য কিন্তু ওই অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় এখন কাতার ও ওমান থেকে জ্বালানি সরবরাহ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে যা দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতকে চরম অনিশ্চয়তায় ফেলেছে।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট সরবরাহ ২৫২ কোটি ৯৮ লাখ ঘনফুট যার মধ্যে আমদানিকৃত এলএনজি ৮২ কোটি ২৪ লাখ ঘনফুট এবং স্থানীয় উত্তোলন মাত্র ১৭১ কোটি ঘনফুট। স্থানীয় উত্তোলনের একটি বড় অংশ আবার আসছে বিদেশি দুই কোম্পানি শেভরন ও তাল্লোর মাধ্যমে যারা ৯৫ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট সরবরাহ করছে যেখানে স্থানীয় তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি দিচ্ছে মাত্র ৭৫ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। দেশে মোট ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ২০টি থেকে গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন বিগত দুই দশক ধরে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে এক ধরনের অচলাবস্থা বিরাজ করায় এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার জ্বালানি অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না করে আমদানিনির্ভর নীতি গ্রহণ করেছিল যা দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী প্রমাণিত হয়েছে। যদিও ৫০টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৩০টির বেশি খনন করা সম্ভব হয়নি এবং আবিষ্কৃত গ্যাসের একটি বড় অংশ পাইপলাইন সংকটে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাচ্ছে না।

এলএনজি আমদানির পেছনে গত সাত বছরে সরকারকে প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য আরও ৫১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকার এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিশ্ববাজারে অস্থিরতার কারণে চলতি মাসেই দ্বিগুণ দামে পাঁচটি এলএনজি কার্গো কিনতে হয়েছে যা দেশের রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরূল ইমামের মতে আবিষ্কার ও অনুসন্ধানকে নিষ্ক্রিয় রেখে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানোই আজ রাষ্ট্রকে এই চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে আগামী পাঁচ বছরে ১১৭টি নতুন কূপ খননের মাধ্যমে ১৫৩ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। পেট্রোবাংলা ইতোমধ্যে স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে নতুন দুটি রিগ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে এবং শ্রীকাইল ও বিয়ানীবাজার থেকে সামান্য পরিমাণ গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করা শুরু হয়েছে। তবে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় স্থল ও সমুদ্রসীমায় দ্রুত অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা না গেলে জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।